যৌতুক প্রথা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা

যৌতুক প্রথা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা

মোছাঃ ফাতেমা পারভীন : যৌতুক প্রথা ও নারী নির্যাতন বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সমস্যাগুলোর মধ্যে অধিক অমানবিক ও বেদনাদায়ক সমস্যা। যৌতুক হলো এক ধরনের দাবি। ১৯৮০ সালের ৩৫নং আইন যা যৌতুক নিরোধ আইন ১৯৮০ নামে আইনের স্বীকৃতি পায় এবং ১৯৮০ সালের ২৬ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্টের সম্মতি লাভ করে। উক্ত আইনে যৌতুকের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘যৌতুক বলিতে শরিয়ত মোতাবেক প্রদত্ত  দেনমোহর বা মোহরানা বাদে, যেকোনো সম্পত্তি বা মূল্যবান জামানতকে বুঝাইবে, যাহা-
ক. বিবাহের এক পক্ষ অন্য পক্ষকে,
খ. বিবাহের কোন এক পক্ষের পিতামাতা বা অন্য কেহ বিবাহের যে পক্ষকে বা অন্য কোনো ব্যক্তিকে বিবাহ মজলিসে বা বিবাহের পূর্বে বা পরে বিবাহের পণ রূপে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রদান করেন বা করিতে চুক্তিবদ্ধ হন”।
বাংলাদেশে দারিদ্রক্লিষ্ট জনজীবনে যৌতুক প্রথা ও নারী নির্যাতন এক অসহনীয় অবস্থা সৃষ্টি করেছে। দেশে নারী নির্যাতনের মতো সমস্যা ব্যাপকতা ধারন করার ক্ষেত্রে মুখ্য কারণ যৌতুক প্রথা। যৌতুক প্রথার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে বিভিন্ন কারণ জড়িত। এসব কারণের মধ্যে সামাজিক কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস, সামাজিক প্রতিপত্তি ও প্রতিষ্ঠা লাভের মোহ, দরিদ্রতা, অজ্ঞতা, উচ্চাভিলাষী মর্যাদা ও অসহায়ত্ব ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। দারিদ্র, বেকারত্ব, নারীদের নিম্নমর্যাদা ও অসহায়ত্ব, অজ্ঞতা, পুরুষদের কারও কারও বিকৃত মানসিকতা,অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ, কতিপয় নারীর উচ্ছশৃঙ্খল অশুভ প্রভাব ইত্যাদি নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে কাজ করে।
এ সমস্যা আমাদের সমাজে বহুদিন ধরে বিরাজ করছে এবং বহু কারণের ফলে সৃষ্ট-কাজেই একদিনে বা একক উদ্যোগে এর সমাধান বা সচেতনতা সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। এ সমস্যা সমাধানের জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন, অভিভাবক শ্রেণি, যুবক শ্রেণি এবং মহিলাসহ সকলে যাতে যৌতুক দেয়া বা নেয়া দুটোই অন্যায় এ মানসিকতার অধিকারী হয়। রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক এবং আগ্রহী ব্যক্তিগনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানমূলক প্রক্রিয়া বা সচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে:
১. শিক্ষায় সমসুযোগ. দারিদ্র্যমোচন, সম্পত্তিতে সমান অধিকার। ব্যাপক কর্মসংস্থান ও কর্মক্ষেত্রে নারীর সহায়ক পরিবেশ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান লাভের সুযোগ ও অধিকার প্রদানের মাধ্যমে।           
২. পরিবারে বিরাজমান বৈষম্যমূলক অবস্থান পরিবর্তনের জন্য পারিবারিক নির্যাতন আইন সরকারিভাবে গ্রহণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা এবং বর্তমানে প্রচলিত বৈষম্যমূলক আইনগুলো জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করা।
৩. জাতীয় শিক্ষানীতিতে জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি ইস্যু এবং স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত করা।
৪. বাস্তব কাজে পর্যবেক্ষণের জন্য তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ দল গঠন এবং যৌতুক প্রতিরোধের বাস্তব অভিজ্ঞতার ইতিবাচক সব দিকগুলো নিয়ে মতবিনিময়, আলোচনা ও প্রচারের ব্যবস্থা করা।
৫. গ্রাম ও শহর এলাকার সর্বস্তরের মহিলাকে তাদের আইনগত অধিকার সম্পর্কে অবহিত করা। এজন্য যৌতুকের কারণে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পূর্বপরিচিত সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশনের মাধ্যমে দেশের জনসাধারণকে অবহিতকরণের মাধ্যমে এবং প্রয়োজনে আইনগত সহায়তায়, আইনজীবী মহিলাদের সহায়তায় লিগ্যাল এইড কমিটি গঠনের মাধ্যমে।
৬. মেয়ে হিসেবে নয়, সন্তান হিসেবে কন্যা যাতে পিতার সম্পত্তির ন্যায্য অংশের উত্তরাধিকার লাভ করতে পারে, তা আইনগতভাবে নিশ্চিতকরণ এবং উল্লিখিত আইনটি ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে।
৭. স্বামীর সম্পত্তির দুআনা অংশ নয়- আইনগতভাবে বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রীর সংসারে অর্জিত সকল স¤পত্তি হিসেবে গণ্য করে যেকোনো অবস্থা সে সম্পত্তির অর্ধেকের উপর স্ত্রীর মালিকানা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে।
৮. বিবাহে যৌতুক আদান-প্রদান বন্ধ, যৌতুক এবং বিভিন্ন ধরনের নারী নির্যাতন ব›ধ করার উদ্দেশ্যে পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি গঠনের মাধ্যমে এবং নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা সংবাদপত্র রেডিও, টেলিভিশন, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে তাদের মতামত তুলে ধরে।
পরিশেষে বলা যায়, যৌতুক প্রথা ও নারী নির্যাতন মোকাবেলায় দেশে যৌতুক ও নারী নির্যাতন বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক শিক্ষার ব্যবস্থা করে জনগণের মন-মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সাধন করা সম্ভব।
প্রধান শিক্ষক
ফ্রি আমিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
 সৈয়দপুর, নীলফামারী।