যেভাবে ‘স্বৈরাচার’ তকমা পান এরশাদ

যেভাবে ‘স্বৈরাচার’ তকমা পান এরশাদ

 প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতি পদে ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রায় নয় বছর সরকার চালিয়েছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সরকার চালানোর ক্ষেত্রে একক সিদ্ধান্ত প্রয়োগ আর স্বেচ্ছাচারিতার জন্য তাকে ‘স্বৈরাচার’ খেতাব দেয় গণতন্ত্রকামী মানুষ। যদিও এ ‘স্বৈরাচার’ও শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেননি ক্ষমতায়, তীব্র আন্দোলনের মুখে পতন হয়েছে তার।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। অবৈধভাবে এ কায়দায় ক্ষমতা দখল করাটা মেনে নিতে পারেনি দেশের রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে ছাত্র সংগঠনগুলো। সেজন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এরশাদের ক্ষমতা দখলের প্রথম দিন থেকেই তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন।

ক্ষমতা ধরে রাখতে একটি সামরিক আইন জারি করেন এরশাদ। যে আইনে আকারে-ইঙ্গিতে কেউ এরশাদের সামরিক শাসনের সমালোচনা বা বিরোধিতা করলে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়।

এই আইনের পাশাপাশি এরশাদ তার ক্ষমতার গদি টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন বাহিনীকে যথেচ্ছ ব্যবহার করেন। সেসময় আন্দোলন-সংগ্রামরত বহু মানুষকে হত্যা-গুম করা হয়। পাশবিক নির্যাতন থেকে বাদ যায়নি নারী ও শিশুরাও।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছাত্রনেতা, তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘দীর্ঘ নয় বছর আমরা মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা এরশাদের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিলাম, সেই আন্দোলন এরশাদের শাসনামলের বিরুদ্ধে আন্দোলন হিসেবে পরিচিত নয়, স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে আমাদের প্রথম অভিযোগ, তিনি অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছেন। রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নে এরশাদের অবদান বিশ্বজোড়া। অগণিত ছাত্র-জনতা-শ্রমিককে তিনি নির্বিচারে হত্যা করেছেন।’

এরশাদের শাসনকালের পুরো সময়েই (১৯৮২ থেকে ৯০) বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম-হরতাল-ঘেরাও কর্মসূচিতে গণতন্ত্রকামী ছাত্র-জনতার রক্ত ঝরেছিল। প্রাণ দিতে হয় অনেককে। এদের মধ্যে রয়েছেন নূর হোসেন, ডা. শামসুল আলম মিলন, তাজুল, যুবনেতা টিটো, শিশু জেহাদ, দীপালী সাহা, সাহাদাত হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দেলোয়ার হোসেন ও ইব্রাহিম সেলিম, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র মনিরুজ্জামান, আওয়ামী লীগ নেতা ময়েজ উদ্দিন উল্লেখযোগ্য। তাদের প্রাণ হারানোর ঘটনা আন্দোলনে যুগিয়েছে রসদ, এনেছে তুমুল গতি। নূর হোসেনের বুকে-পিঠে লেখা ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ স্লোগান ছড়িয়ে যায় রাজপথ থেকে বাংলার অলিতে-গলিতে।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম শ্রমিক নেতা ও বর্তমানে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি প্রবীণ রাজনীতিবিদ শহিদুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘এরশাদ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে প্রথম আঘাতটাই করেন শ্রমিকদের ওপর। সমস্ত শ্রমিক আন্দোলন বন্ধ করে অফিসগুলোতে তালা মেরে দিলেন। প্রত্যেক সামরিক শাসকই স্বৈরাচার। আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান এবং জিয়াউর রহমানও স্বৈরাচার ছিলেন। তবে অনেক বিতর্ক থাকলেও জিয়াউর রহমান সীমিত আকারে হলেও রাজনীতিতে ফিরে আসার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এরশাদ তার শাসনামলের নয় বছরই দেশে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছিলেন।’

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অন্যতম নেতা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘এরশাদ সামরিক স্বৈরাচার ছিলেন। এরশাদের স্বৈরাচার নাম কেউ তাকে উপহার হিসেবে দেয়নি, এটা তিনি নিজেই অর্জন করেছেন তার কর্মের ফলস্বরূপ। ক্ষমতা দখলের প্রথম দিন থেকে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তিনি দেশবাসীর ওপর স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছেন। পটুয়া কামরুল হাসান তাকে ‘বিশ্ববেহায়া’ বলেছিলেন। এরশাদ আমাদের জাতীয় কলঙ্ক।’

সারাদেশের ছাত্র-জনতা-শ্রমিক আন্দোলনের মুখে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৯০ সালে ৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ‘স্বৈরাচারের’ কবল থেকে মুক্তি পায় দেশের জনগণ।