যে ঋণ কখনই শোধ হবে না

যে ঋণ কখনই  শোধ হবে না

মাশরাফী হিরো: বগুড়ার আওয়ামী লীগের প্রত্যেকটি নেতাকর্মীর মানসপটে এখনও মমতাজ উদ্দিনের নাম। সে নাম সম্ভবত যারা তার সংস্পর্শে ছিলেন, তারা মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত ভুলতে পারবেন না। গত এক বছরে সবাই যেন ঘোরের মধ্যে ছিল। তার বৃত্ত সবাইকে আচ্ছাদন করে রেখেছিল। তার মৃত্যুর পূর্বে অনেকেই তার বৃত্ত থেকে বাইরে থাকার চেষ্টা করলেও মৃত্যুর পর তা আরও ঘিরে ধরেছে সবাইকে। যারা এক সময় তার সমালোচনা করতেন তারাও এখন তার অপরিহার্যতা অনুভব করেন। শুধুমাত্র বগুড়ার আওয়ামী লীগ নয় সর্বসাধারণের মাঝেও এখনও তিনি সমান পরিমাণে জনপ্রিয়। মমতাজ উদ্দিন কোন পদে ছিলেন সেটি মানুষ খুব একটা জানতো না। কিন্তু তারা মনে করতো মমতাজ উদ্দিন মানেই আওয়ামী লীগ। তাকে ছাড়া আওয়ামী লীগ কল্পনা করা যায় না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ়চেতা মানুষ। যিনি আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে কখনই সংগঠন ছাড়েন নি। তার সবচাইতে বড় গুণ তিনি কখনও বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনার বাইরে রাজনীতি করেননি।

এ কারণে তিনি অনেক সময় বড় বড় নেতাদের সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর তিনি আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন। শত ঝঞ্ঝা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। ওয়ান ইলেভেনে জননেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় সেই সময় তিনি শেখ হাসিনার মুক্তি দাবি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শেখ হাসিনা ছাড়া কোন নির্বাচন নয়। রাজনীতিবিদ হিসেবে না পাওয়ার বেদনা তাকে কখনো লক্ষ্যচ্যুত করতে পারেনি। তিনি সব সময় বলতেন আমি আওয়ামী লীগের একজন কর্মি। আমি বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনার আদর্শের সৈনিক। গায়ের চামড়া যেমন পরিবর্তন করা যায় না তেমনি আদর্শও পরিবর্তন করা যায় না। আদর্শ হলো প্রত্যেক মানুষের গায়ের চামড়া। যা শার্টের মত পরিবর্তন করা যায় না। বগুড়ার সমস্ত রাজনৈতিক ইতিহাস ছিল তার দখলে।

বগুড়ায় প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী, মহান মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক, স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হওয়া ছিল তার রাজনৈতিক দুরদর্শিতার পাওনা। সকলের মাঝেও তিনি ছিলেন নেতা। সকল দলের মাঝেও তিনি ছিলেন অনন্য। ৬৬’র ৬ দফা, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন, ৯৬ সালে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ভোট ও ভাতের আন্দোলন এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোটের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। একারণে তিনি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বহুবার। ৬৯’র গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ৬ মাস ৬ দিন এবং স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ৫ মাস ৫ দিন জেলখানায় ছিলেন। ২০০৬ সালে ২৮ অক্টোবর এবং ২১ নভেম্বর বিএনপি-জামায়াত জোটের হামলায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। ২০১৩ সালের ৩ মার্চ সাঈদীকে চাঁদে দেখার গুজব ছড়িয়ে তার বাড়িতে অগ্নি-সংযোগ করা হয়। তিনিসহ তার পুরো পরিবার অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। এত কিছুর পরেও তিনি হাল ছাড়েননি। সবার আগে তিনিই প্রথম সাতমাথায় এসেছেন। আবার সবার শেষে বাড়ি ফিরে গেছেন। নির্যাতন এবং অপমানও সহ্য করেছেন প্রতিনিয়ত। তারপরও অভীষ্ট লক্ষ্যে পথ চলেছেন। নৌকার বৈঠা ধরেছেন শক্ত হাতে। প্রতিকূল পরিবেশের বগুড়ার আওয়ামী লীগ ঋণী হয়ে আছে মমতাজ উদ্দিনের কাছে। যে ঋণ কখনই শোধ হবে না।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক
জেলা ছাত্রলীগ, বগুড়া
সাবেক উপ-দপ্তর সম্পাদক,
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ
০১৭১১-৯৪৪৮০৫