যুক্তি এবং মাধুর্যের সেই গল্পকথন চিরঅম্লান

যুক্তি এবং মাধুর্যের সেই গল্পকথন  চিরঅম্লান

মাশরাফী হিরো : মার্ক টোয়েন একজন বিখ্যাত আমেরিকান লেখক। যিনি অসংখ্য নাটক, উপন্যাস ও ছোটগল্প লিখে গেছেন। যার জন্ম ১৮৩৫ সালে এবং মৃত্যু ১৯১০ সালে। অর্থাৎ বিশ্ব ব্যাপী কবিতার যখন ব্যাপক প্রচলন তখন তিনি কবিতায় না ঝুঁকে নাটক, উপন্যাস এবং ছোট গল্পে মনোনিবেশ করেছিলেন। যা কিছুটা ¯্রােতের বিপরীতে অবগাহন করার মত। যা এখনকার লেখকদের মধ্যে খুব বেশি লক্ষ্য করা যায় না। সবাই যা করে অথবা পছন্দ করে তা নিয়েই সবাই চলতে চায়। লেখকের মূল লক্ষ্য থাকে পাঠক ভাবনা। পাঠক কি ভাবছে অথবা তাদের কি চাহিদা তা সবসময় মাথায় রেখেই এগোয় লেখকরা। যেটা আগেকার দিনে খুব বেশি ছিল না। লেখকরা মনের চাহিদা এবং দায়বদ্ধতা থেকে লেখার চেষ্টা করতেন। বিখ্যাত এই মার্কিন লেখক সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে অধিকাংশ সাহিত্য বিশারদরা নাট্যকার, ঔপন্যাসিকের চাইতে তাকে গল্প কথক হিসেবে মূল্যায়নের চেষ্টা করেছেন। তার গল্প লেখার ধরন এতটাই চমৎকার ছিল যে তিনি অন্যান্য পরিচয়কে ছাপিয়ে যেতে পেরেছিলেন।

 গল্পের গঠন এবং গাঁথুনি ছিল অনেক বেশি মজবুত। যা তাকে আলাদা পরিচয়ে পরিচিত করতে সক্ষম হয়েছিল। মার্ক টোয়েন তার ছদ্মনাম হলেও তিনি এ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশেও এরকম অসংখ্য লেখক রয়েছেন যাদের লেখায় শক্ত গাঁথুনি রয়েছে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাদের মধ্যে অন্যতম। যাকে কথাসাহিত্যিক হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাছাড়া সমসাময়িক সময়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর অনেক উঁচু মাপের লেখক ছিলেন। কিন্তু শরৎচন্দ্রের গল্পের ধরন এবং বিষয় মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছিল। যা এখনও মানুষের কাছে অনেক বেশি প্রিয়। একারণেই তিনি কথাসাহিত্যিক। আধুনিক যুগে এসেও হুমায়ূন আহমেদ, ড. জাফর ইকবাল, আনিসুল হক তাদের সে খোরাক মেটাতে পারছেন বলেই মনে হয়। হুমায়ূন আহমেদের টিভি নাটক এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে বাংলাদেশে টিভির ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছিল।

 বই এর বাইরে এসে টিভির মাধ্যমে আলাদা জগৎ খুঁজে পেয়েছিল বাংলাদেশের পাঠকরা। যা হয়তো ড. জাফর ইকবাল এবং আনিসুল হকরা পারেননি। মার্ক টোয়েনের মত হুমায়ূন আহমেদও অনর্গল গল্প লিখতে পারতেন। যা তাদের অসম্ভব বড় গুণ। তাদের সাবলীল সেই লেখনী আবর্তন করে রাখবে পাঠকদের অনেক দিন যাবৎ। যা থেকে বের হয়ে আসা মার্কিনীদের এবং বাংলাদেশীদের পক্ষে অনেকটা অসম্ভব। বিশ্ব সাহিত্যেও হয়ত তাদের পদচারণা থাকবে দীর্ঘদিন যাবৎ। সাহিত্য নিয়ে আলোচনা শুরু করলেও আমার মূল বিষয় হলো ৭ মার্চ এর ঐতিহাসিক ভাষণ। পৃথিবীতে বহু বিখ্যাত ভাষণ রয়েছে। আব্রাহাম লিঙ্কন, চার্চিল উইন্্স্টনসহ অসংখ্য বিখ্যাত ব্যক্তির বক্তব্য এখনও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কিন্তু ৭ মার্চ এর মতো এরকম সাবলীল গল্পকথন এবং তার প্রেক্ষিত বিবেচনায় দিক নির্দেশনা খুব কম ভাষণের মাঝেই পাওয়া যায়। শুরুতেই বঙ্গবন্ধুর ২৩ বছরের করুণ ইতিহাস ব্যাপৃত করা এবং পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট বক্তব্য মার্ক টোয়েনের সাবলীলতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

 বক্তৃতায় আবেগ এবং ভালোবাসা থাকলেও যুক্তির অভাব ছিল না। ভবিষ্যতের ভাবনা থাকলেও অতীতের বিবরণ কম ছিল না। সময় এবং বিষয়ের ব্যাপ্তি ভাষণকে আরো সুশৃঙ্খল ও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। শব্দচয়ন এবং বাক্যের বিন্যাস সবকিছুই ছিল অত্যন্ত পরিশীলিত। অনেকে ৭ মার্চের ভাষণকে কবিতার সাথে তুলনা করলেও গল্পকথনের সেই দিকটি সম্ভবত ভুলেই গিয়েছিলেন। যা মুক্তিযুদ্ধের আবশ্যকতাকে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। ইতিহাস বিকৃতিকারীদের শতপ্রচেষ্টা সত্ত্বেও তার সেই বিবরণ সম্ভবত তাদেরকে ভাবিয়ে তুলেছিল। শত ইচ্ছা সত্ত্বেও হয়ত তারা বক্তৃতার বিকৃতি ঘটাতে সক্ষম হয়নি। যুক্তি এবং মাধুর্যের সেই গল্পকথন আজও বিশ্বের ইতিহাসে অমলিন। ইতিহাসের সেই শ্রেষ্ঠ ভাষণ বিশ্ব সভ্যতায় বেঁচে থাকবে অনাদিকাল।
লেখক : উপ-দপ্তর সম্পাদক
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ।
০১৭১১-৯৪৪৮০৫