যাত্রীরা হুঁশিয়ার! সড়কে নিজ দায়িত্বে চলুন

যাত্রীরা হুঁশিয়ার! সড়কে নিজ দায়িত্বে চলুন

মীর আব্দুল আলীম :দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। রোধ হচ্ছে না। প্রতিদিন সড়কে গড়ে নিহত হন ৬৪ জন, বছরে ক্ষতি ৩৪ হাজার কোটি টাকা। চোখের সামনে প্রতিদিনই তরতাজা মানুষগুলো লাশ হয়ে যাচ্ছে। রক্তাক্ত হচ্ছে আমাদের পিচঢালা পথ। এত লাশ বহনে অপারগ হয়ে পড়েছে আমাদের সড়ক-মহাসড়কগুলো। সব দুর্ঘটনাই দুঃখজনক। সকলের মৃত্যুই আমাদের কষ্ট দেয়। কিন্তু কিছু মৃত্যু আছে যা মনে দোলা দেয়। ভোলা যায় না। হৃদয়ের গভীরে দাগকাটে। সোনারগাঁও উপজেলার টিপুরদিতে সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনা সবার দৃষ্টি কেড়েছে। সিডিএম নামের বেপরোয়া গতির পরিবহনটি একটি দুর্ঘটনা ঘটিয়ে পালাতে গিয়ে আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। এতে নারী-শিশুসহ ১০ জন প্রাণ হারান। এক লাশের ওপর পড়ে আছে আরেক লাশ। সব ক’টি লাশই ক্ষতবিক্ষত। আহত হয়ে আটকে গিয়ে যে চিৎকারের রোল উঠেছিলো সেদিন প্রত্যক্ষদর্শী সবাইকে তা ব্যথিত করে। প্রশ্ন জাগে, জীবন কি এমনই? এতটাই তুচ্ছ? মানুষের জীবনের কি একদন্ডও নিরাপত্তা নেই? সবই কি মূল্যহীন? তাই যদি হয় তবে সড়কে এত লাশ কেন? হঠাৎ করে আচমকা দানবীয় গতিতে দু’টি যাত্রীবাহী বাস মুখোমুখি হয়। মুহূর্তে ঝরে যায় এসব তাজা প্রাণ।

একি দুর্ঘটনা না কী হত্যাকান্ড! আমরা মনে করি এসব দুর্ঘটনার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ, মন্ত্রণালয় তথা সরকার দায়ী। এ ব্যাপারে তারা উদাসিন। একটা সড়ক দুর্ঘটনার জন্য যত ধরনের বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম ও অবহেলা থাকা দরকার, এর সবকিছুই ছিল নারায়ণগঞ্জের টিপুরদীতে। যা দেখার দায়িত্ব ছিলো সংশ্লিষ্টদের। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির চলাচলের ফিটনেস সনদ ছিলো না। আইনে নিষেধ থাকা সত্ত্বেও চালক মুঠোফোনে কথা বলছিলেন এবং বাস চালককে বেপরোয়া গতিতে বাসটি চালাচ্ছিলেন। যার ফল ১০ জন নিরীহ মানুষের প্রাণহানি। নির্দ্বিধায় বলা যায় সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণেই এ দুর্ঘটনা। এভাবে প্রতি দিন মানুষ মরছে। গড়ে দৈনিক মরছে ৬৪জন। সারাদেশে খুন খারাবিতেওতো এর দশভাগের একভাগ মরে না। এই ইচ্ছাকৃত মৃত্যুর জন্য কি সরকারের কোন দায় নেই? দায় কারো নেই; থাকলে সড়কে প্রতিদিন এভাবে মানুষ লাশ হতো না।

আমরা রাস্তায় বের হলে কেউ না কেউ মরবই। কেউ আমাদের বাঁচাতে আসবে না। অতএব যাত্রী সকল হুঁশিয়ার সাবধান! নিজ দায়িত্বে রাস্তা পাড়ি দিন। এদেশে দায় নেয়ার দায়িত্বশীল লোকের বড় অভাব। কেউ কখনো কোন ঘটনার দায় নিতে চান না। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি ফেরিডুবির ঘটনার উদাহরণ না টানলেই নয়। সাগর উপকূলে ফেরিডুবির ঘটনায় দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী চাং হং-উন ফেরিডুবি রোধে ব্যর্থতার দায় মাথা পেতে নিয়ে পদত্যাগ করেছেন। ইউরোপ-আমেরিকায় এ ধরনের পদত্যাগের উদাহরণ প্রচুর, কিন্তু বাংলাদেশে এ রকম ঘটনা বিরল। কেউ কখনো দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেছেন মনে পড়েনা। পদত্যাগের সময় দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফেরিডুবির পর ১০ দিনেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, কিন্তু যাঁরা এখনো তাঁদের হারানো স্বজনদের খুঁজে পাননি, তাঁদের কান্নায় আমি রাতে ঘুমাতে পারি না।’ কতটা গণতন্ত্রমনা হলে একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে দেশবাসীর পাশে দাঁড়াতে পারেন, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। তাঁর পদত্যাগ জবাবদিহির একটি নতুন সোপান রচনা করে বৈকি! ওই ফেরি দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত প্রায় ২০০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়, আরও শতাধিক নিখোঁজ। এ ঘটনায় ফেরির পাইলট ও আরও ১৪ জন ক্রু গ্রেপ্তার হন। তাঁদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে।

আমাদের দেশে এতো মানুষ মরছে প্রতিদিন তাতে কি হয়? কেউকি সাজা পায়? জানা মতে বছরে দু/একজনকে আইনের আওতায় আনা হয় তাও আবার বিশেষ কেউ মারা গেলে। দ: কোরিয়ার দুর্ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী কতটা দায়ি ছিলেন পাঠক আপনারাই বলুন? তবু তিনি বলেছেন ‘আমি ব্যর্থ’। দেশের জনগণকে রক্ষা করতে না পারার দায় নাকি তারই। তাই সরে দাঁড়ালেন। কোথায় আমরা; কোথায় ওরা? এদেশে নিজ দায়িত্বেই সবাইকে চলতে হবে। দুর্ঘটনায় মরবেন আপনি, এ দায়িত্ব কেউ নেবে না। এটা কোন মগের মুল্লুক? এসবকে আমি ইচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা বলব। খুন হওয়া বলবো। এসব খুনের দায় কারা নেবে? রােেষ্ট্রর লোকজন একই ঘটনায় হরে দরে মরবে আর প্রতিকার হবে না তা কি করে হয়। এ দায়তো সরকারেরই। সরকার ব্যবস্থা নিলে দুর্ঘটনা কমছে না কেন? সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারের বড় ধরনের কোন পদক্ষেপ আমাদের চোখে পড়ছে কি? এ অপরাধের আইনি তৎপরতাও নেই। বড় ধরনের কোন ঘটনায় কেবল সরকারের হাপিত্তেশ শুনি। হম্বিতম্বি মার্কা বক্তব্য দেন মন্ত্রীমহোদয়গণ। ছুটে যান লাশের পাশে। এখন তাও কম। প্রয়াত মন্ত্রী সাইফুর রহমান, সরকারের ক’জন সচিব আমলা, নাট্যব্যক্তিত্ব, মন্ত্রীর ছেলে, সাংবাদিকসহ অনেক গুণিজন একে একে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেও দুর্ঘটনা রোধে পদক্ষেপ কৈ?

আমরাও কম কোথায়? আমরা হরতাল জ্বালাও পোড়াও মার্কা আন্দোলন করতে পারি  কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কোন আন্দোলনতো কখনো কেউ করেছি বলে তো মনে পড়ে না। আন্দোলন বলতে নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের “নিরাপদ সড়ক চাই”-এ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। গত ২১ বছরেও নিরাপদ সড়কের জন্য লড়ে বেচারা কাঞ্চন কিছুই করতে পারেননি। এ ক্ষেত্রে  বোধ করি সরকার যন্ত্রের এ টনক নড়বে না। তা হলে উপায় কি? আল্লাহই শেষ ভরসা। আল্লাহর মাল আল্লায় নিয়ে যাচ্ছে এমন সান্ত¡না নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে; চলতে হবে পথে। আপনজনেরা মরছে নেশাগ্রস্ত বেপরোয়া চালকদের চাকায় পিষ্ঠ হয়ে। খাদে পড়ে মরছে মানুষ; পঙ্গুত্ব বরণ করছেন অনেকে। নির্বিচারে চলছে এধরনের মৃত্যু। আর তা চালিয়ে দেয়া হচ্ছে নিছক  দুর্ঘটনা বলে। এ মৃত্যুর যেন কোনই বিচার নেই? মানুষ মরবে আর এর কোনই বিচার হবে না; তা কি করে হয়? প্রশ্ন হলো এসব রুখতে হবে? যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। সে মৃত্যু যদি অকাল ও আকস্মিক হয়, তবে তা মেনে নেয়া আরো কঠিন। প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে একের পর এক অকালমৃত্যু আমাদের শুধু প্রত্যক্ষই করতে হচ্ছে না, এ দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বিভীষিকাময় ও অরাজক পরিস্থিতিও মোকাবেলা করতে হচ্ছে, যা আমাদের কারো কাছেই কাম্য নয়।

গত এক যুগেই বাংলাদেশে ৪৪ হাজার ৭৭৪টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়। ২০০১ সাল থেকে এ বছর জানুয়ারি মাস পর্যন্ত দুর্ঘটনায় মোট ৬৫ হাজার ৮৬২ জন নিহত হন। এ দেশে সড়ক দুর্ঘটনার ৫৪ শতাংশই ঘটে যানবাহনের ধাক্কায়। তা ছাড়া দু’টি যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৩ শতাংশ, একটি অন্যটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়ায় ১১ শতাংশ এবং গাড়ি উল্টে যাওয়ায় ৯ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে মোট মৃত্যুর ৮৫ শতাংশই ঘটে থাকে এই চার কারণে। গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও খোদ একজন মন্ত্রী পরিবহন শ্রমিক নেতা রূপে ২৪ হাজার শ্রমিককে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য সুপারিশ করেন, যাদের পরীক্ষাই নেয়া হয়নি। তদুপরি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তিও কঠোর নয়। সড়ক দুর্ঘটনাকে নরহত্যা হিসেবে গণ্য করে দায়ী চালকদের যাবজ্জীবন কারাদ  দেয়ার আইন করা হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাপে সরকার সে আইন সংশোধন করে। এখন চালকের ভুলে দুর্ঘটনা হলে এক থেকে তিন বছর কারাদে র বিধান আছে। এ আইনটি খুবই দুর্বল। দীর্ঘদিনের নাগরিক দাবি আইন সংশোধন করে শাস্তি বাড়ানোর এবং তা ক্ষেত্র বিশেষ মোবাইল কোর্টে বসিয়ে শাস্তির ব্যবস্থা করা। কিন্তু সরকার তা আমলে নিচ্ছে না। আইনটি যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে ২০০৭ সালে একটি কমিটি করেছিল যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। খসড়াও হয়। কিন্তু এখনো খসড়াটি গত ৭ বছরেও আইনে পরিণত হয়নি। প্রশ্ন হলো আইন না হলে, শাস্তির ব্যবস্থা না থাকলে দুর্ঘটনা রোধ হবে না কখনো। দুর্ঘটনা প্রতিরোধের লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষের গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত কাজীর গরুর মতো কেতাবি হয়ে থাকায় তা কোনো কাজে আসছে না। যেমন- ৮০ হাজার অনুপযোগী যান আটক করার ঘোষণা সত্ত্¡েও সরকারি সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে সিকি শতাব্দী পুরনো ট্রাক এবং ২০ বছরেরও বেশি পুরনো বাস-মিনিবাস চলাচল করছে। সড়ক মহাসড়কে অতিরিক্ত পণ্য বোঝাই ট্রাক প্রতিহত করা, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনে বাধ প্রদানসহ নানা পদক্ষেপের অভাবে দুর্ঘটনা বাড়ছে।

দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ অদক্ষ গাড়ি চালক। এ জায়গাটিতে সরকারের দক্ষতা আর নজরদারির বড্ড অভাব আছে বলে মনে করি। চালকের পেশাকে এখনও আমাদের দেশে মর্যাদাপূর্ণ পেশায় রূপ দেয়া যায়নি। সবার আগে দক্ষ চালকের সংখ্যা বাড়াতে চালকের পেশাকে মর্যাদাপূর্ণ করতে হবে। পরিবহন চালকদের আয় রোজগার ভালো হলেও এ পেশার শিক্ষিত লোকজন আসতে চায় না। কারণ এ পেশার লোকদের অন্য দৃষ্টিতে দেখা হয়। তাই এ পেশায় শিক্ষিত লোকজন আসতে চায় না। কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, অফিসের পিয়ন, কেরানির চেয়েও ওরা কম মর্যাদাপূর্ণ। ড্রাইভারি পেশায় ভালো অর্থ উপার্জন করা গেলেও মর্যাদা না থাকায় শিক্ষিত লোকজন কম বেতনে অফিসের চাকুরি করতে আগ্রহ দেখায়। তাই সরকারকে আগে ড্রাইভারি পেশাকে মর্যাদাপূর্ণ করতে সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ড্রাইভারি পেশা মর্যাদাপূর্ণ হলে দক্ষ এবং শিক্ষিত চালকের সংখ্যা বাড়বে। তাতে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকটা রোধ হবে বলে আমরা মনে করি।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
[email protected]  
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮