যাকাত ও ফিতরার মাসায়েল

যাকাত ও ফিতরার মাসায়েল

মাওলানা আব্দুজ জাহের আজহারী :মাহে রমজান মু’মিন বান্দার সওয়াব অর্জন করার সর্বোত্তম সময়। হাদীস শরীফে রয়েছে, যে ব্যক্তি রমজান মাসে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে একটি নফল কাজ করিল, সে ঐ ব্যক্তির সমান হইল, যে অন্য মাসে একটি ফরজ আদায় করিল। আর যে ব্যক্তি সে মাসে একটি ফরজ আদায় করিল, সে ঐ ব্যক্তির সমান হইল, যে অন্য মাসে সত্তরটি ফরজ আদায় করিল। (মিশকাত, হাদীস নং-১৮৬৮)
মহান আল্লাহ চান, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ ঈমান ও আমলে সালিহার মাধ্যমে তারা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখুক, ইহকাল ও পরকাল এর অফুরন্ত কল্যাণ অর্জন করুক। যাকাত ঐ সকল আমল সমূহের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ফরজ ইবাদত। ইসলামের রোকনসমূহের মধ্যে তৃতীয় স্তম্ভ যাকাত। ঈমান ও সালাতের পরই যাকাতের স্থান। পবিত্র কুরআনের বহুস্থানে সালাতের সাথে সাথেই যাকাতের উল্লেখ রয়েছে। এর অস্বীকারকারী কাফির। যাকাত আদায় না করা গুনাহে কবিরা। পবিত্র কুরআনে যাকাত অনাদায়কারীর পরিণতি বর্ণনা করে সূরা তওবার ৩৪ ও ৩৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে, “যারা সোনা-রূপা জমা করে, অথচ আল্লাহর রাস্তায় তা খরচ করে না (যাকাত দেয় না।) তাদেরকে সংবাদ দিন কষ্টদায়ক আজাবের, যে দিন গরম করা হবে সেগুলোকে জাহান্নামের আগুনে, অত:পর দাগ দেওয়া হবে সেগুলো দ্বারা তাদের ললাটে, তাদের পার্শ্বদেশে ও তাদের পৃষ্ঠ দেশে (বলা হবে) এখন স্বাদ গ্রহণ কর উহার, যা তোমরা জমা করেছিলে।” সম্মানিত পাঠক-পাঠিকা, মহান আল্লাহ তা’লা যাদেরকে তার নিয়ামত ধনসম্পদ প্রদান করেছেন; তাদের কর্তব্য হলো, সঠিক পদ্ধতিতে সম্পদের ব্যয় করা। মাহে রমজান যেহেতু অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক সওয়াব অর্জন করার মৌসুম, তাই এ মাসে যাকাত প্রদান করে আরো অধিক সওয়াব অর্জন করা যায়। আর সে উদ্দেশ্যেই আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস।
*যাদের উপর যাকাত ফরজ :
*ইসলামী আইনবিদগণ এ ব্যাপারে একমত যে, প্রাপ্ত বয়স্ক, স্বাধীন, মুসলমান নর-নারী, সম্পদশালীর উপর যাকাত ফরজ। সম্পাদশালী বলতে বোঝায়, যার নিকট প্রয়োজনের অতিরিক্ত এমন অর্থ, ব্যবসা পণ্য রয়েছে, এদের মূল্য বর্তমান বাজার দর হিসেবে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা অথবা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণের মূল্যের সমান। আর উক্ত অর্থ (নিসাব পরিমাণ সম্পদ) এক বছর সময় পর্যন্ত তার নিকট বা অধীনে থাকে। তবে ওই ব্যক্তিকে তার (প্রয়োজনের অতিরিক্ত) সম্পদের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে। (১ তোলা= ১ ভরি)
* কারো নিকট যদি কিছু স্বর্ণ, কিছু রৌপ্য, কিছু ব্যবসায়িক পণ্য এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু টাকা জমা থাকে, এগুলোর মূল্য যদি (নিসাব পরিমাণ) সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা বা সাড়ে সাত তোলা সোনার মূল্যের সমান হয়, তবে বছরান্তে তার উপরও যাকাত ফরজ হবে।
* যদি কারো নিকট প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা-পয়সা, ব্যবসায়িক পণ্য ও রৌপ্য না থাকে শুধু স্বর্ণ থাকে, তাহলে স্বর্ণ সাড়ে সাত তোলা বা তার চেয়ে বেশি হলে যাকাত ফরজ হবে।
*যদি কারো নিকট শুধু রূপা থাকে। স্বর্ণ, ব্যবসায়িক পণ্যও প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা পয়সা না থাকে। তাহলে রূপার পরিমাণ সাড়ে বায়ান্ন তোলা বা তার চেয়ে বেশি হলে যাকাত ফরজ হবে।
*কারো নিকট যদি স্বর্ণ, রূপা ও ব্যবসায়িক পণ্য না থাকে। শুধু প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ বা টাকা থাকে। তাহলে ঐ জমাকৃত অর্থের পরিমাণ সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা অথবা সাড়ে সাত তোলা সোনার মূল্যের সমান হয়, তবে ঐ অর্থের উপর বছরান্তে যাকাত ফরজ হবে।  
* তদ্রুপ যদি কারো কাছে শুধু ব্যবসায়িক পণ্য রয়েছে। স্বর্ণ, রূপা বা অর্থ নেই। তাহলে ব্যবসায়িক পণ্যের মূল্য নিসাব পরিমাণ হলে যাকাত ফরজ হবে। ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাত নিরূপণকালে মালিকানার বছর সমাপ্তি দিবসে যে সম্পদ থাকবে তাই পুরো বছর ছিল বলে ধরে নিয়ে তার উপর যাকাত দিতে হবে।
* শেয়ারের মূল্য, ডিপিএস, এফডি আর এর উপর যাকাত ফরজ হবে। যদি তা নিসাব পরিমাণ হয়।
* ভাড়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে যে বাড়ি নির্মাণ করা হয় বা যে জমি ক্রয় করা হয় অথবা গাড়ি, লঞ্চ ও কারখানার মেশিন বা যন্ত্রপাতি যার মাধ্যমে উপার্জন করা হয়, এসবের মূল্যের উপর যাকাত আসে না বরং যাকাত হবে এসব দ্বারা উৎপাদিত মালামাল ও ক্রয়কৃত মালামালের বা অর্থের উপর। অবশ্য এসব যন্ত্রপাতি, যানবাহন ইত্যাদি যদি ব্যবসার দ্রব্য সামগ্রী হিসেবে ক্রয় করা হয়, তাহলে এগুলোর উপর যাকাত ফরজ হবে।
* কারো নিকট টাকা পাওনা থাকলে ওই পাওনা টাকার যাকাত দিতে হবে। তবে যে ঋণ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, সে টাকার উপর যাকাত ফরজ হবে না।
* যৌথ মালিকানায় অর্থ বিনিয়োগ থাকলে প্রত্যেকের অংশ আলাদাভাবে হিসেব করে প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন ভাবে নিসাব পরিমান অর্থ বা সম্পদ হলে, যাকাত ফরজ হবে।
* কেউ যদি বছরের শুরুতে নিসাবের মালিক হয় এবং বছরের শেষেও নিসাব পরিমাণ অর্থের মালিক থাকে, তবে তার উপর যাকাত ফরয হবে।
* যাকাত ফরয হওয়ার সময়কার বাজার দর হিসেবে সোনা, রূপা ও ব্যবসায়িক পণ্য ইতাদির মূল্য ধরে যাকাত এর হিসেব করতে হবে।
* জমিন থেকে উৎপাদিত কৃষি পণ্য বা ফসলের যাকাত ফরয হবে। ফসল উৎপাদনের জন্য কৃত্রিম উপায়ে সেচ দিতে হয় এরূপ জমিতে উৎপাদিত ফসলের প্রয়োজনের অতিরিক্ত টুকুর ২০ ভাগের ১ ভাগ হারে যাকাত দেওয়া ফরয। আর ফসল উৎপাদনের জন্য কৃত্রিম উপায়ে সেচ দিতে হয় না এমন জমিতে উৎপাদিত ফসলের ১০ ভাগের ১ ভাগ (উশর) যাকাত ফরয হবে।
* ছাগল/ভেড়া ৪০টি বা তার অধিক গরু/মহিষ ৩০টি বা তার অধিক, উট ৫টি বা তার অধিক হলে বছরান্তে যাকাত ফরয হবে।
* যাকাতের হকদার ঃ পবিত্র কুরআন মজিদে আট প্রকারের লোক যাকাত পাবার যোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা তওবার ৬০নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘‘ সাদাকা (যাকাত) তো কেবল ফকির, মিসকিন ও সাদাকা সংক্রান্ত কাজে নিযুক্ত কর্মচারীর জন্য, যাদের চিত্তাকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, দাস মুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরের জন্য। এটা আল্লাহর বিধান।’
*যে সকল খাতে যাকাত দেওয়া বৈধ নয়। যেমন Ñ
১) যার নিকট নিসাব পরিমাণ অর্থ সম্পদ রয়েছে ।
২) যাকাত দাতা তার মা, বাবা, স্ত্রী, স্বামী, ছেলে, মেয়ে ও দাদা-দাদীকে যাকাত দিতে পারবে না।
৩) মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল ইত্যাদি নির্মাণ ও উন্নয়ন কাজে যাকাতের অর্থ দেওয়া যাবে না।  
৪) গরিব, অভাবীকে কোন কাজের পারিশ্রমিক বা বেতন ভাতা হিসেবে যাকাতের অর্থ দেয়া যাবে না।
৫) অমুসলিম ব্যক্তিবর্গকে যাকাত দেওয়া বৈধ নয়।
যাকাত নিরূপণ ঃ
১) যাকাত প্রদান যোগ্য অর্থের পরিমাণ = ২,৯০,০০০/-
২) দায় দেনা/ঋণ                      = (-) ৩০,০০০/-
যাকাত প্রদান যোগ্য অর্থের পরিমাণ  = ২,৬০,০০০/-
২৫% হারে যাকাত হবে = (২,৬০,০০০ গু ৪০)
                          = ৬,৫০০/-
(ছয় হাজার পাঁচ শত টাকা মাত্র)
সাদাকাতুল ফিতর:
*মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষের উপর ‘সদাকাতুল ফিতর’ ওয়াজিব। এরূপ সম্পত্তি বর্ধনশীল হওয়া জরুরি নয়। গম, যব, আটা, খেজুর ও কিসমিস দ্বার ফিতরা আদায় করা যায়।
* গম বা গমের আটা দ্বারা ফিতরা আদায় করলে অর্ধসা, বা ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম দিতে হবে। যব বা যবের আটা কিংবা খেজুর ও কিসমিস দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করলে এক সা বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম দিতে হবে। রুটি, চাউল বা অন্যান্য খাদ্য দ্রব্য দিয়ে ফিতরা দিতে হলে মূল্য হিসেব করে দিতে হবে। উপরোক্ত বস্তু দ্বারা ফিতরা না দিয়ে উক্ত বস্তুগুলোর যে কোন একটির পরিমাণ মূল্য/অর্থ দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা যায়।
* সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার সময় হলো, ঈদুল ফিতরের দিন সুবহি সাদিক হওয়ার পর। সুবহি সাদিকের পূর্বে কেউ মারা গেলে তার উপর ফিতরা ওয়াজিব হবে না। সুবহি সাদিকের পর কোন সন্তান জন্ম গ্রহণ করলে কিংবা কেউ মুসলমান হলে তার উপর ফিতরা ওয়াজিব হবে। কোন দরিদ্র ব্যক্তি ঈদের নি রাতে সুবহি সাদিকের পূর্বে সম্পদশালী হলে তার উপর ফিতরা ওয়াজিব হবে। আর কোন ধনী ব্যক্তি ওই সময়ের পূর্বে দরিদ্র হয়ে গেলে তার উপর ফিতরা ওয়াজিব হবে না।
*ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহের উদ্দেশ্যে বের হবার পূর্বে ফিতরা আদায় করা মুস্তাহাব। ঈদুল ফিতরের আগে বা পরে ফিতরা আদায় করলেও জায়িজ হবে।
* নিজের এবং নিজের নাবালিগ সন্তানদের পক্ষ থেকে সাদকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব।
*স্ত্রী এবং বালিগ সন্তানগণ ফিতরা নিজেরাই আদায় করবে। স্বামী বা পিতার উপর তাদের ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব নয়। অবশ্য দিয়ে দিলে আদায় হয়ে যাবে।
* নিজ পরিবারভুক্ত নয় এমন লোকের পক্ষ থেকে তার অনুমতি ব্যতীত ফিতরা দিলে ওয়াজিব আদায় হবে না এবং কোন ব্যক্তির উপর তার পিতা-মাতার ও ছোট ভাই-বোন এবং নিকট আত্মীয়ের পক্ষ হতে ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব নয়।
*যাকাত পাবার যোগ্য ব্যক্তিগণ ফিতরা পাবারও যোগ্য। অর্থাৎ যাদেরকে যাকাত দেওয়া যায় তাদেরকে ফিতরাও দেওয়া যায়।
*এক ব্যক্তির ফিতরা একজনকে অথবা একাধিক জনকেও দেয়া যায়। আবার একাধিক ব্যক্তির ফিতরা একজনকে দেওয়াও জায়িজ।
*যিনি রোজা রাখতে অপারগ বা রোজা রাখেন নাই তার উপরও সাদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হবে।
মাহে রমজান সওয়াব অর্জন করার মৌসুম এবং আমল করার সর্বোত্তম সুযোগ। মহান আল্লাহ তা’লা আমাদেরকে প্রত্যেকটি আমল সহিহ তরিকাহ মোতাবেক পালন করে তার নৈকট্য অর্জন করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক ঃ খতিব, মদিনা মসজিদ, বগুড়া সদর।
[email protected]
০১৭৫৪-৩২৯১২১