বাংলার ঐতিহ্য

যাঁতার ঘড়ঘড় শব্দ হারিয়ে গেছে

যাঁতার ঘড়ঘড় শব্দ হারিয়ে গেছে

চাটমোহর (পাবনা) প্রতিনিধি : যাঁতার যাঁতাকলে আর গৃহিণী-ঝিদের কষ্ট করতে হয় না। দিদিরা আর পালায় না বড়দির বাড়িতে। পালানোর সে গল্পটা ছিল মাসী-পিসী-দিদিমনিদের আমলের। এখন সে গল্প অতি প্রচীন-অচল। অথচ একদা যাঁতার কদর ছিল ঘরে ঘরে। সেসব যাঁতা কোথায় গেল। হয়তো আছে এখনো গ্রাম-গহিনের কোথাও। কিন্তু আর ঘোরে না। প্রথমে শ্যালো মেশিন, পরে বিদ্যুৎ চালিত কল এসে যাঁতা ঘোরা বন্ধ করে দিয়েছে। এখনতো বাড়িতে বাড়িতে চলে যাচ্ছে ধান, ডাল, সরষে ভাঙা কল।  

আমাদের বাংলার একটি ঐতিহ্য ছিল এই পাথুরে যাঁতা। বাংলার কৃষি সমাজে এই যাঁতার আলাদা একটা দরকারী কদর ছিল কৃষি গৃহস্থালীতে। সেটা খুব দূর-অতীত নয়। আশির দশকের কিছু পরেও ছিল। যে গৃহস্থ্যের বাড়িতে যাঁতা থাকতো না, সেই বাড়ির গৃহিণীর খোটা শুনতে হতো প্রতিবেশীদের কাছে। তখনও শ্যালো মেশিন চালিত ধান ভাঙানো কল আসেনি গ্রাম-গহিনে। সবে মাঠে বসেছে শ্যালো মেশিন উচ্চফলনশীল ইরি-বোরো ধানে পানি সেচ দেওয়ার জন্য। তখন এই পাথরের ভারী যাঁতা আর ঐ কাঠের ঢেঁকিই ছিল শস্য ভাঙিয়ে খাবার উপযোগী করার একমাত্র অবলম্বন। বড় গৃহস্থ বাড়িতে কাজের মেয়ে থাকতো কয়েকজন। তাদের সাথে নিয়ে ভোরবেলা থেকে শুরু হতো যাঁতায় গম, জব, মশুর, কালাইসহ নানা রকম ডাল জাতীয় শস্য ভাঙানোর কাজ। গৃহস্থবাড়ির বউদের তখন বেজায় খাটুনি ছিল। হয়তো এখনো আছে। তবে সেই যাঁতার যাতনাটি আর নেই বোধ হয়। সেখানে এসেছে হরেক রকম ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি। সেচের শ্যালো মেশিন দিয়ে প্রথম গৃহস্থবাড়ির হালটে ধান ভাঙানো কল বসলো। খাটুনি থেকে রক্ষার আনন্দে নেচে উঠলেন গ্রামবধূ আর তাদের কাজের মেয়েরা। যাক ঢেঁকি পাড়ানো থেকে বাঁচা গেল তাহলে। রইলো বাকি যাঁতা। বহুদিনই থাকল বেঁচে। জবের ছাতু, নানা পদের ডাল ভাঙানোর কাজ চলতে থাকল এই যাঁতায় পিশেই খাবার ব্যবস্থা। গমের আটা ভাঙানো শুরু হলো ধানের সাথে ঐ শ্যালো মেশিনের ধানের কলে।

 এলো নব্বইয়ের দশক। বিদ্যুৎ     চলে এলো পল্লীবিদ্যুতের তারের কাঁধে চড়ে গ্রামে-গঞ্জে। আর পায় কে। কৃষক মনের আনন্দে ধানকলের শ্যালো মেশিন বেঁচে কারেন্টের মটর বসিয়ে নিল শ্যালো মেশিনের জায়গায়। শুরু হলো হরহরিয়ে সবকিছু ভাঙানোর। মূলতঃ যাঁতা সে সময়ই পড়ে গেল হারানোর যাঁতাকলে। গ্রাম-গঞ্জের খাটুনিদার বধূরা যাঁতাকে ধুয়েমুছে পাঁজাকোলো নিয়ে রাখল ভাড়ার ঘরের এক কোনায় ইঁদুরের গর্তের পাশে। কালেভদ্রে ডাক পড়ে যাঁতার। তখনও মাঠে মাঠে জবের আবাদ হয়। ছেলেটা জবের ছাতু পছন্দ করে। ভাঙাও জব। আনো যাঁতা। উঠে গেল জবের আবাদ। যাঁতার আদর কদর কমলো। ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল যাঁতা। ভাবুন এই চাটমোহর শহরে যাদের বসবাস তারা। এমন একটি বাড়ি ছিল না।

 যে বাড়িতে একটি ছোট অথবা বড় যাঁতা ছিল না। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বাড়িতে। কারণ তখনতো এই শহরটিতে তাদেরই বসবাস ছিল সংখাধিক্য। জবের, ছোলার ছাতু, ডাল সবই ভাঙতো এই যাঁতায় তারা। যাঁতা ভাঙার আলাদা একটা শব্দই ছিল। ঘর ঘর ঘর ঘর। তালে লয়ে হতো সে শব্দ। যান্ত্রিক সভ্যতা এসে বাংলার ঐতিহ্য যাঁতাকে হটিয়ে দিল। এখন সবই যন্ত্রের কলে ভাঙা যায়। তারপর আমরা মাঝে মাঝে ঐতিহ্য হারিয়ে ভাবতে লিখতে ভালোবাসি ঢেঁকি ছাটা চাল, ঘনি ভাঙা তেল, দুটি পাকা বেলের গল্প। ঢেঁকুর তুলি এসব খাঁটি জিনিসের সুস্বাদু স্বাদের কথা গল্প করে। পৌর শহরের দোলবেদীতলা মহল্লার বাসিন্দা রনি রায় বলেন, এইতো ৯০ সালেও আমার মাকে যাঁতায় জবের ছাতু ভাঙতে দেখেছি। এখন অনেকেরই দেখেছি ব্যাপারটা আছে। দেখলাম যাঁতা আছে ব্যাপারটি আর নেই। যাঁতা হারিয়ে গেছে। আহারে বেচারা যাঁতা।