মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখতে হবে

মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখতে হবে

আতাউর রহমান মিটন : বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনাময় একটি দেশ। দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে দেখুন, দেখবেন অনেক মানুষ আছেন যাঁরা নিঃস্বার্থভাবে মানুষের জন্য নীরবে অনেক কিছু করে যাচ্ছেন। রাজশাহীর পলান সরকার ছিলেন সেরকমই একজন্য আলোকিত মানুষ। অগ্নিঝরা মার্চের ১ম দিনে (২০১৯) আমাদের মাঝ থেকে চিরবিদায় নিলেন পাঠক তৈরির কারিগর ‘পলান সরকার’। নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে বই কিনেছেন তিনি। তারপর পায়ে হেঁটে প্রতিদিন মাইলের পর মাইল ঘুরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দিয়েছেন বই। নিয়ে এসেছেন পূর্বের দেয়া বই। এভাবেই রাজশাহীর প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে তিনি জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন নিভৃতে। কোন কিছু পাওয়ার আশায় নয়, জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে। একুশে পদকপ্রাপ্ত আলোর পাখি পলান সরকারের চিরবিদায়ে জাতি একজন নিঃস্বার্থ সমাজসেবককে হারাল। পলান সরকারের অভাব পূরণ হবার নয়। তবু প্রার্থনা আমরা যেন আলোর পাখিকে স্মরণে রাখি, ছড়িয়ে দেই জ্ঞানের আলো প্রতিটি ঘরে, পাড়ায় ও মহল্লায়।
আমরা ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উদযাপন করলাম, সামনে আসছে ১৭ মার্চ। দুটো দিনই আমাদের জাতীয় জীবনে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। সত্যি বলতে কি, মার্চ মাসটাই বাংলাদেশের জন্য এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস। সংগ্রাম ও স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার মাস এই মার্চ। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আয়োজিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতম বক্তব্যটি প্রদান করেছিলেন। আমাদের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে অনুপ্রেরণাময় এই ভাষণের কারণেই বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ‘নিউজউইক’ ম্যাগাজিন বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজনীতির কবি’ আখ্যা দেয়। ২০১৭ সালের ৩০ শে অক্টোবর ইউনেস্কো কর্তৃক ভাষণটি ‘ঐতিহাসিক দলিল’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
আগামী ১৭ মার্চ বাঙালির মহান নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জন্মদিন। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নিয়েছিলেন। আগামী বছর এই মহান নেতার জন্মের শততম বার্ষিকী উদযাপিত হবে। বঙ্গবন্ধু’র জন্মের শততম বার্ষিকী উদযাপনের জন্য এখন থেকেই সরকার প্রস্তুতি শুরু করেছে। বঙ্গবন্ধু’র জন্ম শতবার্ষিকী ও ২০২১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হবে। সব মিলিয়ে আগামী দুই বছর আমাদের দেশ নানা কর্মসূচি পালনে ব্যস্ত থাকবে। উদযাপনের কর্মসূচি গ্রহণের পাশাপাশি একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সৃজনশীল কর্মসূচি এবং সহায়ক পরিবেশ। প্রয়োজন নারী-পূরুষের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা।
অন্ধকারকে আপনি যতই গালাগালি দেন, যতই তিরস্কার করেন, অন্ধকার চলে যাবে না। অন্ধকার এভাবে পালায় না। কিন্তু ছোট্ট একটা মোমবাতি জ্বালান, দেখবেন কিছুটা অন্ধকার পালিয়েছে। এভাবে আরও কেউ এগিয়ে আসলে, ছোট ছোট অনেক মোমবাতি জ্বলে উঠলে একটা পুরো এলাকা আলোকিত হয়ে উঠবে। সমাজের ক্ষেত্রেও এই সত্য প্রযোজ্য। সমাজের অন্ধকার, অনিয়মগুলো নিয়ে কেবল সমালোচনা করলে সমস্যা দূর হবে না। সমস্যা দূর করার জন্য নিজের সাধ্যমত কাজ করুন, হাত বাড়িয়ে দিন, দেখবেন একদিন কেউ না কেউ এসে আপনার পাশে দাঁড়াচ্ছে। এভাবে এক এর পাশে এক দাঁড়ালে দুই নয়, এগার হয়ে উঠবে। এটাই হলো সমাজ প্রগতির গূঢ় রহস্য। সমাজের মানুষগুলো তাদের গুটানো হাত ছেড়ে সবাই যখন দায়িত্ব নেয়ার জন্য সমবেত হবে, সবাই যখন হাত ধরাধরি করে দাঁড়াবে, তখনই একটা বিরাট মানব শেকল তৈরী হবে। এই শেকল ছিঁড়ে বেরিয়ে যাবার কোন সুযোগ অন্ধকারের অপশক্তি পাবে না।
সমাজের অন্ধকার দূর করার জন্য অনেকেই নিজেদের মোমবাতির মত প্রজ্বলিত করেছেন। নিজেরা নিঃশেষিত হয়েও আলো ছড়িয়েছেন শেষ পর্যন্ত্। নিজেরা মোমবাতি হয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছেন আরও অসংখ্য মোমবাতি। মাসের শুরুতে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে এমনি এক অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত ছিলাম। বাংলাদেশে নারী শিক্ষা বিকাশের নিভৃত সহায়ক এক জাপানী নারীকে সেখানে সম্বর্ধনা দেয়া হয়েছে। ‘আমরা যদি আলো হই, তবে তুমি আমাদের মোমবাতি’ শিরোনামে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রায় শ’খানেক নারী শিক্ষার্থী হিরোকো কোবায়াসী নামের ৮৬ বছর বয়সী এই জাপানী নারীকে তাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে মোমবাতি প্রজ্বলনের মাধ্যমে। মিস কোবায়াসি তার নিজের হাতের মোমবাতি দিয়ে সমবেত প্রতিটি মেয়ের হাতে ধরা মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়েছেন। নেপথ্যে তখন বেজেছে রবীন্দ্রনাথের গান, ‘আলো আমার আলো, আলোয় ভুবন ভরা’! অন্ধকার ঘরে শ’খানেক মেয়ের হাতে ধরা মোমবাতির আলোয় সে সময় পুরো কক্ষটিতে এক দারুণ আবেগ সৃষ্টি হয়েছিল। আমি দেখেছি সমবেতদের অনেকেই চোখ মুছেছেন। কোবায়াসি নিজেও আবেগ আপ্লুত হয়ে হাতের রুমাল দিয়ে নিজের দুচোখ সামলিয়েছেন। কান্না লুকাতে পারিনি আমরাও! কোবায়াসি কেবল মোমবাতির প্রতীক হননি, সত্যিকার অর্থেই গত ১৫ বছরে কয়েকশত মেয়েকে মোমবাতির মত প্রজ্জ্বলিত হতে সহায়তা করেছেন।
হিরোকো কোবায়াসি ২০০৩ সালে প্রথম বাংলাদেশে এসেছিলেন একজন ফটোগ্রাফার হিসেবে। ছবি তুলতে গিয়েছিলেন, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে একটি স্বেচ্ছাব্রতী সংগঠনের একজন হিসেবে। সেখানে মোস্তবাপুর গ্রামে ছবি তুলতে গিয়ে লেখাপড়া করতে আগ্রহী দরিদ্র এক মেয়ের আত্মহত্যার কাহিনী শোনেন। সদ্য সংঘটিত আত্মহত্যার এই
ঘটনা শুনে মর্মাহত হয়ে যান হিরোকো কোবায়াসি। কারণ তিনি নিজেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আর্থিকভাবে সংকটাপন্ন জাপানে অন্যের আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে লেখাপড়া করেছেন। হিরোকো কোবায়াসি নিজের উপার্জিত টাকা দিয়ে বাংলাদেশে ২০০৪ সালে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া মেয়েদের জন্য ‘শিক্ষাবৃত্তি’ চালু করেন। প্রতি বছর গড়ে ৮০টি মেয়ে এই বৃত্তি পেয়ে আসছে। তাঁর ইচ্ছা মৃত্যুর পরেও যেন এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকে। সেজন্য তিনি বাংলাদেশীদের সহযোগিতা চান। সুখের কথা হলো, ইতোমধ্যে বাংলাদেশে এই কর্মসূচি এগিয়ে নেয়ার জন্য একটি কমিটি গঠিত হয়েছে। আমি নিজেও সেই কমিটির একজন সদস্য।
হিরোকো কোবায়াসি’র মত অনেকেই আছেন যারা নীরবে, নিভৃতে মানুষের জন্য কাজ করেছেন। গত ২ মার্চ ইংরেজি দৈনিক ডেইলী ষ্টার ৭ জন নারীকে তাদের নিঃস্বার্থ কাজের জন্য সম্মাননা দিয়েছে। এই সম্মাননা নিতে জাপান থেকে অসুস্থ শরীরে বাংলাদেশে ছুটে এসেছিলেন হিরোকো কোবায়াসি। মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়েছিলেন। সম্মাননা পাওয়া অন্য ছয় নারী হলেন, যৌন কর্মীদের শিশুদের শিক্ষায় নিবেদিত নারী হাজেরা বেগম, মুক্তিযুদ্ধে সুন্দরবন সাব সেক্টর-৯ এর মহিলা মুক্তিযোদ্ধাদের অধিনায়ক খুরশিদ জাহান (মরণোত্তর), পোশাক কর্মি থেকে নিজেই উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা সফল নারী ছবি দাস গুপ্ত, বিনামূল্যে শিক্ষা ও আশ্রয় প্রদানকারী ৫৫ জন অনাথের পালক মাতা বিলকিস বানু, ক্যান্সারাক্রান্ত শিশুদের সেবাজননী সালমা চৌধূরী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার সংগ্রামী সংগঠক রূপা দত্ত।
পুরস্কারের টাকাটা বড় কথা নয়, যে কোন সম্মাননা বা স্বীকৃতি অন্যদের মধ্যে প্রেরণা সৃষ্টি করে। আর সে কারণেই সকল ভাল কাজকে প্রণোদিত করার জন্য সচেতন প্রয়াস থাকা দরকার। দেশে অনেক দানশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাঁরা নিজেদের মত করে সমাজের এই নিভৃত ও নীরব কর্মিদের কাজে প্রেরণা যোগাচ্ছেন। আবার অনেকেই আছেন যাঁদের ধন-সম্পদের কোন অভাব না থাকলেও এখনও তাঁরা সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলে সেই পাহাড় সুরক্ষার চেষ্টা করছেন। অথচ আমরা সবাই জানি, মৃত্যু আমাদের জীবনে সবচেয়ে বড় সত্য এবং মরণের পরে আমাদের কোন সম্পদই কাজে লাগে না, কেবল ছাদকায়ে জারিয়া ছাড়া। মানুষের জন্য ভাল যে কোন কাজকেই মহান ¯্রষ্টা পুরস্কৃত করার অঙ্গীকার করেছেন এবং তিনি নিশ্চয়ই তাঁর ওয়াদা ভঙ্গ করেন না!
আমি প্রায় ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে মিস হিরোকো কোবায়াসিকে চিনি এবং তাঁর কাজের সাথে জড়িত আছি। জাপানে তিনি একজন ইকেবানা শিক্ষক। মেয়েরা তার চোখে ফুলের মত। তিনি মনে করেন, মেয়েদেরকে ফুলের মত বিকশিত হতে দিতে হবে। বিকশিত নারীরাই একটা সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে পারে। মেয়েদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করা হলে দেশ থেকে বাল্যবিবাহ এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। মেয়েদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তোলা হলে তারা পরিবার ও সমাজের জন্য অনেক কিছু সৃষ্টি করতে পারে। মেয়েরা শিক্ষিত হওয়া মানে সমাজে শান্তি ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসা। সরকারকে তাই নারী শিক্ষায় বিশেষভাবে বিনিয়োগ করতে হবে। নারীদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ সমগ্র সমাজের দীর্ঘমেয়াদী লাভ নিশ্চিত করতে পারে।
গত ৮ই মার্চ যথাযোগ্য মর্যাদায় পাণিত হয়েছে বিশ্ব নারী দিবস। অনেক কথা, অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তারপরও হয়তো শুনতে হবে আমাদের বহু গ্রামে লেখাপড়া শিখতে আগ্রহী অনেক কিশোরি হয়তো বিয়ের পিড়িতে বসতে বাধ্য হয়েছে। অল্প বয়সে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছে অনেক মা। পাষন্ড স্বামীর হাতে নির্যাতিত হয়েছে অনেক বোন। গলায় দড়ি দিয়ে বা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন অনেকেই। এই তথ্যগুলো আমরা শুনতে চাই না। এই করুণ কাহিনীগুলোর উৎসমুখ বন্ধ করে দিতে হবে। ভালবাসার মোমবাতি জ্বালাতে হবে প্রতিটি ঘরে। সমাজের সামর্থ্যবান, বিত্তবান, হৃদয়বান মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে মানবতার সেবায়।
বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম এগিয়ে নিতে হলে নারীর ক্ষমতায়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষায় ও স্বাস্থ্য সেবায় নারীদের এগিয়ে আসার পথের বাধাটুকু দূর করতে হবে প্রথম। নারীদের ডানা ছেঁটে তাদের খাঁচা বন্দী না করে বরং তাদের সক্ষমতার পূর্ণ বিকাশে রাষ্ট্রকে সহযোগিতা করতে হবে। নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র তৈরি করতে হবে। পুরুষের রক্তচক্ষুর হাত থেকে নারীকে নিরাপদ রাখতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। দিতে হবে সহায়ক পরিবেশ।
মানবিক মর্যাদায় উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে মজবুত রাখতে হবে। কিন্তু আমাদের ভোট ব্যবস্থা প্রতিবারই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এই অশনি সংকেত কারোরই কাম্য নয়। গণতন্ত্রকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তকে রক্ষা করতে হলে নির্বাচনী ব্যবস্থায় অবিলম্বে আস্থা ফেরান। নির্বাচনী ব্যয়ের টাকা যোগাতে জনগণের কষ্ট হয়। আশাকরি সংশ্লিষ্টরা সেটা বুঝবেন। আস্থার মোমবাতিটা জ্বালিয়ে রাখুন।
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক

০১৭১১-৫২৬৯৭৯