মোবাইলের উপর থেকে কর প্রত্যাহার হোক

মোবাইলের উপর থেকে কর প্রত্যাহার হোক

জি আর এম শাহজাহান : ফ্লেক্সি দোকানদারের কথা শুনে মেজাজটাই বিগড়ে গেলো। মোবাইল রিচার্জ করতে গিয়ে যেখানে ৪৩ টাকায় ৭৫ মিনিট পেতাম, এখন নাকি ৭০ মিনিট দেবে। চায়ের দোকানে বসে একটা হিসাব করলাম। তাহলে ১০০ টাকা রিচার্জে আমাকে কত টাকা বেশী দিতে হবে। অর্থাৎ মোবাইল কলে শতকরা কত টাকা বেশী করারোপ করা হয়েছে। হিসাবটা পরিষ্কার। এখন ৭৫ মিনিট কিনতে হলে আমাকে ৪৫.০৬ টাকা দিতে হবে। আল্লাহই জানে ১ জুলাইয়ের পর কত টাকা বেশী দিতে হবে। গ্রামীণ ফোনের ৭২ ঘন্টা মেয়াদের ২ জিবি ইন্টারনেট ব্যাবহারের জন্য দাম প্রথম ছিলো ৩৮ টাকা, তারপর ৪২ টাকা, তারপর ৪৪ টাকা, তারপর ৪৮ টাকা এখন ৫৪ টাকা। অর্থাৎ শতকরা ৪২ টাকা ১০ পয়সা বেড়েছে। এ যেন মগের মুল্লূক। মাননীয় অর্থমন্ত্রী ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরের জন্য মোবাইল কলের উপর সম্পূরক শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। ফলে মোবাইলে কথা বলা, ডাটা খরচ,এসএমএস পাঠানোর খরচ বেড়ে যাবে। এখন মোবাইল অপারেটরদের বক্তব্য হচ্ছে, এই বাড়তি করারোপের ফলে ১৫% ভ্যাট, ১% সারচার্জ, ১০% সম্পুরক শুল্ক এবং আনুষাঙ্গিক খরচ মিলিয়ে করের পরিমাণ দাঁড়াবে ২৭.৭৭%। অর্থাৎ ১০০ টাকার ক্ষেত্রে ১২৭.৭৭ টাকা খরচ পড়বে। অথবা ১০০ টাকা দিয়ে আপনি ৭৮.২৭ টাকার সেবা পাবেন। বাঁকীটা সরকারের ঘরেই যাবে।

এদিকে স্মার্টফোনের উপর করের মাত্রা ১০% থেকে বাড়িয়ে ২৫% ভাগ করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর দাবী, স্মার্ট ফোন বিত্তবানরা ব্যবহার করে। তাই দাম বাড়ালাম। একজন মোবাইল ফোন বিক্রেতার কাছে জানতে চাইলাম, স্মার্টফোনের উপর কত পারসেন্ট ট্যাক্স বেড়েছে? বললো, স্মার্টফোন সবটাই আমদানি নির্ভর, বিদেশী। আগে কর ছিলো ৫% ভাগ। বর্তমানে আরো ১৫% ভাগ বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমদানিকারকরা বলছেন, সে ক্ষেত্রে আমাদের আনুসাঙ্গিক আরো ৭% বেশী খরচ পড়বে। অর্থাৎ স্মার্টফোনের উপর করের বোঝা দাঁড়িয়ে যাবে ২৭%। বাজেট পাশ হলে নাকি দাম আরো বাড়বে। বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নিজাম উদ্দিন বলেছেন, সব মিলিয়ে গুণগত এবং মান সস্পন্ন স্মার্টফোনের দাম মুলত ৫৭% বেড়ে যাবে। অর্থাৎ ২০ হাজার টাকার স্মার্টফোনের দাম হয়ে যাবে ৩১ হাজার ৪০০ টাকা। সে ক্ষেত্রে নিম্ন বা মধ্য আয়ের মানুষের মোবাইল বিলাস ঘুচে যাবে।

সূত্র বলছে, কর বর্ধিত করার কারণে স্মার্টফোন সংযোগকারীরা লাভবান হবে, আর আমদানি করা ফোনের দাম বাড়বে। সূত্র আরো বলছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার স্মার্টফোন বিক্রি হয়। অর্থাৎ একটি সেটের দাম গড়ে ২৫ হাজার টাকা হলে প্রতি বছর প্রায় ৪৮ লক্ষ মানুষ স্মার্টফোন ক্রয় করে। মোবাইল সেবা দাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, রিম ও সিম কার্ডের সম্পুরক কর ৫% ভাগ থেকে বাড়িয়ে ১০% ভাগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে এবং ১০০ টাকার সিম ২০০ টাকা করা হয়েছে। আবার মোবাইল কোম্পানি গুলোর উপর অতিরিক্ত ১.২৫% করারোপ করা হয়েছে। এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা সাড়ে ১১ কোটির মত। তার মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪ কোটির অধিক। দেশে ১৭ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে নি:স্ব, হতদরিদ্র, বিত্তহীন, নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি। তার মধ্যে অন্তত সাড়ে ৪ কোটি মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করে। এর মধ্যে সাড়ে ৩ কোটি মানুষ হতদরিদ্র থেকে মধ্যবিত্ত পর্যায়ের। বাকী সাড়ে ৭ কোটি মানুষ স্বাভাবিক ফোন (ফিচার ফোন) ব্যবহার করে। একজন গ্রাহক প্রতিদিন ২০ টাকার কথা বললে তাঁকে প্রতি মাসে অতিরিক্ত কত টাকা কর দিতে হবে? সেটি কি মাননীয় অর্থমন্ত্রী হিসাব করে দেখেছেন? এই সব অতিরিক্ত করের বোঝা বহনের ফলে মূলত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

 এবার এই লেখার কারণটা একটু বলি। ইতোপূর্বে কখনো স্মার্টফোন ব্যবহার করিনি। মাস তিনেক আগে একজন আমাকে তাঁর একটা পুরাতন স্মার্র্টফোন দিয়ে বললেন আগে ব্যবহার করাটা শেখেন তারপর দরকার হলে নতুন একটা কিনবেন। এরপর ফেসবুক বলেন, আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বলেন, ই-মেইল বলেন, টুইটার বলেন একটা ধারণা পেয়েছি। মনে মনে ভাবলাম, একটা স্মার্টফোন কিনে ফেলবো। কয়েকবার মোবাইলের দোকানে গিয়ে বিভিন্ন সেট নেড়ে-চেড়ে দাম শুনে এসেছি। পকেটটা ফাঁকা ফাঁকা। মনে করলাম কয়েকদিন পরে কিনবো। এরপরই বাজেট ঘোষণা। মাননীয় অর্থমন্ত্রী চড়ে বসলেন মোবাইল করের উপর। আমার আর স্মার্টফোন কেনা হবে কিনা জানিনা। দোকানদার বললো ১ জুলাই থেকেই দাম বাড়বে। তাহলে আমার স্মার্টফোন কেনার স্বপ্ন হয়তো স্বপ্নই থেকে যাবে। দোকানদার আরো যা বললো, সেটা তো রাষ্ট্রেরই ক্ষতি। বললো ভারতে যে সেটের দাম ৩০ হাজার টাকা সেটা এখানে দাম হবে ৫০ হাজার টাকা। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই ভারত থেকে চোরাই পথে মোবাইল ঢুকবে। এতে ক্রেতারাও দুই টাকা কমে মোবাইল কিনতে পারবে। আবার দোকানদাররাও কম দামে বিক্রি করে বেশি লাভ করতে পারবে। আবার কেউ ভারতে গিয়ে আসার সময় ২টা দামি মোবাইল নিয়ে এলে নাকি যাওয়া-আসার খরচও উঠে যাবে। বললাম, চমৎকার আইডিয়া!

শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ মধ্যবিত্ত থেকে নিচের দিকে। সম্পদের সুষম বন্টন ব্যবস্থা নাই। অথচ করের সিংহ ভাগ এই শ্রেণীকেই বহন করতে হয়। দেশের সকল মানুষের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকেই দিতে হয়। এটা নাগরিকের মৌলিক অধিকার। মোবাইল ফোন এখন নিত্যদিনের এসব চাহিদার মত অন্যতম অনুষঙ্গ। মোবাইল কল, ফেসবুক, ইন্টারনেট ইত্যাদি ছাড়া এখন আর কেউ চলতে পারেনা। সেক্ষেত্রে মোবাইল ব্যবহারকারী দেশের গরিব, বিত্তহীন, মধ্য আয়ের মানুষগুলোর উপর করের বোঝা নামিয়ে বাজেটকে গণমূখী করুন। এতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাবমুর্তি বাড়বে। ধন্যবাদ পাবেন আপনিও।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক
০১৯২৫-৭৭৪৩৮০