মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ জীবন নিয়ে খেলা

মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ  জীবন নিয়ে খেলা

মোহাম্মদ নজাবত আলী : আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি যেখানে ভেজালমুক্ত জিনিস পাওয়া দুষ্কর। এমন কি ওষুধও। অতি সম্প্রতি হাইকোর্ট মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ একমাসের মধ্যে ধ্বংস করার নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ সরবরাহ, সংরক্ষণকারি ওষুধ বিক্রেতা শনাক্ত করতে কমিটি গঠন করতে বলেছে আদালত। জনস্বার্থে এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত এ রায় দেয়। যে ওষুধ মানুষের জীবন রক্ষা করে সে ওষুধ আজ জীবন নাশের কারণে পরিণত হয়েছে।

গত বছর ২ জুলাই ধানমন্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে মেয়দোত্তীর্ণ ওষুধও রাসায়নিক সংরক্ষণের অপরাধে ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক তথ্যে জানা যায়, গত ছয় মাসের বাজার তদারকি করে রাজধানীর প্রায় ৯৩ শতাংশ ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পেয়েছেন তারা। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মানবদেহে প্রবেশ মানে জীবন নিয়ে খেলা। তাছাড়া গত বছর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গবেষণায় দেখা গেছে দেশের বেসরকারি চিকিৎসা সেবাখাতে কমিশন ভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এই খাতে বাণিজ্যকরণের প্রবণতা প্রকট। সরকারের যথাযথ মনোযোগের ঘাটতি থাকায় নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। অথচ সেবা গ্রহীতারা ব্যাপকভাবে আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতির শিকারের পাশাপাশি মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিতও হচ্ছেন। এতে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিবন্ধিত ১১৬টি বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। উপরোন্ত মানহীন, নকল, ভেজালও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বাজারজাতকরণে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, উৎকন্ঠা ও শংকা দেখা দিয়েছে।

চিকিৎসা এক মানবিক সেবা ও পেশার নাম। মানব সেবার নামে এ সেবায় অর্থ, মুনাফা বা অন্য কিছু অর্জনের চেয়ে মানব সেবায় মুখ্য হওয়া উচিত। মানবসেবার মধ্যে নাকি সৃষ্টিকর্তাকে পাওয়া যায়। জ্ঞানী গুণীর মুখ থেকে আমরা বহুবার এরকম সত্য নীতিবাক্য আগেই শুনেছি। তাই টাকা-পয়সা সব কিছুর উর্ধ্বে থেকে কায়মনো বাক্যে হৃষ্ট চিত্তে মানব সেবায় প্রাধান্য পাওয়া উচিত। যুগ যুগ ধরে চিকিৎসার এ মানব বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে আসছে চিকিৎসক বা ভিষকবৃন্দ। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, কালের বিবর্তনে চিকিৎসায় মানুষের সেবার ক্ষেত্রে সে সত্যবোধ নীতিবাক্য হারিয়ে গিয়ে প্রাধান্য পেয়েছে অর্থ বাণিজ্য। যার কারণে বর্তমানে হাজার বছরের চিকিৎসায় মানবসেবার দিকটা আজ উপেক্ষিত। আমাদের মৌলিক অধিকারের মধ্যে চিকিৎসা একটি। তাই আমাদের সংবিধানেও মানবসেবায় স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাকে অন্তর্ভূক্ত করে নাগরিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। আমাদের স্বাধীনতার ৪৫ বছরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরে যেমন উন্নতি হয়েছে তেমনি দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক স্থাপিত হয়েছে। চিকিৎসাকে প্রকৃত অর্থেই মানবসেবায় পরিণত করতে বেসরকারিভাবে আরও হাসপাতাল ক্লিনিক স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে সরকার। মানুষ বেকায়দায় বা সমস্যায় না পড়লে পুলিশ বা ডাক্তারের শরণাপন্ন হয় না। সাধারণ নাগরিক স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশা করে চিকিৎসা সেবাকে প্রকৃত অর্থেই মানবিক সেবা ও পেশা হিসেবে বেছে নিবে এসব সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। দেশে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে স্থাপিত কিছু হাসপাতাল ও ক্লিনিক মানব সেবার হাত বাড়িয়ে দিলেও বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের ভূমিকা যথার্থ নয়, প্রশ্নবিদ্ধ। মানবসেবার নামে যে চিকিৎসা শাস্ত্রের তৈরি হয়েছে, ডাক্তার তৈরি হয়েছে কিন্তু অধিকাংশ ডাক্তারের আচার-আচরণ সন্তোষজনক নয়। সেবার মানও প্রশ্নবিদ্ধ। অর্থ অর্জনের জন্য ব্যাঙের ছাতার মতো গজে উঠা বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকে পর্যাপ্ত ডাক্তার নেই প্রয়োজনীয় ওষুধ সামগ্রির যথেষ্ট অভাব। এ সমস্ত হাসপাতাল ক্লিনিকের মালিকরা যা ইচ্ছে তাই করেন। সরকারের নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেন না।
অথচ স্বাস্থ্য চিকিৎসাকে জনগণের মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে সংবিধানে। দেশের সরকার অনুমোদিত ও অননুমোদিত অনেক চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। অধিক ব্যয় সাপেক্ষ এসমস্ত চিকিৎসা কেন্দ্রে সবার পক্ষে চিকিৎসা নেয়া সম্ভব নয়। সমাজে যারা অর্থ বিত্তশালী তাদের চিকিৎসা অধিক ব্যয় সাপেক্ষ হলেও নিম্ন মধ্য হতদরিদ্র পরিবারের সদস্যের চিকিৎসা নেয়া অনেকটা কঠিন। উপরোন্ত ভুল চিকিৎসা প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি এ সমস্ত বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে দেশের প্রায় ৬৮ভাগ মানুষ চিকিৎসা নেয়। কিন্তু সমাজের এ সিংহভাগ মানুষরা প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সরকারের তদারকি না থাকায় মালিকরা কোনো কিছুই তোয়াক্কা করেন না। অথচ এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক অনুমোদন পেয়েছে। দেশের হাসপাতাল ক্লিনিক, কমিউনিটি সেন্টারগুলো গড়ে উঠেছে মূলত জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে। বেসরকারিভাবে গড়ে উঠা হাসপাতাল ক্লিনিক, পরিচালনা করতে গেলে যে চিকিৎসার যন্ত্রপাতি ওষুধের প্রয়োজন পড়ে তা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এ সমস্ত চিকিৎসা সামগ্রি বা ওষুধের জন্য বেসরকারি উদ্যোক্তারা সরকারি ভর্তুকিও পেয়ে থাকেন। কিন্তু তারা অধিকাংশ সময়ই রোগিরা সঠিক চিকিৎসা ও সেবা পান না। যেটুকুই পান তা অর্থের বদৌলতে। পর্যাপ্ত ওষুধ, আধুনিক যন্ত্রপাতি, উপযুক্ত প্যাথলজি নেই। আবার কখনো কখনো অপচিকিৎসা বা ভুল চিকিৎসায় রোগির মৃত্যু হলে লঙ্কাকান্ড শুরু হয় চিকিৎসা ফিও অনেক যা গরিব মানুষের পক্ষে অনেকটা কঠিন। অভিযোগ রয়েছে ডাক্তারদের সার্টিফিকেট ও দক্ষতা নিয়েও। কোনো রোগি এলেই তাকে প্যাথলজি, রক্ত বা অন্য কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় তাদের মনোনীত কোনো ক্লিনিক বা ল্যাবরেটরীতে। কারণ সেখান থেকেও ডাক্তাররা আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকেন। তাই জনগণের স্বাস্থ্যসেবার নামে যা চলছে তাতে সাধারণ মানুষরা প্রতারণার শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ওষুধের গুরুত্ব অপরীসিম। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, বর্তমান ওষুধের গুণগত মান এতটা নিম্নমুখী যে তাতে রোগির রোগ ভালো তো হয় না বরং রোগ আরও বেড়ে যায়। বাংলাদেশে যেভাবে ওষুধ শিল্পের প্রসার ঘটেছে তা অভাবনীয় এবং ইতিবাচক। সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, ওষুধ শিল্পের প্রসার ও নিয়ন্ত্রণে জাতীয় ওষুধ নীতি-২০১৬ এর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে। পাশাপাশি এটাও আমাদের মনে রাখা উচিত ওষুধ হচ্ছে জীবন রক্ষাকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাংলাদেশে উৎপাদিত বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ পৃথিবীর ১৫০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়। তাই ওষুধের যেন গুণগত মান বজায় থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখা অবশ্যই উচিত। ভেজাল ও মানহীন ওষুধ মানবজীবনে ক্ষতিকর যেমন ক্ষতিকর ভেজাল খাদ্য। পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায় বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন মার্কেটে অভিযান চালিয়ে প্রচুর পরিমাণ অনিবন্ধিত নকল ভেজাল ওষুধ জব্দ করা হয়। এক শ্রেণির অসাধু অতি মুনাফালোভী চক্র রয়েছে যাদের কাজই হচ্ছে মানুষকে ঠকানো এবং এরাই নকল ভেজাল ওষুধ সরবরাহ করে থাকে। তবে ভেজাল নকলের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের এন্টিবায়োটিক ওষুধ। সম্প্রতি সরকার বেশ কয়েকটি ওষুধ কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করেন। পাশাপাশি ২৩টি কোম্পানির এন্টিবায়োটিক সহ বিভিন্ন ওষুধ উৎপাদন, বিপণনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তবুও কিছু কিছু কোম্পানী সরকারের নির্দেশ উপেক্ষা করে মানহীন ওষুধ উৎপাদন বিপণন অব্যাহত রেখেছে বলে জানা যায়। সঙ্গত কারণেই বিষয়টি আমলে নিতে হবে এবং আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। হাইকোর্টও সে ধরনের নির্দেশ দিয়েছে। কারণ সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা, মানহীন নকল ভেজাল ওষুধের ব্যবহার মানুষের জীবনকে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর মুখে এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এ যেন মানুষের জীবন নিয়ে খেলা।

ওষুধের গুণগত মান নির্ণয়ের দায়িত্ব ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের। এ প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র দু’টি ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি রয়েছে। এগুলোতে বছরে সাধারণত ৪ থেকে ৫ হাজার ওষুধের নমুনা বা গুণগত মান পরীক্ষা করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের বিভিন্ন ওষুধ কারখানাগুলোতে ২৭ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদিত হয়। যদি তাই হয়ে থাকে ২২ হাজার ওষুধ কোনো রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই বাজারে চলে যাচ্ছে, বিক্রিও হচ্ছে অবাধে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, ওষুধের মধ্যে যেহারে বিভিন্ন উপাদান থাকার কথা সেগুলো না থাকলেই ওই ওষুধ মানহীন। আর মানহীন ওষুধই হচ্ছে বিষ। তাহলে মান নির্ণয়ের পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি না থাকায় এসব ওষুধ সেবনের নামে মানুষ বিষ পান করছে ! নকল ভেজাল মানহীন ওষুধ রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে রোগকে আরও বাড়িয়ে দিবে। তাছাড়া প্রায় প্রতিদিন নতুন নতুন ওষুধও বাজারে আসছে। কি পরিমাণ ওষুধ বাজারে আসছে তার সঠিক কোনো তথ্য যেমন নেই তেমনি ওষুধের মান নির্ণয় ও যথাযথ হচ্ছে না। ওষুধ শিল্পকে আরও গতিশীল ও নিয়ন্ত্রণ করা, মান নির্ণয়ে ল্যাবের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। বাংলাদেশের ওষুধ একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। জাতীয় ওষুধ নীতিমালায় কিছু দিক সন্নিবেশিত করা হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কার্যকর, নিরাপদ ও মানসম্পন্ন ওষুধ। তাই নকল, ভেজাল, নিম্নমান, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ফার্মেসিতে মজুদ, প্রদর্শন শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে নীতিমালায় এসেছে। তা সুষ্ঠু বাস্তবায়ন জরুরি। তেমনি আদালতের নির্দেশনা মানাও জরুরি। শুধু নীতিমালা বা আইন করলেই চলবে না তার যথার্থ প্রয়োগ ঘটাতে হবে।
বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো দেখভাল করার জন্য নিয়ন্ত্রণে একটি ‘স্বাধীন কমিশন’ গঠন করা দরকার। এখাতে অনিয়ম, দুর্নীতি বন্ধ ও সেবার মান বাড়াতে তদারকির কোনো বিকল্প নেই। শুধু বেসরকারি নয় সরকারি স্বাস্থ্যসেবাগুলোতেও চলে বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতি। বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের উজ্জল সম্ভাবনা রয়েছে। তাই উৎপাদিত ওষুধের মানের দিকে নজর অব্যাহত রাখতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। নকল ভেজাল নিম্নমানের ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার ও সরকারি বেসরকারি চিকিৎসাসেবার খাতটি যেন প্রকৃতপক্ষেই জনগণের সেবায় পরিণত হয় জীবন নাশের কারণ না হয়।
লেখক ঃ শিক্ষক ও কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১