মেসি-ম্যারাডোনার দেশের কোলম্যানের ভালো লাগে বাংলাদেশ

মেসি-ম্যারাডোনার দেশের কোলম্যানের ভালো লাগে বাংলাদেশ

ঢাকার রাজপথে কোনো আর্জেন্টাইন যদি রিক্সাওয়ালাকে বলেন ‘এই ধানমন্ডি যাবে? ভাড়া কয় টাকা? তা দেখে অবাকই হবেন অনেকে। আবার রিক্সায় চড়ে যদি চালককে নির্দেশনা দেন ‘ডানে যাও ডানে।’ কিছুক্ষণ পর ‘বামে কিংবা সোজা।’ তাহলে?

আবার ভাড়া মেটানোর সময় যদি বড় নোট দিয়ে বলেন ‘বাকি টাকা ফেরত দাও।’ সব কিছুই অবাক করার মতো, তাই না? বাস্তবতা হলো এরিয়েল কোলম্যান নামের এক আর্জেন্টাইন এভাবেই বাংলা ভাষাটাকে রপ্ত করে দিব্যি চলাফেলা করছেন রাজধানীতে।


তো কে এই এরিয়েল কোলম্যান? দেশের ফুটবলের একটু আধটু খবরও যারা রাখেন তারা নিশ্চয়ই চিনে ফেলেছেন ম্যারাডোনা-মেসির দেশের এই ভদ্রলোককে। তিনি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের দল শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের ট্রেনার। আছেন ২০১৩ সাল থেকে।

এরিয়েল কোলম্যানের এর চেয়েও বড় পরিচয় আছে। তিনি প্রথম ঢাকায় আসেন ২০০৫ সালে। জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক কোচ ক্রুসিয়ানির কথা মনে আছে তো? ওই সময় তার সঙ্গেই জাতীয় দলে যোগ দিয়েছিলেন কোলম্যান। ক্রুসিয়ানি চলে যাওয়ার পর এ আর্জেন্টাইন জাতীয় দলে জুটি বেঁধেছিলেন মাঠে তাদের চিরশত্রু ব্রাজিলের এডসন সিলভা ডিডোর সঙ্গে। ডিডো ২০০৮-০৯ সালে জাতীয় দলের কোচ ছিলেন। তখনো কোলম্যান ছিলেন ট্রেনার।

মাঝে ৩ বছর নিজ দেশেই চাকরি করেছেন কোলম্যান। তারপর ২০১৩ সালে শেখ জামালে যোগ দেন। সেই থেকে প্রিমিয়ার লিগের তিনবারের চ্যাম্পিয়নদের ঘরের ছেলে হয়ে কাজ করছেন। ধানমন্ডিপাড়ার দলটির সুখে-দু:খে মিসে গেছেন মেসি-ম্যারাডোনার দেশের ৫০ বছর বয়সী এ ভদ্রলোক।

বাংলাদেশকে চেনেন ১৪ বছর ধরে। সময়টা কম লম্বা নয়। এর মধ্যে ২০১৫ সালে পুরো পরিবার নিয়েই আস্তানা গেড়েছিলেন ঢাকায়। কিন্তু এখানে বেশি দিন সংসার করা হয়নি তার। স্ত্রী ক্লেতিয়া বুয়েন্স আয়ার্সে চাকরি করেন। ১৮ বছরের ছেলে থমাসও সেখানে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যায়নরত। ছোট ছেলে লুকাসও স্কুলে যায়। তাই ৬ মাস পরই তাদের দেশে পাঠিয়ে একাই ঢাকায় কাটিয়ে দিচ্ছেন কোলম্যান।

স্ত্রী-পুত্ররা দেশে, আপনি ঢাকায়। খারাপ লাগে না? ‘তাতো লাগেই। তবে আমি ঢাকায় যখন অবসরে থাকি তখন ওদের (স্ত্রী ও দুই পুত্র) সঙ্গে কথা বলি। ভিডিওতে দেখি। দূরে থাকলেও প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের কাছে টেনে আনি। ছুটি পেয়ে দেশে গিয়ে তাদের সঙ্গে কিছুদিন থেকে আসি’-বলছিলেন কোলম্যান।

দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে থেকে এ দেশের অনেক কিছুই ভালো লেগেছে এরিয়েল কোলম্যানের। স্বাচ্ছন্দে চলাফেরার জন্য বাংলা ভাষাটাও বেশ ভালো রপ্ত করেছেন। বাংলাদেশের খাবারের মধ্যে চিকেন বিরিয়ানি, কাবাব ও ইলিশ মাছ বেশ মনে ধরেছে তার।

বাংলা শেখা প্রসঙ্গে কোলম্যান বলেছেন, ‘আমাকে অনেক সময় রিক্সায় চড়তে হয়। তাদের গন্তব্যের কথা বলা, ভাড়া ঠিক করার জন্য বাংলা না জানলে সমস্যা হয়। ভাড়া ঠিক না করে রিক্সায় উঠলে অনেক চালক বেশি টাকা দাবি করে। তাই রিক্সায় ওঠার আগে ভাড়া ঠিক করে নেই।’

ঢাকার রিক্সা চালকরা নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত চেয়ে থাকে অনেক সময়। যে কারণে ৬০ টাকা ভাড়া চাইলে ৪০ টাকা বলেন তিনি। রিক্সাচালক যখন বোঝেন এ ভীনদেশিকে ঠকানো যাবে না তখন প্রকৃত ভাড়াতেই তাকে নিয়ে যান।

হোটেল-রেস্তোরায় খাবারের দাম জানতে যাওয়া, দোকান-পাটে কেনাকাটা করাসহ আরো প্রয়োজনীয় বাংলা শিখেছেন কোলম্যান। তো আর কী কী শিখেছেন? জিজ্ঞেস করতেই ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলে হো হো হাসি। তো এখানে কোনো নারীকে ভালো বেসেছেন? মানে লাভ? বলতেই ‘নো নো’ করে হাসতে থাকেন।

কেন কাউকে কখনো ভালো লাগেনি? কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই? ‘আসলে আমি কাজ এবং অবসরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার বাইরে আর কিছু নিয়ে তেমন ভাবি না। প্রেম করার সময় কই? আই অ্যাম ফিফটি নাউ। হা হা হা’-আবার হাসি।

বাংলাদেশটা কেমন লাগছে, বিশেষ করে ঢাকা? ‘আমার বয়স যখন ৩৬ বছর তখন ঢাকায় প্রথম এসেছি। এখন ৫০। মাঝে বছর তিনেক ছিলাম না। তো এতদিন থেকে এ দেশটা ভালোবেসে ফেলেছি। বাংলাদেশ এখন আমার সেকেন্ড হোম হয়ে গেছে। ফুটবল দলের সঙ্গে অনেক শহরে যাওয়া হয়। এ দেশ সম্পর্কে ভালো ধারণাও হয়েছে’-বলেন কোলম্যান।

তো মেসি আর ম্যারাডোনার দেশের মানুষ আপনি। তাদের কখনো দেখেছেন? ‘দুই জনের মধ্যে আমার প্রিয় খেলোয়াড় ম্যারাডোনা। মেসিকেও অনেক পছন্দ করি। সে বড় মাপের খেলোয়াড়। তবে কাউকেই সামনাসামনি দেখিনি’-জবাব শেখ জামালের এ ট্রেনারের। এখন দেখছি আপনি নতুন স্টাইলে দাড়ি রেখেছেন। কারণ কী? ‘এভাবে দাড়ি রাখায় আমার স্ত্রী আর দুই ছেলে বলে-তোমাকে তো মেসির মতো দেখা যায়’-বলেই হাসি কোলম্যানের।