মূল্যবোধের হালখাতা শুরু হোক নতুন বছরে

মূল্যবোধের হালখাতা  শুরু হোক নতুন বছরে

নার্গিস জামান : ‘মাঠ ঘাট বন পুড়ছে যখন/ অগ্নিখরায় তাপে/ পুড়ছে পৃথিবী পুড়ছে জীবন/ পারমাণবিক পাপে/ যখন মানুষ,পশু ও পাখির জীবন ওষ্ঠাগত/ তখন বোশেখ এলো পৃথিবীতে/ হাতেমতায়ীর মতো’। কবি যথার্থই বলেছেন। পৃথিবীর সকল জরাগুলোর প্রতিবাদ করাই যেন কবির কলমের দৃপ্ত অঙ্গীকার! কবি এখানে বলেছেন, যখন পাপ, তাপ, অগ্নিখরা দাবদাহে পুড়ছে; জীবন, মানুষ ও পশুপাখি, ঠিক তখনি বৈশাখ এলো হাতেমতায়ীর মতো সকল জরা, পাপ তাপ ধুয়ে নিতে। এখানে পৃথিবীর যত আবর্জনা রুদ্র বৈশাখে ধুয়ে যাবে মনে করা হলেও আসলে কবি বলতে চেয়েছেন হৃদয়ের সকল পাপ পঙ্কিলতা ধুয়ে মুছে মানুষ হয়ে উঠুক প্রকৃত মানুষের মত নিষ্কলুষ, নির্মল! পাপের পুরনো হালখাতা বন্ধ হয়ে যাক। পূণ্য, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের নতুন হালখাতা শুরু হোক নতুন বছরে। ছোটবেলার বৈশাখ নিয়ে স্মৃতি চারণ হোক এবার। বৈশাখ আসলেই কাঁচা মৌরির গন্ধ পাই। জানিনা আপনারা পান কিনা! আমাদের বান্নিবাড়ি বলতে ছিল চড়কবাড়ি। যদিও ওদিকটাতে আমাদের যাওয়া হত না, তথাপিও এর আমেজ আমরা পেতাম যেন বাতাসে, বাড়ির বাইরে বের হলেই। মেয়েরা সব জটলা করতাম উঠোনে পথের ধারে। আর সে পথেই লোকেরা দলে দলে থোকা থোকা কাঁচা মৌরি হাতে নিয়ে মেয়ে বৌদের উদ্দেশ্যে চলতে থাকতো। আমরা কাঁচা মৌরির সুবাসে মোহিত হতাম! যাদের আনার কেউ ছিল না, তাদের ভাগেও কম পড়তোনা। সবাই ভাগাভাগি করে নিতাম। পাড়ার সকলে যেন মোরা ভাইবোন। পথের উপরে টুংটাং বাজিয়ে চলতো মালাই আইসক্রিমওয়ালা। পাড়ার আঙ্গিনায় মেয়েদের হাট বসত যেন! সবাই ভাজা শক্ত বীজ চিবিয়ে দাঁতে শান দিত ইঁদুরে দাঁতের মত। আর একটি কাজ ছিলো, সূতা লাটাইয়ে মাঞ্জা দেয়া। হাত কেটে-টেটে কাঁচগুড়ো করে শিরিশ দিয়ে মাঞ্জা দিতাম ভাইয়ের সাথে। ভাইয়েরা গুড্ডি খেলবে, বোনেরা তাতেই খুশি। কাঁচগুড়ো করে দিতাম, শিরিশ আঠা সূতোয় মেখে তাতে কাঁচগুড়ো দিয়ে শুকানো হত। এভাবে লাটাইয়ের সূতা শুকিয়ে কড়কড়া করা হত, সূতোর যত ধার, তত ভোকাট্টা। গুড্ডি কাটতে পারলে চিৎকার করে বলা হত ভোকাট্টা! আহা! সোনালি দিন আমার! সেদিনের সেসব মজার কান্ডগুলো আজকের মঙ্গল শোভা যাত্রার চেয়ে কম ছিল না কিছুতেই। বৈশাখে যে পান্তা ইলিশ খেতেই হবে এমন ছিলনা। এখন ইলিশ অধরা, দুষ্প্রাপ্য বস্তুু যেন! একজন ফেসবুকে ইলিশের ফান পোস্ট দিয়েছে এরকম, ‘আগে এদেশের মানুষ আস্ত ইলিশ কিনে খেতো। বলেন কী? তখন মানুষ খুব ধনী ছিলো? না ভাই মানুষ ধনী ছিলোনা, ইলিশ মাছ গরীব ছিলো।’ আসলেও ইলিশ গরীব ছিলো। ষোলটাকা জোড়া! এখন ইলিশ বিদেশে গিয়ে ধনী হয়েছে, তাই তার নাগাল পাওয়া যায়না। আরেক গুণীজন স্ট্যাটাস দিয়েছেন, ‘আমাদের সম্পদশালী ব্যবসায়ীরা তাদের সম্পদশালী ডায়াস্পোরা’দের জন্য ফ্রিজারে ভরে ইলিশ বিদেশে পাঠিয়ে দেয়। আপনি পাবেন কি করে? বাংলাদেশের ইলিশের গন্ধে ভারত, ইংল্যান্ড, আমেরিকার বাতাস ভরে থাকে।’ মনে আছে পৌরবাজারের ইলিশের জন্য মাইকিং দিত; জোড়া ইলিশ ষোল টাকা! দেড় দুই কেজি ওজনের ডিমালি জোড়া ইলিশ আনতেন বাবা। বই কচু দিয়ে ইলিশ নয়, বরং ইলিশ দিয়ে বইকচু হতো। দুঃখজনক হলো যে আমাদের সাধারণ ইলিশ অসাধারণ হয়ে এখন চলে গেছে পুঁজিপতির ঘরে। ব্যস্ত যুগে কাজের চাপে সেসব গল্প বলার আর সুযোগ হয়ে ওঠেনা। তারাও ব্যস্ত। জানিনা কী কারণে আমরা এত ডিজিটাল! আগে তো মা দাদীরাও সংসার করেছে, আমরা যা খাই তারাও খেয়েছে। কিন্তু তাদের ছিল অঢেল সময়, অঢেল শান্তি। আমরা বিজি আর বিজি! একটু ফাঁক পেলে ভদ্র সমাজ, ফেসবুক পাড়ায়ও তো একটু ঢুকতে হয়! আর আছে সিরিয়ালও। গল্পের সময় কোথায়! আর আমাদের সন্তানরা আরও বিজি। দুপুরে ঘুম থেকে উঠে আর রাতভর পড়ার নামে চ্যাটিং!  অভিভাবকদেরও কম দোষ নয়, আপনি যা চর্চা করবেন, করাবেন তারাও তাই করবে। ছোটতেই হাল ধরুন, বই পড়ার অভ্যেস করুন। তাদের বই চয়েস করে দিন। আমি প্রচুর বই পড়ার সুযোগ পেতাম বাবার সুবাদে। কবির কথায় আবার ফিরে আসি, ‘বোশেখ এসেছে ফুলবৃষ্টির, ধুয়ে যাক শোক তাপ/ কাল বৈশাখী এনেছে সঙ্গে উড়ে যাক যত পাপ!’ শিল্পীর সুরে বলতে চাই,‘খা খা খা বখখিলারে খা।’ কাল বৈশাখের রুদ্রমূর্তি যেন সাধারণ মানুষের ক্ষতিসাধন না করে। বরং পুঁজিপতি, ধর্ষক, অন্যায়কারীদেরকে সতর্ক করে দেয়। আর আমরাও যেন নতুন বছরে পাপ পঙ্কিলতা ধুয়ে ফেলে জীবন ও চরিত্রের নতুন হালখাতা খুলে সুন্দর করি প্রকৃতি ও পৃথিবীকে।
লেখক: শিক্ষক, কবি ও প্রাবন্ধিক
০১৭৩০-২৬৪৪৯৭