মুজিববর্ষে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করা হোক

মুজিববর্ষে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করা হোক

মোহাম্মদ নজাবত আলী: ইতিহাসের বিষয়বস্তু মানুষ, সভ্যতা, সমাজ ও পরিবেশ। এসবের মাঝে বেড়ে উঠা মানুষগুলোর মধ্যে যে মানুষের চিন্তা ভাবনা, চেতনা কর্ম এক বৃহৎ জনগোষ্ঠির মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে এক কাতারে নিয়ে সার্থক প্রতিনিধি রূপে আবির্ভূত হন এমন মানুষ ইতিহাস সৃষ্টি করে, ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করে। আবার ইতিহাসের প্রয়োজনে কোন কোন মানুষের আবির্ভাব ঘটে। মুজিবের, জন্ম কি ইতিহাসে প্রয়োজন হয়েছিল ? যদি না হয় তাহলে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করলেন বা কিভাবে ? বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গর্ব ও আনন্দের বছর হলো ২০২০ সাল। বাঙালি জাতির কাছে বর্তমান বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এ বছরই আগামি ১৭ই মার্চ পালিত হবে স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার, স্বাধীনতার মহানায়ক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জন্মশত বার্ষিকী। বর্তমান বছর মুজিববর্ষ হিসেবে পালন করবে বাঙালি জাতি। জাতি স্বরণ করবে মুজিবের সংগ্রামী জীবন ত্যাগ, তিতিক্ষা, নীতি, আদর্শ। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর কীর্তি স্মরণ করা বর্ষ ‘মুজিববর্ষ’। স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদান জাতির কাছে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এদেশের ভাষা অন্দোলন থেকে স্বাধীকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর গৌরবময় ভূমিকা বাঙালি জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। সাধারণ মানুষের স্বপ্ন স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামে কীভাবে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে স্বাধীনতার দ্বার প্রান্তে পৌছে দিয়েছেন। কেউ কি কোনো দিন ভেবেছিল শেখ পরিবারে জন্ম নেয়া খোকা নামে এ ছেলেটি বাঙালি জাতির লড়াই সংগ্রাম, স্বাধীনতায় নির্যাতিত, নিপীড়িত জনগোষ্ঠির ত্রাণকর্তা, মুক্তির দিশারী হবেন ?
বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে আমরা স্বাধীন দেশ পেতাম না। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে আমরা নিজেকে পরিচয় দিতে পারতাম না। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তার সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। একটি ঘুমন্ত জাতিকে জাগ্রত করেছেন । শিখিয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা। প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন এক অসাধারণ সাহসী যোদ্ধা নেতা। এই রকম নেতা যুগে যুগে জন্মায় না। তার সঙ্গে কেবলমাত্র তুলনা চলে মহাত্মা গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলা, আব্রাহাম লিংকন, ফিদেল ক্যাষ্ট্রো’র মত বিশ্ব বরেণ্য স্বাধীনতা স্থপতি ও নেতাদের। তিনি আমাদের একটি পতাকা, মানচিত্র, স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন। সারা বিশ্বে স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে তিনি পরিচয় অর্জন করেছেন। বাঙালি জাতি তার কাছে ঋণী।
আগামী ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন মুজিববর্ষ হিসাবে পালিত হবে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, ধ্বংস প্রাপ্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে বঙ্গবন্ধু শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষে এবং প্রাথমিক শিক্ষাকে দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে একসাথে সাঁইত্রিশ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করেন। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে প্রাথমিক শিক্ষাকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে তিনি সরকারিকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংস্কার ও পুন:নির্মাণ করেন যা শিক্ষাবান্ধব সরকারের কাজ এতে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি ভালো করেই জানেন, শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি উন্নতি করতে পারেনা। শিক্ষাই মানুষকে আলোকিত করে। শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠি মানবিক হয়। একই সাথে বিভিন্ন গুণে গুণান্বিত হয়ে সুকুমার বৃত্তির উন্মেষ ঘটে। তাই যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি দেশকে সার্বিক দিক থেকে পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন তিনি অনেকটা সফল ও হয়েছিলেন। তার স্বপ্ন ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাংলাকে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং একই সাথে বাংলাকে সোনার বাংলাই পরিণত করা। শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, যোগাযোগ ব্যবস্থা সহ সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তোলা। মোটা দাগে বলা যেতে পারে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি সহ একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি প্রতিষ্ঠা করা। স্বাধীনতা লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের আগেই ঘাতকরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা। এ জঘন্য হত্যাকান্ড তৈরি করে রাজনৈতিক শূন্যতাও ব্যাহত হয় গণতান্ত্রিক উন্নয়নের ধারা।
তিনি বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ আজ অনেক আগেই উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হত। জাতি তার স্বপ্নের সোনার বাংলা পেত। যদিও প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে কাজ করে যাচ্ছেন। বাঙালি জাতির দূর্ভাগ্য যে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা পরবর্তী স্বল্প সময় আমাদের মাঝে ছিল। আমাদের সৌভাগ্য তারই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে  দীর্ঘ সময় জাতি পেয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাঙালি জাতির আশা আকাঙ্খার প্রতিক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের উন্নয়নের অবদান রাখছেন। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর মতোই শিক্ষাবান্ধব সরকার। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর প্রাথমিক শিক্ষাকে সরকারিকরণের ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনা ছাব্বিশ হাজার রেজিষ্টারভুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারি করণ করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয় যে শিক্ষার গোড়া তার ভিতকে বঙ্গবন্ধুর মতো তিনিও শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করান।
১৯২০ সালে মুজিববর্ষ শুরু হয়ে চলবে ২০২১ সাল পর্যন্ত। সংগত কারণে এই দুটি বছর আমাদের কাছে অতি গৌরবের। শেখ মুজিবের আদর্শ নীতি নৈতিকতায় অনুপ্রাণিত হওয়ার বছর। তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় নতুন করে শপথ নেওয়ার বছর। নতুন প্রজন্মের কাছে মুজিবের আদর্শ সংগ্রামী জীবন ছড়িয়ে দেওয়ার বছর। একটি শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মুজিবের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের কথা জাতিকে স্মরণ করে দেওয়ার বছর। ২০২১ সালে পালিত হবে স্বাধীনতার পঞ্চাশতম বছর সুবর্ণ জয়ন্তী। স্বাধীনতার এ দীর্ঘ সময়ে আমাদের সাফল্য যেমন রয়েছে তেমনি ব্যর্থতাও। স্বাধীনতার প্রায় পঞ্চাশ বছরে আমাদের অর্জনের ক্ষেত্র বিশাল হলেও অপ্রাপ্তিও রয়েছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি রষ্ট্রে প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করার যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন আজ পর্যন্ত কেউ সে সাহসিকতার পরিচয় দিতে পারেননি। এখনো শিক্ষার অন্যান্য স্তর বেসরকারি রয়েছে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের দুঃসাহস তিনি দেখাবেন এমনটি আশা করা যেতেই পারে। কেননা দেশ পরিচালনায় তাঁর কিছু কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত ও সাহসিকতার পরিচয় রয়েছে।
২০২০ সালে ১৭ই মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ এ দুবছর মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী যথাযথ ভাবে শুধু বাংলাদেশই উদযাপন করবেনা উদযাপিত হবে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো বাংলাদেশের সাথে পালন করবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি শিক্ষকদের জাতিয় স্কেল প্রদান করেন। যুগের পর যুগ ধরে অবহেলিত ননএমপিও শিক্ষদের (একাংশ) এমপিওভুক্ত করেন এবং পর্যায়ক্রমে অবশিষ্ট ননএমপিও শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করা হবে বলে আশ্বাস প্রদান করেন। তাছাড়া ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষা ক্ষেত্রে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়া, নির্দিষ্ট তারিখে পিইসি, জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষা শুরু ও ফল প্রকাশ। মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা অধুনিকীকরণ, বহির্বিশ্বের সাথে সংগতি রেখে যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নসহ শিক্ষা ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তবুও সরকারি বেসরকারি শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন বৈষম্য ও অনিয়ম রয়েছে। এসব বৈষম্য দুরিকরণে গ্রহণযোগ্য সমাধান হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে সরকারিকরণের দাবী দীর্ঘদিনের। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট তাই দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষকদের দাবী ও প্রত্যাশা ‘মুজিববর্ষে’ বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা সরকারিকরণ করা হোক। কারণ তারা শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট গোটা শিক্ষক সমাজের আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে। গোটা শিক্ষক সমাজ বিশ^াস করে প্রধানমন্ত্রীর সততা, নিষ্ঠা দুরদর্শিতায় বাংলাদেশ শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর যোগ্য নেতৃত্বে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা পেয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে ঋণী, তেমনি বেসরকারি শিক্ষব্যবস্থা সরকারিকরনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নিকট শিক্ষক সমাজ চির কৃতজ্ঞ থাকবে। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ অবিচ্ছেদ্য, তেমনি শেখ হাসিনার দেশের  উন্ন্য়ন একই সুত্রে গাঁথা। দেশের এ উন্নয়নের অংশীদার সমাজের অন্যান্য পেশাজীবীদের মতো বেসরকারি শিক্ষকরাও। সরকারি বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে যে আর্থিক অসংগতি ও বৈষম্য রয়েছে তা সমতা আনয়নের লক্ষ্যে অতিতে তারা বিভিন্ন সময়ে শ্রেণি কক্ষ ত্যাগ করে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়। বিশেষ করে বাড়িভাড়া, ইনক্রিমেন্ট, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতার মধ্যে এখন সীমাহীন বৈষম্য রয়েছে। বেসরকারি শিক্ষকদের জাতীয় স্কেল প্রদান করলেও এ বৈষম্যগুলো রয়ে গেছে। এসব বৈষম্য দুরিকরণে ‘মুজিববর্ষে’ চাকরি জাতীয়করণ করা হোক।
বিদেশে একজন শিক্ষককে সম্মানের চোখে দেখা হয়। তাদের যথেষ্ট সামাজিক মর্যাদা রয়েছে। এর কারণ বহির্বিশ্বে শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করা হয়েছে। আমাদের দেশে মেধাবীরা  সহসায় এ পেশায় আসতে চায়না। এর কারণ বেতন ভাতাদি সরকারি চাকরিজীবিদের চাইতে অনেক কম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকতার সাথে বেসরকারি শিক্ষকদের আর্থিক সংকট ও বৈষম্য বিবেচনা করে “মুজিববর্ষে” শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের মাধ্যমে এর সম্মানজনক সমাধান করবেন- এমনটি আমরা প্রত্যাশা করি।
লেখক : শিক্ষক-কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১