মুক্ত গণমাধ্যম নিশ্চিত হোক

মুক্ত গণমাধ্যম  নিশ্চিত হোক

মো. ওসমান গনি : মুক্ত গণমাধ্যম ব্যাপারটির সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। সঠিক আর বস্তুনিষ্ঠ তথ্য কোনো দল বা ব্যক্তি দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে প্রচার করার স্বাধীনতাটুকুই মুক্ত গণমাধ্যম। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটটি কেমন? কতটা মুক্ত আমাদের গণমাধ্যম আর কতটা স্বাধীনভাবে, স্বপ্রণোদিত হয়ে মানুষ তাদের ভাবনাগুলো তুলে ধরতে পারছে? কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বাধীন মনোভাব প্রকাশ হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা হয় না।তার কারন আমরা মানুষ হিসাবে প্রত্যেকেই মৃত্যু ও শাস্তিকে ভয় করি।আমাদের দেশে আমরা বিগত দিনে দেখেছি অনেক সাংবাদিক সত্য সংবাদ প্রকাশ করার কারনে বিভিন্ন ভাবে পুলিশী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মিদের দ্বারা অনেকেই লাঞ্ছিত হয়েছে।সাংবাদিকের সংবাদ লেখায় একটু এদিক সেদিক হলেই তথ্যপ্রযুক্তির আইনের ৫৭ধারায় মামলা।তখন মুক্ত গণমাধ্যম সাংবাদিকের কাছে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো লাগে।

মতামতের ক্ষেত্রে একজনের মতের সাথে অন্যের মতের অমিল হতে পারে। আঘাত লাগতে পারে অনুভূতিতে। ফলে কোনো ব্যক্তি বা দল ক্ষুব্ধ হতে পারেন। কিন্তু কারো মনে আঘাত লাগতে পারে এই কথা বিবেচনায় উক্ত মতের পক্ষে কেউ কিছু লিখতে বা বলতে পারবে না এমনটি করার বা ভাবার কোনো সুযোগ বা অধিকার কিন্তু নেই। কারও হয়তো মতামতটি কোনো বিরাট জনগোষ্ঠীর জন্য কল্যাণকর। সংবিধানে মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলা হলেও পূর্ণ স্বাধীনতা তথা মুক্ত গণমাধ্যম  সবক্ষেত্রে এখনো দেখা যায় নি।পরিসংখ্যানেও ব্যাপারটি স্পষ্ট। তথ্য অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা ফ্রান্সের প্যারিসভিত্তিক সংগঠন রিপোটার্রস উইদাউট বডাসর্ (আরএসএফ) সম্প্রতি বিশ্ব গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক-২০১৮ প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যাচ্ছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তাদের জরিপ করা ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬তম! প্রতিবেদনের লক্ষণীয় বিষয়টি ছিল বাংলাদেশের পেছনে থাকা অধিকাংশ দেশগুলোই যুদ্ধ আর অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জজির্রত। যেমন- সিরিয়া, ইয়েমেন, মিসর প্রভৃতি দেশগুলো।

 আমাদের দেশে কিন্তু তেমন কোনো কোন্দল নেই। তাহলে মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠায় আমাদের বাধা কোথায়? আমাদের দেশে গণমাধ্যমের ওপর সবচেয়ে বড় বাঁধাটি আসে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, বিরোধী রাজনৈতিক দল আর ধর্ম নিয়ে কট্টরপন্থি দলগুলো থেকে। এ ছাড়াও আরও কিছু বাধা আছে, যেমন, ব্যক্তিমালিকানাধীন গণমাধ্যমসমূহ কখনোই নিজ স্বাথের্র সঙ্গে জড়িত নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করে না। ফলে গণমাধ্যম স্বকীয়তা হারাচ্ছে। তথ্য প্রযুক্তির এই অবাধ প্রবাহের যুগে মানুষ নানানভাবে তাদের কাছে থাকা তথ্য আর ভাবনাগুলো ছড়িয়ে দিতে পারছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো তার একটি বড় হাতিয়ার। ফেসবুক, ব্লগ, টুইটার ইত্যাদি হলো সামাজিক যোগাযোগের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। একজন মানুষ তার ব্লগে ফেসবুক ওয়ালে কী লিখবে, না লিখবে সম্পূর্ণই তার নিজের মতো। কিন্তু এই উন্মুক্ত যোগাযোগের মাধ্যমে মানুষ কতটা স্বাধীন? আপনার বা আমার ফেসবুক কিংবা ব্লগে যদি সবর্দা নজর রাখা হয়, তাহলে কিন্তু আমরা কেউই আমাদের কাছে থাকা তথ্য কিংবা অপ্রিয় সত্য কথাগুলো বলবো না, লিখবো না। কারণ আমাদের প্রত্যেকেরই প্রাণের ভয় আছে। কে বা চায় আইনের মারপ্যাঁচে পড়তে কিংবা স্বাদের প্রাণটা দিতে? যার প্রমাণ ২০১৭ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে কয়েকশ ব্লগারকে বিচারের আওতায় আনা। আর এই ধারণা থেকেই আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে সেলফ সেন্সরশিপ। এখন আমরা লিখছি বা লিখতে হচ্ছে হিসেব করে, গা বাঁচিয়ে। ফলে মুক্ত গণমাধ্যমের ধারণা কিংবা সুযোগ আমাদের জন্য হয়ে পড়ছে সংকীর্ণ।

আমাদের দেশে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও আর বিভিন্ন অনলাইন পোটার্ল সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টিকে স্বাধীন সাংবাদিকতা তথ্য মুক্ত গণমাধ্যমের অবাধ সুযোগ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়।এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই বিপুল সংখ্যক গণমাধ্যমের কয়টি নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে, পাঠককে জানাতে পারছে সুষ্ঠু আর নিরপেক্ষ খবর? কারণ এই সকল সংবাদপত্রের অধিকাংশেরই মালিকানা থাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের আর ক্ষমতাবান লোকদের হাতে। যার দরুণ ইচ্ছে থাকা সত্তেও গণমাধ্যমগুলো মুক্তভাবে কাজ করতে পারছে না। বরং এমনটা দেখা যায়, ব্যক্তিমালিকানায় থাকা এই সকল গণমাধ্যমগুলো মাঝেমধ্যেই অপসাংবাদিকতাকে উসকে দিচ্ছে। প্রচার করছে সাজানো মনগড়া কিছু খবর। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা দিচ্ছে বিভ্রান্তি। এই সকল গণমাধ্যমের মালিকরা গণমাধ্যমকে ব্যবহার করছে শুধু তাদের নিজেদের ইতিবাচক খবরাখবর প্রচারে। মুক্ত গণমাধ্যম বারবার মুখ থুবড়ে পড়ছে। তথ্য জানার অধিকার এখন আমাদের মৌলিক মানবাধিকার। মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা আর সুষ্ঠু তথ্য প্রবাহের অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য কাগজে কলমে থাকা ‘তথ্য অধিকার আইন’ টির যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট
[email protected]
০১৮১৮-৯৩৬৯০৯