মিরাজের অলৌকিক পটভূমি ও মারেফত দর্শন

মিরাজের অলৌকিক পটভূমি ও মারেফত দর্শন

মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসাইন: বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ (স:) এর জীবনে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ও অলৌকিক ঘটনার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে মিরাজ বা ইসরা। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে আমাদের পিয়ারে নবী হযরত মুহাম্মদ (স:), বিশ্ব জাহানের অধিপতি মহান স্রষ্টা আল্লাহতায়ালার সাথে সাক্ষাতে মিলিত হয়েছিলেন। এ কারণে শবে মেরাজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অত্যন্ত ব্যাপক ও সুদুরপ্রসারী আধ্যাতিক তথা মারফত দর্শন রয়েছে।রজব মাস হিজরী সনের ৭ম মাস, যাতে রয়েছে অনেক ফজিলত ও বরকত। রজব মাস থেকেই মহানবী (সাঃ)রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন এবং আল্লাহর নিকট রমজান পর্যন্ত হায়াত বৃদ্ধির জন্য ফরিয়াদ করতেন। এই রজব মাসে ২৬ তারিখ দিবাগত রাতেই সংঘটিত হয়েছিলো মহানবী (সঃ) জীবনের আশ্চর্যজনক ঘটনা যা পবিত্র সবেমিরাজ নামে পরিচিত। আমরা জানি আল্লাহ রাব্বুল আলামিন  অসিম ক্ষমতা ও শক্তির অধিকারী। ভূমন্ডল ও নভমন্ডলের সব কিছু তারই সৃষ্টি। পৃথিবীর সৃষ্টিরাজির চেয়েও যে, আরও কত বিষ্ময়কর সৃষ্টি আছে যা মানুষের চোখে দেখা তো দুরের কথা বরং কল্পনা করাটাও অসম্ভব। আর এই মিরাজ হচ্ছে মহান আল্লাহ তায়ালার কুদরতেরই অংশ বিশেষ। নবুয়তের ১০টি বছর অসহ্য নির্যাতন, নিপীড়ন উৎপীড়ন জ্বালা, যন্ত্রণা সহ্য করে, বহুঘাত প্রতিঘাত পাড়ি দিয়ে রাসুলুল্লাহ (স:) ঈমানী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। এরপরেই সান্ত¡না স্বরূপ মহান আল্লাহ তার পিয়ারে হাবিব হযরত মুহাম্মদ (স:) কে মিরাজের মাধ্যমে বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান দান করেছেন যা, বিপদকে আনন্দ উল্লাসে এবং অপমানকে সম্মানে রুপান্তরিত করেছেন।


আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনের সুরা বনি ইসরাইলের ১ম নং আয়াতে মিরাজের ঘটনা এভাবে উপস্থাপন করেছেন। “পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তার বান্দাকে, রজনী যোগে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত। যার চতুস্পার্শ্বে আমি নানা প্রকার বরকত প্রদান করিয়া রাখিয়াছি, উদ্দেশ্য আমি তাহাকে স্বীয় আশ্চর্য ক্ষমতার কিছু নিদর্শন দেখানো তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। উপরিক্ত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা, রাসুলুল্লাহ (স:) এর মহাবিশ্ব ভ্রমণ এবং দর্শনের কথা উল্লেখ্য করেছেন। মহানবী (স:) এর মিরাজের ঘটনা বহু হাদিস দ্বারা প্রমানিত যেমন, হযরত আনাস (রা:) মালেক ইবনে ছা-সাহ (রা:) হতে বর্ণনা করেছেন যে, মহানবী (স:) মিরাজের রাত্রি সম্পর্কে সাহাবীদের নিকট এরুপ বর্ণনা করেছেন “যখন আমি কাবা গৃহের উন্মুক্ত অংশ হাতিয়া উর্ধ্বমুখি শায়িত ছিলাম হঠাৎ এক আগন্তুক আমার নিকট এলেন। তার পর তিনি আমার বুকের উপর থেকে তলপেট পর্যন্ত চিরে আমার দিলটাকে বের করে ফেললেন। তারপর ঈমান বর্ধক বস্তুতে পূর্ণ একটি স্বর্ণপাত্র আনা হল। আমার দিলটাকে ধুয়ে ঐ পাত্রের বস্তু ভরে যথাস্থানে রেখে আমার বক্ষটা ঠিকঠাক করে দেয়া হল। এরপর বোরাক নামের একটা বাহন আমার জন্য আনা হল। এটা গাধা হতে একটু বড় এবং খচ্চর হতে একটু ছোট শ্বেত বর্ণের, এর প্রতি পদক্ষেপ দৃষ্টির শেষ সীমায় পৌঁছে।” (বোখারী) বোরাক শব্দটি বারকন শব্দ থেকে এসেছে। বারকন শব্দের অর্থ বিদ্যুৎ। যেহেতু বিদ্যুতের গতি শব্দের গতির চেয়ে বেশি তাই রাসুলে খোদা (স:) এর যানবাহনটির নাম রাখা হয়েছে “বোরাক”। আর এর গতি আলোর চেয়েও অনেক বেশি ছিল।

আল্লাহ তায়ালা, বিষ্ময়কর সৃষ্টিরাজি ও তার মহান কুদরত “দোজাহানের সরদার প্রিয় হাবিব রাসুলে করিম (স:) কে দেখানোর জন্য মনস্থ করলেন। আর এ কারণেই অধিকাংশ তাফসিরকারক ও মহাদ্দেসগণের মতে ২৭শে রজব মধ্য রাতের কিছু আগে বোরাক পাঠিয়েছেন। ১ম বাইতুল্লাহ তারপর বাইতুল মোকাদ্দেস। এখানে অতীতের সমস্ত নবী ও রাসুলদের জমায়েত করা হয়। সবাই নামাজের জন্য কাতার বদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আর ইমাম নির্বাচনের দায়িত্ব অর্পিত হয় হযরত জিব্রাইল (আ:) এর উপর। তিনি আল্লাহর নির্দেশে মুহাম্মদ মোস্তফা (স:) কে ইমাম নির্বাচিত করেন। তিনি সকল নবী ও রাসুলের ইমাম হয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করেন। তার এই ইমামতির কারণে সকল নবী ও রাসুলের সরদার হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন। তারপর শুরু হল উর্ধ্ব গমন যাকে বলা হয় মিরাজ। বোরাকে উঠে মহানবী (স:) যাত্রা শুরু করলেন।

অন্য হাদিসে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ (স:) প্রথম আসমানে হযরত আদম (আ:), ২য় আসমানে হযরত ইয়াহিয়া (আ:) ও ঈসা (আ:), ৩য় আসমানে হযরত ইউসুফ (আ:), ৪র্থ আসমানে হযরত ইদ্রিস (আ:), ৫ম আসমানে হযরত হারুন (আ:), ৬ষ্ঠ আসমানে হযরত মুসা (আ:), ৭ম হযরত ইব্রাহীম (আ:) এর সাথে সাক্ষাত করেন। সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন হযরত জিব্রাইল (আ:)। হযরত জিব্রাইল (আ:) রাসুউল্লাহ (স:) কে নিয়ে এলেন এবার ছিদরাতুল মুনতাহায়।  এখানে এসে হযরত জিব্রাইল (আ:) রাসুলুল্লাহ (স:) কে জানিয়ে দিলেন যে, সে আর সামনের দিকে যদি এক পা অগ্রসর হয় তবে, মহান আল্লাহর নুরের তাজাল্লিতে তার সমস্ত পালক পুড়ে যাবে। এখান থেকে রাসুলুল্লাহ (স:) কে একাই সামনের দিকে অগ্রসর হতে অনুরোধ জানালেন। সেখান থেকে হযরত মুহাম্মদ (স:) একাই “রফরফ” নামক এক যানবাহনের মাধ্যমে মহান আল্লাহর আরশে উপস্থিত হলেন। উল্লেখ্য যে রফরফ নামক যানবাহনটি বোরাকের চেয়ে অধিক দ্রুতগামী। আরশে মুয়াল্লায় উপস্থিত হয়ে, বিশ্ব জাহানের মহান প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালার সাথে সাক্ষাত করলেন। আল্লাহ ও তার রাসুল অত্যন্ত নিকটবর্তি হলেন। কোরআনের ভাষায় দুই ধনুক বা তার চেয়েও নিকটে।

আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় হাবিবের সাথে কথা বললেন, অনেক কথা, কি কি কথা হয়েছে তা আমরা জানি না তবে এত টুকু জানা যায় যে, এই দিন হাদিয়া স্বরূপ পাঠিয়ে দিলেন দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। এই দিন থেকেই মহানবী (স:) এর উম্মাতের উপর দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়ে গেল। তাইতো নবী (স:) নামাজ সম্পর্কে ঘোষণা করলেন “আসছালাতু মিরাজুল মোমেনিন” অর্থাৎ নামাজই হচ্ছে মুমিনদের জন্য মিরাজ। অন্য এক জায়গায় নবী (স:) বলেছেন “নামাজই হচ্ছে বেহেস্তের চাবি।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স:) জান্নাত, জাহান্নামসহ আসমানের যাবতীয় বিষয়সমূহ পরিদর্শন করেন। অবশেষে মিরাজ শেষ করে চলে এলেন এই পৃথিবীতে। এসে দেখলেন অযুর পানি তখনও গড়িয়ে যাচ্ছে। দরজার ছিকল লড়ছে। পৃথিবীর সময়, কাজকর্ম সব কিছু বন্ধ করে দিয়েছিলেন মহান আল্লাহ। তার কারণে এ অবস্থা হয়েছে। যখন মহানবী (স:) এসে এই মিরাজের ঘটনা বর্ণনা করলেন তখন হযরত আবু সিদ্দিক (রা:) কোন প্রশ্ন ও যুক্তি তর্ক ছাড়াই বিশ্বাস করে নিলেন। আর এই কারণে মহানবী (স:) হযরত আবু বকর (রা:) কে “সিদ্দিক” বিশ্বাসী উপাধিতে ভুষিত করেন, বর্তমানে মিরাজ নিয়ে তেমন কোন তর্ক পরিলক্ষিত হয় না। কারণ বর্তমানে বিজ্ঞানের এই সভ্য যুগে শুধু মুসলমানই নয় বরং ভিন্নধর্মীরাও এটা শিকার করে নিয়েছে। কারণ আজ মানুষ বিজ্ঞানের দ্বারা সৌরজগত ভেদ করে চন্দ্র ও মঙ্গল গ্রহে পদার্পণ করছে। আর মহা বিশ্বের স্রষ্টার কুদরতে মাধ্যমে তার প্রিয় হাবিবকে দিদার করানো অসম্ভব নয়, বরং সম্ভব ও যুক্তি সঙ্গত। কারণ আল্লাহর নিকট অসম্ভব বলতে কিছু নেই। মহান আল্লাহ সুরা হাদিসের ৩নং আয়াতে বলেন “তিনিই আদি, তিনিই অনন্ত, তিনিই ব্যক্ত ও তিনিই সুপ্ত এবং তিনিই সর্ব বিষয়ে সম্যক অবগত।” পবিত্র বাইবেলে উল্লেখ আছে “সৃষ্টির প্রাবম্ভে আলোক ছিল, প্রচুর আলোক ছিল”  ইহাতেও প্রমাণিত হয় যে, সবকিছু একমাত্র আল্লাহর ই সৃষ্টি তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন।  

মিরাজের প্রথম দর্শন হচ্ছে মারেফত বা তাসাউফ সম্পর্কীয়। আল্লাহর দিদার এবং সান্নিধ্য লাভ করে আমাদের বিশ্বনবী (স:) মারেফত তথা আধ্যাত্মিকক্ষেত্রে সফলতার সৌভাগ্যের শীর্ষে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। এখানে স্মরণ রাখা দরকার যে মহানবী (স:) আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ লাভ করে, তিনি সমাজ বিমুখ বা মজবুত তন্দ্রাগ্রস্ত হন নাই। বরং মাটির পৃথিবীতে ফিরে এসে দ্বীনি দাওয়াত ও দ্বীন প্রতিষ্ঠাই অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। মিরাজের পরেই তিনি হিজরত করেন। মদিনায় খেলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, তেইশটি জিহাদ, মদিনা সনদ, হুদাইবিয়ার সন্ধি, মক্কা বিজয় সহ, নবুয়তেই পরিপূর্ণ দায়িত্ব পূর্ণতা লাভ করে মিরাজের পরেই। তাই শায়খ-মুর্শিদগণ, বুযুর্গগণ, ওলী আওলীয়া আলেম ওলামাগণ যদি মহানবীর মিরাজ থেকে মারিফতের উৎকর্ষ হাসিল করে সমাজে নেতৃত্ব ও সরদারী গ্রহণ করে তাহলে দুনিয়াতে অশান্তি, দুর্নীতি, ভেজাল, শোষণ-যুলুম, খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, মানব পাচারসহ যাবতীয় পাপ কর্ম অনেকাংশে হ্রাস পাবে বলে আমরা মনে করি। এখানে আরো বলা যায় যে, মিরাজের আধ্যাত্মিক বিষয়ে যে দিকে ইঙ্গিত করছে তাহলো আকিদা। মনে রাখতে হবে মিরাজের বিষয় সম্পন্ন আকিদা বা বিশ্বাস তথা ইমানের মজবুতি। এখানে যুক্তিতর্কের বিষয় নয় বরং যুক্তিতর্ক বাদ দিয়ে পুর্নবিশ্বাস করাই হচ্ছে ঈমানের দাবি। যার বিশ্বাস যত বেশি তার ঈমান তত মজবুত। তাওহীদ ও রিসালাতে দৃঢ় বিশ্বাসই হচ্ছে মিরাজের মূল দর্শন।
পবিত্র শবে মেরাজ উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন মসজিদ, খানকা ও মহল্লায় মহল্লায় বিশেষ মিলাদ মাহফিল আলোচনা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। যা অত্যন্ত পূর্ণের কাজ বলে আমরা মনে করি। মনে রাখতে হবে ফরজ ও সুন্নত ইবাদতের পাশাপাশি বেশি বেশি নফল ইবাদতের প্রতি গুরুত্ব দেয়া জরুরি। যা নবী (স.) সাহাবা আজমাইন ও ওলী আওলীয়াদের জীবন থেকে জানা যায়। এবারের পবিত্র শবে মিরাজ আমাদের সকলের জন্য বয়ে আনুক সুখ, সমৃদ্ধি ও দেশের জন্য সার্বিক কল্যাণ, এটাই আমাদের একান্ত কামনা।
লেখক ঃ ইসলামিক গবেষক, কলামিষ্ট ও প্রভাষক
[email protected]
০১৭১২-৭৭৭০৫৮