গাজীপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচন * ৯ জনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ

মান্নান ও মনিতেই আস্থা রাখতে যাচ্ছে বিএনপি

মান্নান ও মনিতেই আস্থা রাখতে যাচ্ছে বিএনপি

রাজকুমার নন্দী : দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে আসন্ন গাজীপুর সিটি করপোরেশন (জিসিসি) ও খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। দুই সিটিতে নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হলেও দলীয় মেয়র প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত করেনি বিএনপি। তবে দলীয় মনোনয়ন পেতে সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যে দৌঁড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। জানা গেছে, লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সাথে আলোচনা করে দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত করবেন। এর আগে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের নিয়ে গঠিত বিএনপির মনোনয়ন বোর্ড দুই সিটি নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের সাক্ষাতকার গ্রহণ করবে। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান দুই মেয়রই আগামী ১৫ মে অনুষ্ঠেয় জিসিসি ও কেসিসি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেতে যাচ্ছেন। তবে গাজীপুর সিটিতে কোনো কারণে আব্দুল মান্নান মনোনয়ন না পেলে সেক্ষেত্রে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান উদ্দিন সরকার দলীয় মনোনয়ন পেতে পারেন। অন্য সিটির মতো এই দুই সিটি নির্বাচনও জোটগতভাবেই করবে বিএনপি। দলটির একাধিক শীর্ষ নেতার সাথে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে।

দুই সিটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মনোনয়ন সম্পর্কে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও স্থায়ী কমিটির সদস্যরা আলোচনা করে গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী ঠিক করবে। জানতে চাইলে বিএনপির মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ও স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দৈনিক করতোয়াকে বলেন, এক্ষেত্রে আমাদের দলীয় একটা প্রক্রিয়া আছে। এর অংশ হিসেবে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিতরণ করা হয়েছে। শুক্রবার তা জমা নেওয়া হবে। ৮ এপ্রিল দলীয় মনোনয়ন বোর্ডের সামনে মনোনয়ন পেতে ইচ্ছুক প্রার্থীরা সাক্ষাতকারে আসবেন। সবকিছু যাচাই-বাছাই করে যোগ্য ব্যক্তিকেই দলীয় মনোনয়ন দেয়া হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুই সিটিতে মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থীকেই মনোনয়ন দেয়া হবে। ২০ দলীয় জোট তাদেরকে সমর্থন দেবে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু দৈনিক করতোয়াকে বলেন, আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিএনপি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। দুই সিটিতেই যোগ্য ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেয়া হবে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও স্থায়ী কমিটির সদস্যরা মিলে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করবেন।

নির্বাচনের বছরে জাতীয় নির্বাচনের আগে আসন্ন কেসিসি ও জিসিসি নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে বিএনপি। নির্বাচনে জয়ের বিকল্প ভাবছে না দলটি। জয়ের মধ্য দিয়ে তারা প্রমাণ করতে চায় যে, দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পরও বিএনপির প্রতি জনগণের সমর্থন ও আস্থা কমেনি, বরং তা আরো বেড়েছে। সুতরাং খালেদা জিয়া ও বিএনপিকে ছাড়া আগামীতে জাতীয় নির্বাচন হবে না, দেশবাসীর কাছেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না। সর্বশেষ ২০১৩ সালের ৬ জুলাই গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির অধ্যাপক আবদুল মান্নান এবং ওই বছরের ১৫ জুন খুলনা সিটি করেপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মনিরুজ্জামান মনি বিজয়ী হয়েছিলেন। ৫ বছর আগে নির্দলীয় প্রতীকে ভোট হলেও এবার মেয়র পদে দলীয়ভাবে ভোট হবে গাজীপুর ও খুলনায়।

মান্নান-মনিসহ নয়জনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ
গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বর্তমান দুই মেয়র অধ্যাপক আবদুল মান্নান ও মনিরুজ্জামান মনিসহ মোট নয়জন দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।  বৃহস্পতিবার রাজধানীর নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর কাছ থেকে দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন তারা। সকাল সাড়ে ১০টায় গাজীপুরের মেয়র ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল মান্নানের পক্ষে তার এপিএস ওয়াসিমুল বারী ও পিএ নাহিদুল ইসলাম জনি এবং খুলনার মেয়র ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান মনির পক্ষে ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রুবায়েত আহসান খান মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন।

গাজীপুরের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আরো যারা দলীয় মনোনয়নপত্র নিয়েছেন তারা হলেন-জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসানউদ্দিন সরকার, শ্রমিক দলের কার্যকরী সভাপতি সালাউদ্দিন সরকার, মেয়র আবদুল মান্নানের ছেলে এম মনজুরুল করীম রনি, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শরাফত হোসেন, জেলা বিএনপি নেতা শওকত হোসেন সরকার এবং ছাত্রদলের সাবেক নেতা আবদুল সালাম। অন্যদিকে খুলনার মেয়র পদের জন্য জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনাও দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। আজ শুক্রবার নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ে তারা মনোনয়নপত্র জমা দেবেন। তাদের সাক্ষাৎকার আগামী ৮ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টায় গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী-মেয়র, সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ১২ এপ্রিল; যাচাই-বাছাই ১৫-১৬ এপ্রিল ও প্রত্যাহারের শেষ সময় ২৩ এপ্রিল।
বিএনপির নেতারা বলছেন, গাজীপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচনে অধ্যাপক আব্দুল মান্নান ও মনিরুজ্জামান মনি বিজয়ী হলেও তাদেরকে ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয়নি। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় তারা সরকারের রোষানলে পড়েন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাদেরকে বরখাস্ত করা হয়। আসন্ন জিসিসি ও কেসিসি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে এই বিষয়টিও সক্রিয় বিবেচনায় নেওয়া হবে।

বর্তমান মেয়র ও খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান মনি বলেন, আমি মেয়র হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি, মনোনয়নপত্রও সংগ্রহ করেছি। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে আমি আশাবাদী। আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী খুলনা জেলা বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা বলেন, দীর্ঘদিন তিনি সিটি করপোরেশনের কমিশনার ছিলেন। এবার মেয়র পদে মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।

গাজীপুর আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও গত সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক আব্দুল মান্নান। প্রার্থিতা সম্পর্কে জানতে মেয়র আব্দুল মান্নানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছি। মনোনয়ন পেলে বা না পেলেও এটা আমার শেষ নির্বাচন। দল ছাড়াও আমার ব্যক্তিগত অনেক সমর্থক আছে। আমি টঙ্গী পৌরসভার প্রথম দু’বারের মেয়র ছিলাম। দল আমাকে মনোনয়ন দেবে বলে আশা করছি।