মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই

মাহমুদ আহমদ : ইসলাম এমন শান্তিপ্রিয় ধর্ম যার শিক্ষা হচ্ছে সমাজ দেশ সর্বত্রে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। যারা সমাজে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তাদের সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। বিভিন্ন সময় এই সংবাদও কানে আসে যে, সামান্য কারণে কাউকে হত্যা করা হয়েছে বা ধর্মীয় মতপার্থক্যের কারণে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। হ্যাঁ, একে অপরের সাথে বিভিন্ন কারণে মতবিরোধ থাকতেই পারে, তাই বলে কারো ওপর আক্রমণ করে বসা বা তার ক্ষতির চিন্তা করা এটা মোটেও ধার্মিক মানুষের কাজ নয়। এছাড়া আমার প্রতিবেশি সে যে ধর্মের অনুসারীই হোন না কেন মানুষ হিসেবে তার একটি মর্যাদা রয়েছে। আমাদের সবার সৃষ্টি একই উৎস থেকে। যদি একই উৎস থেকে মানব জাতির সৃষ্টি তাহলে কেন নিজেদের মাঝে এত মারামারি আর বিভেদ।

হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.) বিশ্ববাসীর নেতা ছিলেন। রসুল (সা.) নিজের স্বার্থে কোন প্রতিশোধ নিতেন না বরং শত্রুদের সাথেও তিনি সব সময় ভাল আচরণ করেছেন। যাকে খোদা তা’লা সমগ্র পৃথিবীর জন্য রাহমাতুল্লিল আলামিন করে পাঠিয়েছেন, তিনি কিভাবে অন্যের প্রতি অবিচার করতে পারেন। তিনি (সা.) বিধর্মীদের সাথেও ভাল আচরণ করেছেন। হজরত আবু বকর (রা.) এর কন্যা আসমা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী করিম (সা.) এর যুগে আমার অমুসলিম মা আমার কাছে এলেন। আমি নবী করীম (সা.)কে জিজ্ঞেস করলামÑআমি কি তার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করব? তিনি (সা.) বললেন, হ্যাঁ’ (সহী বোখারি, কিতাবুল আদব, বাবু সিলাতিল ওয়ালেদেল মুশরেকে)।

মানবসেবায় আত্মনিয়োগকারী ব্যক্তির প্রতি মহানবী (সা.) শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন ও তাদের খেয়াল রাখতেন। একবার তাঈ গোত্রের লোকেরা মহানবী (সা.) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। এতে তাদের কিছু সংখ্যক লোক বন্দি হয়ে এসেছিল। তাদের মধ্যে আরবের প্রসিদ্ধ দাতা হাতেম-এর এক মেয়েও ছিল। যখন সে মহানবী (সা.) এর কাছে বললো যে, সে হাতেম-তাঈ এর মেয়ে, তখন তার সঙ্গে হজরত মুহাম্মদ (সা.) অত্যন্ত আদব ও সম্মানের সঙ্গে ব্যবহার করলেন এবং তার সুপারিশক্রমে তার গোত্রের শাস্তি ক্ষমা করে দিলেন। (সীরাত হালবিয়া, ৩য় খ-, পৃ-২২৭)।

যখন মক্কার লোকেরা আর কোন কথাই শুনতে চাচ্ছিল না, তখন তিনি (সা.) তায়েফের দিকে দৃষ্টি দিলেন। যখন তিনি (সা.) তায়েফ পৌঁছলেন, তখন সেখানকার নেতৃবৃন্দ তার সাথে দেখা করার জন্য আসতে লাগলো। আমরা যদি মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখতে পাই, তিনি কতইনা উত্তম আচরণ করেছেন অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে আর একই শিক্ষা আমাদেরকে দিয়ে গেছেন। তিনি (সা.) যে দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, এরূপ দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তাই এরূপ আযীমুশ্বান নবী (সা.) এর ওপর লক্ষ লক্ষ দরূদ ও সালাম।

আসলে আজ আমরা ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা ভুলে গিয়ে আল্লাহপাকের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকে নির্মমভাবে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না তারা মূলত নৈরাজ্যকারী। যতদিন মানুষ মানুষকে না ভালোবাসবে ততদিন পৃথিবী অশান্তই থাকবে, পৃথিবী স্বর্গরাজ্যে পরিণত তখনই হতে পারে যখন মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে। মানুষের জন্য প্রেমপ্রীতি জন্ম না নিলে সে মানুষ হয় কিভাবে। সবার সাথে, সে যে ধর্মেরই হোক না কেন মানুষ হিসেবে তার প্রতি প্রীতিময় সম্পর্ক রাখার শিক্ষাই পবিত্র  কোরআন থেকে পাওয়া যায়। তাই আসুন না, আমরা সবাই সবার প্রতি ভালোবাসার ডানা প্রসারিত করি আর বিশ্ব মানবতার প্রতি মমতাশীল হই। শেষ করছি কাজী নজরুল ইসলাম-এর মানুষ কবিতার দু’টি পংক্তি দিয়ে-গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান/নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি/সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।
লেখক: ইসলামী গবেষক-কলামিস্ট
[email protected]