মানবিক প্রগতি চাই

মানবিক প্রগতি চাই

আতাউর রহমান মিটন : অবশেষে চিরবিদায় নিলেন মুক্তিযুদ্ধের বীর গেরিলা যোদ্ধা, অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা। গত সোমবার নিউইয়র্ক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সাদেক হোসেন ক্যান্সার রোগে ভুগছিলেন এবং ২০১৪ সালের মে মাস থেকে আমেরিকায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। সাবেক ছাত্রনেতা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অকুতোভয় সেনানী সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করছি। তাঁর আত্মার শান্তিতে থাকুক এই প্রার্থনা করছি।সাদেক হোসেন খোকার ইচ্ছা ছিল দেশের মাটিতে মৃত্যুবরণের। কয়েকদিন ধরেই গণমাধ্যমে এ ধরনের খবর প্রকাশিত হচ্ছিল এবং সরকারের পক্ষ থেকে দেশে ফেরার জন্য আবেদন করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, শেষ পর্যন্ত তিনি সশরীরে ফেরত আসতে পারলেন না। ভাগ্য তাকে সেই সুযোগ দিল না। নিদেনপক্ষে দেশের মাটিতে যেন কবর হয়, তাঁর সেই আকুতিটুকু যেন মর্যাদা পায় তাঁর জন্য সরকার নিশ্চয়ই সদয় হবেন। মৃত মানুষের উপর কোন রাগ, ক্ষোভ বা অভিযোগ রাখতে নেই বলেই আমরা জানি।
সাদেক হোসেন খোকা শুধু চিকিৎসার কারণেই বিদেশে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন তা নয়। মামলার সাজা মাথায় নিয়ে তিনি কার্যতঃ বিদেশে এক ধরনের নির্বাসিত অবস্থায় ছিলেন। বিএনপির পক্ষ থেকে সাদেক হোসেন খোকাসহ সকলের বিরুদ্ধে আনীত মামলাগুলোকেই ‘মিথ্যা মামলা’ ‘ষড়যন্ত্রমূলক মামলা’ ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াও এই মুহূর্তে মামলা ও সাজা মাথায় নিয়ে কারাবাস করছেন। যদিও চিকিৎসার জন্য তাঁকে রাখা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিএনপি বলছে, খালেদা জিয়া মারাত্মক অসুস্থ এবং তিনি জামিন পাওয়ার যোগ্য। সরকার তাঁকে জামিন নিয়ে পছন্দমত জায়গায় চিকিৎসা নেবার সুযোগ না দিয়ে ধীরে ধীরে তাঁকে মৃত্যুর মুখে ঢেলে দিচ্ছে। তিনি যেন পছন্দমত জায়গায় চিকিৎসা নিতে পারেন সরকারের উচিত সেই সুযোগ নিশ্চিত করা।
জীবিত সাদেক হোসেন খোকা দেশে ফিরতে পারেন নি। মৃত মানুষটির মরদেহ যেন তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী দেশের মাটিতে শায়িত হয় সেটা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাই। সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই। তাই মনুষ্যত্ব এবং মানবিকতার লেন্স দিয়ে দেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আমরা যেন কেবল প্রতিহিংসায় না বাঁচি। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও অপরের প্রতি মর্যাদাবোধ থেকে যেন আমরা দূরে সরে না যাই এবং আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকেও যেন তা মেনে চলতে প্রণোদিত করি। মনে রাখতে হবে আমাদের আচরণ থেকে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম যেন শিক্ষা নেয়। তাই আজকের সমাজে যদি ভাল দৃষ্টান্ত মরে যায় বা হেরে যায় তাহলে আগামী প্রজন্ম ভাল’র সাথে থাকার উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। আগামী প্রজন্ম যদি সত্যি সত্যি ভাল’র সাথে থাকার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে তাহলে সমাজে থাকবে কি? সেই সমাজ কি বাসযোগ্য হবে? আমরা কি আসলে সেরকম সমাজই গড়ে তুলতে চাই?
যেভাবেই হোক নিজেদের শ্রেষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরার একটা প্রচেষ্টা রাজনীতিতে সবসময়ই প্রকট। গায়ের জোর, ক্ষমতার জোর, ঠেলাঠেলি আর মিথ্যাচারের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার যে রাজনীতি আমরা দেখে আসছি তা কারোরই কাম্য নয়। তবু রাজনীতি কেন যে বদলায় না তা আমার বোধগম্য নয়। ন্যায়পরায়ণ মানুষগুলো রাজনীতিতে নেই বা সংখ্যালঘু বলেই হয়তো সেখানে এমন আকাল বিরাজমান। এই অবস্থা চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত আমাদের পরিণতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা ভেবে আমি শঙ্কিত বোধ করছি। জাতীয় পর্যায়ে যদি নাও পাল্টায় স্থানীয় পর্যায়ে অন্ততঃ রাজনৈতিক সহনশীলতার চর্চা অব্যাহত রাখা উচিত। মানুষের প্রিয় হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতা এগিয়ে নেয়া উচিত। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা দিনে দিনে বাড়ছে। খুন, ধর্ষণ, মারামারির সংবাদ পত্রিকার পাতায়। এত আইন, এত বাহিনী, তবু এত অরাজকতা! এর একটা নেপথ্য কারণ কোথাও নিশ্চয় রয়েছে। আমরা সঠিক কাজটি করছি না বলেই হয়তো সমাজে অস্থিরতা বেড়েই চলেছে। আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা-বিদদেরকে ভাবতে হবে কেন বস্তুগত উন্নতি মানুষের মনের সুকোমল, শান্তিময় শক্তিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমরা প্রতিনিয়ত উন্নতি করছি কিন্তু দেশে খুন, হত্যা, ধর্ষণ, মারামারি, দুর্নীতি ও দখলের লোমহর্ষক কাহিনীগুলোর বর্ণনা পড়লে সঙ্গত কারণেই মনে প্রশ্ন তৈরী হয় আমরা কি আসলে উন্নতি করছি? আমরা কি সত্যিই সভ্য দেশ হওয়ার পথে হাঁটছি?
রাজনৈতিক দলীয় অন্ধত্ব আমাদের মূল ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে কি-না তা আমদের ভাবতে হবে। সত্য হোক বা মিথ্যা হোক, নিজের দলকে বড় করে প্রমাণ করবার অন্ধ চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ছোট করছে কাকে? রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যে বিরোধ অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এই বিরোধ ও স্বার্থের সংঘাত কি তাই বলে আমাদেরকে অন্ধ করে দেবে? মৃত্যুবরণ করা ছাড়া কি তাহলে এদেশে মতবিরোধের কোন অবসান ঘটবে না! নেতৃবৃন্দের কাছে উদারতার প্রার্থনা কি তাহলে অরণ্যে রোদন! এ জাতির ভরসা তাহলে কোথায়?  
মতের ভিন্নতা থাকবেই। সেটি আদিম প্রবৃত্তি। মতভেদের পার্থক্য থাকলেই তা পরস্পরের অমঙ্গলের কারণ হতে পারে না। ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখিয়েও নিজের মত প্রচারের কাজটি সম্পন্ন করা যায়। মানসিক উৎকর্ষতায় উদ্ভাসিত হলে নিজের মত প্রচারের জন্য অপরের সাথে বিরোধের কোন প্রয়োজন পড়ে না। এটা ভুলে গেলে চলবে না যে সদ্ভাব ও সদাচরণই সমাজের টিকে থাকার সবচেয়ে বড় নিয়ামক। বিরোধিপক্ষকে উপেক্ষা ও উপহাস করার যে প্রবণতা আমরা সমাজে দেখছি তা সামাজিক প্রীতিকে রক্ষা করবে না।
আমরা যদি সত্যিই দেশের উন্নতি, সমাজের উন্নতিকে সবার উপরে স্থান দিতে চাই তাহলে আমাদের চিন্তা করে দেখতে হবে বর্তমান ব্যবস্থা কতখানি কপটতা, প্রবঞ্চনা ও অসত্যের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। আত্ম বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে মানুষের হৃদয় জয় করবার জন্য প্রতিপক্ষকে প্রতিহিংসায় ঘায়েল করা নাকি ন্যায়বোধ ও স্বীয় আদর্শকে সুমহান মর্যাদায় তুলে ধরা অধিকতর ফলদায়ক! লড়াই যদি করতেই হয় তাহলে তা হবে জ্ঞানের লড়াই, পরিকল্পনা ও স্বপ্ন তৈরীর সক্ষমতার লড়াই। সেই লড়াইয়ে কেউ আমাদের বাধা দিবে না। বরং উৎসাহ নিয়ে হাতে তালি দেবার জন্য ছুটে চলে আসবে। যেখানে স্বপ্ন তৈরির উপাদান আছে, যেখানে মহত্ব ছড়িয়ে আছে তা সকলেই আগলে ধরতে চাইবে। সেখানে অপরজনের পেটে ছুরি চালিয়ে কিংবা অপরের ধন কেড়ে নিয়ে ধনী হবার কোন প্রয়োজনীয়তা থাকবে না। ঐ সমাজের প্রাচুর্য হবে ভালবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায়বোধ ও পরার্থপরতা! অনেকেই বিশ্বাস করেন, বিরোধ নাকি প্রকৃতির নিয়ম, অতএব বিরোধের জন্য প্রস্তুত থাকা দরকার। সে যদি আমার বিরুদ্ধে হয় তা হলে আমাকেও তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে, অন্যথায় আমার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। ছোটবেলা থেকেই এমন একটি শিক্ষা বা দর্শন আমদের মনোজগতে ঢুকে আছে। আমরা আজ যে বিরোধকেই আরাধ্য জ্ঞান করে টিকে থাকার সংগ্রাম করে যাচ্ছি তা সম্ভবতঃ সে কারণেই। কিন্তু এটাই কি প্রকৃত সত্য? আত্মরক্ষা এবং আক্রমণ কথাটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে সেটা মনে রাখা দরকার। আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করছি না কিন্তু নিজের কর্তৃত্ব টিকে রাখার জন্য শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা বা অপর পক্ষকে কারারুদ্ধ করে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে ঢেলে দেয়ার কোন প্রয়োজনীয়তা আছে কি না ভেবে দেখা দরকার।
ক্ষমতার লোভ সর্বগ্রাসী। ক্ষয়রোগে অনেক সময় রোগির চেহারায় রক্তিম-লাবণ্য ফুটে ওঠে কিন্তু সেটা কি সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ? আমাদের অতিশয় লোভ, ক্ষমতালিপ্সা এবং তা টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা বাদ দিয়ে বরং জনগণের হৃদয় বুঝে সেই হৃদয়ের চাওয়াগুলির প্রতি সম্মান দেখিয়ে দেশের কল্যাণ করার চেষ্টায় একটি বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলায় মনোযোগ দেয়া উচিত। হিংসার আগুন নিয়ে খেলা অনেক হয়েছে। আরও বেশি এই খেলা চলতে থাকলে অবশেষে না ছাইয়ে গিয়ে শেষ হতে হয়!
ছদ্মবেশি দলপ্রেমীরা আজ সর্বত্র দাপটের সঙ্গে বিরাজমান। তাদের বংশবৃদ্ধির কারণ হওয়াটা বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ নয়। বরং শত্রুকে জয় করার চেষ্টা সর্বময় কল্যাণের দুয়ার খুলে দিবে। তার জন্য কিছুটা উদারতা থাকলেই চলে। কেবলমাত্র যুদ্ধ-বিগ্রহ বা বহিঃশক্তির আক্রমণেই একটি দেশের বিনাশ হয় তা নয়। বরং কখনও কখনও নিজেদের অহঙ্কার, অতি আত্মবিশ্বাস, অনিয়ম এবং মিথ্যাচারও কোন দেশকে ধ্বংস করে দিতে পারে। আমরা যেন ইতিহাসের সে ধারায় হারিয়ে না যাই। আমরা এক চোখ কানা তাই বলে দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন আমার অপর চোখের উপর যেন কালো পর্দা টেনে না দেই। অপরপক্ষ যাই বলুক যিনি ক্ষমতায় থাকেন তার দায়ই বেশি। দেশে শান্তি বজায় রাখতে হলে সকলকে নিয়েই থাকতে হবে। অপরকে বিনাশ করে নিজে টিকে থাকার চেষ্টার মধ্যে বন্যতা থাকলেও মানবিকতা নেই।
আমরা একটা মানবিক সমাজ চাই। ভালবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধায় এগিয়ে চলা জাতি হতে চাই। আমাদের দেশে মানসিক কল্যাণ ও প্রগতিকে উন্নয়নের সূচক হিসেবে দেখার জন্য সরকারকে অনুরোধ জানাই। সোনার বাংলা গড়বে যে সোনার মানুষেরা তাদের হৃদয়ে ভালবাসা, উদারতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ঝর্ণাধারা হয়ে প্রবাহিত হোক। শুভশক্তির জয় হোক।
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭১১-৫২৬৯৭৯