মানবতার জন্ম শিক্ষা থেকে

মানবতার জন্ম শিক্ষা থেকে

সাবিত্রী সাহা : জীবন হয়েছে যান্ত্রিক। প্রকৃতি থেকে ঝুঁকে গেছে প্রযুক্তিতে। শিল্পবিপ্লবের সময়ে প্রযুক্তি ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা  করা যায় না। প্রযুক্তির বড় আবিষ্কার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। যার জন্য আমার এই শব্দের বিন্যাস সে ফেসবুক থেকে হয়েছে ফেরিওয়ালা। তবে তার নাম ‘মানবতার ফেরিওয়ালা মামুন বিশ্বাস। বেগম লুৎফুন্নেসা হলে টেলিভিশন দেখছি। প্রচারিত অনুষ্ঠানের নাম গল্প নয় সত্যি। দর্শকদের পরিচয় করে দিলেন অনুষ্ঠানের অতিথি পাখি প্রেমিক মামুন বিশ্বাসের সাথে’। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার আগনুকালী গ্রামে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য টিকিয়ে রাখতে সে পাখিদের নিরাপত্তা দিতে গাছের ডালে পাখিদের ঘর সংসার বেঁধে দেওয়ার মাধ্যমে অভয় শ্রম গড়ে তোলে। জীব বৈচিত্র্য রক্ষা করার জন্য তার এই প্রচেষ্টা। অনুষ্ঠান শেষে চিন্তা করলাম আমার পাশের গ্রাম আমি তাকে চিনি না! ভাবলাম এলাকায় গিয়ে তার খবর নিব। কিন্তু  এলাকায় এসে তার সম্পর্কে খবর নেওয়া হয় নি।
শিক্ষকতা দুবছর হলো। ২০১৭ সাল। বিদ্যালয়ে যাবার পথে ফেসবুকের ভালো দিক নিয়ে চায়ের দোকানে আলোচনা হচ্ছে। আলোচিত ব্যক্তি হলেন মামুন বিশ্বাস। নামটা পরিচিত হওয়াতে একটু সময় নিলাম। দাঁড়িয়ে সব কথা শুনলাম। ফেসবুকে অসহায় মানুষের ছবি দিয়ে সহযোগিতা চেয়ে পোস্ট দেন মামুন। ফেসবুক বন্ধুদের পাঠানো অর্থ সংগ্রহ করে স্থানীয় প্রশাসনকে সাথে নিয়ে  মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা সহ বিভিন্ন সহযোগিতা করেন। ফেসবুকে তিনি অনেক জনপ্রিয়। সেদিনের পর ও মাঝে মাঝেই বেশ কিছু লোকের মুখে শুনি আহত পাখি সুস্থ করা কিংবা শিকার থেকে মুক্ত করা সহ অসহায় প্রতিবন্ধী মানুষের দুয়ারে গিয়ে ফেসবুকের মাধ্যমে মামুন বিশ্বাসের সহযোগিতার কথা। কিছু দিন যেতে ফেসবুকে সার্চ করলাম মামুন বিশ্বাস নামে। তার আইডি চলে আসল। অসহায়, প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি তার দায়িত্ববোধ দেখে মনে পড়ল কুসুমকুমারী দাশের আদর্শ ছেলে কবিতার তোমরা ‘মানুষ ‘ হলে দেশের কল্যাণ। আরও মনে পড়ল ভুপেন হাজারিকার গান মানুষ মানুষের জন্য জীবন জীবনের জন্য। একটু সহানুভূতি কি মানুষ :::::: হয়ত এই গানের মর্মার্থ মামুন বিশ্বাসকে তাড়িয়ে বেড়ায় মানবতা নিয়ে দ্বারে দ্বারে। এটাই মানবতা।

 এটাই প্রযুক্তির সফলতা। ধারনা বেড়ে গেলো মামুন বিশ্বাসকে নিয়ে। পাখি প্রতিবন্ধী অসহায় মানুষের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসা। কাছ থেকে তাকে দেখা হয়নি। তবে শ্রদ্ধা জন্ম নিলো! ২০১৯ সাল। এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়েছে। যমুনা টিভির সকালের বাংলাদেশ অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয় শারীরিক প্রতিবন্ধী কিশোর ফজলুকে নিয়ে। দুই হাত এক পা না থাকা সত্বেও ৩.৭৬ জি পি এ পায় ফজলু। ফজলুর লেখাপড়ার প্রবল ইচ্ছা দেখে ফেসবুকের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে তার পাশে দাঁড়ায় মামুন বিশ্বাস। সেই সংবাদ দেখে আশার আলো নিয়ে ই-মেইল করি মামুন বিশ্বাস কে। আমি যে বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি সে বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণির এক শিশু প্রতিবন্ধী। দরিদ্র্যতা একদম চৌকাঠ ছুঁয়ে। তবুও তার মা কষ্ট করে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসে। আমি মাঝে মাঝে তার  বাড়ি গিয়ে বিদ্যালয়ে আসার অনুপ্রেরণা যোগাই। মনে হলো রিয়ার একটা প্রতিবন্ধী কার্ড হলে ভালো হত, বা কোন আর্থিক সুবিধা পেলে ভালো হতো। রিয়ার পড়াশোনার প্রতি উৎসাহ দেখে, আর্থিক সহায়তার জন্য ই-মেইল করি মামুন বিশ্বাসকে। ই-মেইল করার দিন দশেক পর আমাদের বাড়িতে আসে মামুন বিশ্বাস। তাকে দেখে আমি অবাক! সালাম দিতেই বলল, ম্যাডাম আপনার কাছে এসেছি একটু প্রয়োজনে। বললাম, ভিতরে আসেন। ম্যাডাম আপনি আমাকে একটা ই-মেইল করছেন।

 আমি সেই শিশুর সম্পূর্ণ তথ্য নিতে এসেছি। আপনাদের বিদ্যালয় ছুটি। তা না হলে আমি বিদ্যালয়ে যেতাম। এভাবে বিরক্ত করতে আসতাম না। বিরক্ত না! আমিই বরং কৃতজ্ঞ! আমার সাথে সে খুব বিনয়ী হয়ে কথা বলে এবং জানায়, প্রতিবন্ধীত্ব জীবন কত কঠিন! তার বোন প্রতিবন্ধী। সে চায় প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা না হয়ে শিক্ষায় শক্তি অর্জন করুক। প্রতিটা শিশু বেড়ে ওঠে কাউকে অনুকরণ করে। তবে তার অনুকরণের মূল স্থান বিদ্যালয় এবং তার প্রিয় শিক্ষক। আমি আমার স্কুল শিক্ষকের আদর্শে বড় হয়েছি। স্কুল শিক্ষক হিসাবে আপনি সকল শিশুর প্রতি সমান দৃষ্টি রাখবেন এটা আপনার কাছে আমার আজীবন কাম্য। আমি আজীবন  অসহায় ছিন্নমূল মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই। চাই এই মানুষগুলো সূর্যের আলোর সাথে জীবনের আলোর মুখ দেখুক। তাদের আলোর মুখ দেখানো আমার শুধু স্বপ্ন নয় দায়িত্ব। জীবনে কত কত মানুষের সম্মুখীন হয়েছি। কত মানুষের স্বপ্নের কথা শুনেছি। তবে মামুন বিশ্বাসের ছিন্নমূল মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে  সহযোগিতার যে স্বপ্ন, তা আমার হৃদয়পুরে অম্লান হয়ে থাকবে। অবশেষে  জানতে পারলাম যার আদর্শে সে বড় হয়েছে সে হলো মাহবুবুল হোসেন তার প্রিয় স্কুল  শিক্ষক এবং তার বাবা।
লেখক ঃ সহকারী শিক্ষক (স.প্রা.বি)
শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ
০১৭৮৯-১০৮২৪৯