মানব প্রীতি

মানব প্রীতি

আলহাজ¦ হাফেজ মাওঃ মুহাম্মাদ আজিজুল হক : নামাজ, রোজা, হজ¦, জাকাত ইত্যাদি ইবাদত যেমন ফরজ মানবপ্রেম ও মানবসেবাও তেমনি ফরজ। কিন্তু চারপাশের পরিবেশ দেখে মনে হয় দয়া-ভালবাসার পরিবর্তে চলছে অন্যায় অনাচার অশ্লীলতা আর পাপাচারের প্রতিযোগিতা। খুন-খারাবি চলছে খর¯্রােতা নদীর মত। মানবতা ভ্রাতৃত্ববোধ উঠে যাচ্ছে। ক্ষমতাশীলরা এতিম অসহায়দের সম্পদ গিলে খাচ্ছে। মজলুম আর ধর্ষিতার আর্র্তনাদে ভারি হচ্ছে আকাশ বাতাস। নেশার জগতে বুুঁদ হয়ে আছে যুবকরা। সুদ ঘুষ জুয়ায় ছেয়ে গেছে গোটা সমাজ। রাষ্ট্রের আমানতের খেয়ানত করছে নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত কর্মকর্র্তাগণ। অথচ ইসলামে এ সবই হারাম, কবীরা গুনাহ বা বড় গুনাহ। রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন, খাঁটি মুসলমান সেই ব্যক্তি যার মুখ ও হাত খেকে অন্য মুসলমানগণ নিরাপদে থাকেন (বুখারী) আমরা আখেরাতের জিন্দেগী ভুলে প্রতিমুহূর্তে কবীরা গুনাহ করছি। শুধু করছি না প্রতিযোগিতা করছি।

 অথচ ছোট থেকে ছোট গুনাহও লিপিবদ্ধ হচ্ছে। যার হিসাব দিতে হবে কড়ায়-গন্ডায়। তাই কিয়ামতের দিন আমলনামা হাতে পেয়ে মানুষ বিস্ময়ের সাথে বলবে, ”কি অদ্ভুত এই আমলনামা? এ যে ছোট বড় কোন কিছুই বাদ দেয়নি-সবই এতে রয়েছে” (সূরা: কাহফ আয়াত: নং৪৯) রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন, যার সব আমালের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেয়া হবে, তার ধ্বংস অনিবার্য। (বুখারী) তাই কবীরা গুনাহ দুরে থাক, ছোট গুনাহকেই ভয় করতে হবে। যাহোক মানুষকে ভালবাসতে হবে। রাখতে হবে সহানুভূতি সহমর্মিতা। মহানবী সাঃ বলেন, যারা দয়া করে তাদের প্রতি দয়ালু আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা দুনিয়াবাসীর প্রতি দয়া কর, আসমানবাসী অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়া করবেন(তিরমিজি) অন্য হদীসে আছে এক মুসলামান অপর মুসলামানের ভাই, সে তার প্রতি জুলুম করবে না, (বিপদে) তাকে সাহায্য করা ছাড়বে না। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূর্ণ করবে আল্লাহ তার প্রয়োজন পূর্ণ করবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের একটি পেরেশানী দূর করবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার একটি পেরেশানী দূর করবেন। আর যে ব্যক্তি কোন দোষ গোপন করবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার দোষ গোপন করবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে লেগে থাকবে,আল্লাহ ততক্ষণ তার সাহায্যে লেগে থাকবেন। (বুখারী) মানে বান্দা বান্দার সাথে যেমন মুআমালা করবে,আল্লাহ তার সাথে তেমন মুআমালা করবেন।

 মানুষের উপকার করার চিন্তা ফিকির করাও ইবাদত। আরেকটি ফজিলত হলো রাসূল সাঃ বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোন উম্মতকে সšুÍষ্ট করার জন্য তার অভাব দূর করবে, আমি তার প্রতি সন্তুুষ্ট। আর যে আমাকে সন্তুুষ্ট করল,সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকেই সšু‘ষ্ট করল। আর যে আল্লাহকে সন্তুুষ্ট করল, আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করবেন। (মেশকাত) সুবহানাল্লাহ সাধারণভাবে মানুষের উপকার করলেই যদি এত খুশি হন। তাহলে ্্্্্এতিম মিসকিন ও বিধবাদের ভালবাসলে তিনি কি দিবেন ?  আল্লাহর হাবিব সাঃ বলেন, বিধবা ও মিসকিনদের উপকারকারী আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর মত কিংবা রাতের বেলায় নফল আদায়কারী ও দিনের বেলায় নফল রোজা পালনকারীর মত। (মেশকাত) আরেক হাদিসে ইরশাদ করেন,যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুুষ্টির উদ্দেশ্যে কোন এতিমের মাথায় হাত বুলাবে, যে সমস্ত চুলের উপর দিয়ে তার হাত অতিক্রম করবে তার প্রতিটির বিনিময়ে তার জন্য নেকি লেখা  হবে। আর যে ব্যক্তি তার তত্বাবধানে লালিত পালিত এতিম বালক বালিকার সাথে ভাল আচরণ করবে আমি ও সে ব্যক্তি জান্নাতে এ দুই আঙ্গুলের মত মিলিত থাকব। এই বলে তিনি নিজের শাহাদত আঙ্গুল ও মধ্যমা আঙ্গুল একটু ফাঁক রেখে মিলালেন। (আবু দাউদ) বুখারী শরিফের বর্ণনায় আছে  সমাজের দূর্বল লোকদের জন্যই তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত এবং রিজিকপ্রাপ্ত হও।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, “এবং তাদের ধন-সম্পদে ভিক্ষুক ও বঞ্চিতের হক আছে। (সুরা যারিয়াত আয়াত:১৯) অর্থাৎ যাদের সম্পদ আছে তাদের সম্পদে ঐ সব লোকদের অধিকার আছে যাদের সম্পদ নেই। মানব প্রীতি ঈমানেরই অংশ। কেননা রাসূল সাঃ বলেন, তোমাদের কেউ পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে অন্য মুসলমানদের ভাল না বাসবে যা নিজের জন্য ভালবাসে। (মুসলিম) মানবপ্রেম, মানবসেবা গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতের বিষয়। এসব কাজের মাধ্যমে মানুষ বেঁচে থাকে চিরকাল। একজন অন্য জনের কেমন হিতাকাঙ্খী ও শুভাকাঙ্খী হতে হবে নবীজি সাঃ সেই শিক্ষাও দিয়েছেন। নবীজি সাঃ বলেন, সমস্ত মুসলমান জাতি একটা ব্যক্তির মত। দেহের এক অঙ্গ যদি ব্যথিত হয় সারা অঙ্গ সেই ব্যথা অনুভব করে। এক চোখে ব্যথা হলে সারা শরীরে সে ব্যথা উপলব্ধি করে। মাথায় ব্যথা হলে সারা দেহ সে ব্যথা উপলব্ধি করে। (মিশকাত) তাই সকলের বিপদকে নিজের বিপদ মনে করতে হবে। দ্রুত সমাধানের জন্য তৎপর হতে হবে। হযরত আবু দারদা রাঃ বলেন, রাসূল সাঃ বলেছেন, যখন কোন মুসলমান তার ভাইযের মান-সম্মান বিনষ্ট করা হতে অন্যকে বিরত রাখে,তখন আল্লাহ তায়ালার উপর কেয়ামতের দিন তার উপর থেকে দোযখের আগুন প্রতিহত করা অপরিহার্য হয়ে যায়। তারপর এর সমর্থনে কুরআনের এই আয়াতটি তেলাওয়াত করেন। আয়াতের অর্থ “ঈমানদারদের সাহায্য করা আমার উপর অপরিহার্য কর্তব্য”। (সূরা রুম, আয়াত নং-৪৭) যে ব্যক্তি কোন অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যায়, আসমান থেকে একজন ফেরেশতা তাকে লক্ষ করে বলেন, মোবারক হও তুমি এবং মোবারক হোক তোমার এই পথ চলা।

তুমি জান্নাতে একটি মনজিল তৈরি করলে। (ইবনে মাজাহ) হযরত আলি রাঃ বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাঃ কে বলতে শুনেছি. যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে সকালে দেখতে যায় সন্ধা পর্যন্ত ৭০ হাজার ফেরেশতা তার জন্য দুআ করতে থাকে। আর যদি সন্ধ্যা বেলায় যায় তাহলে সমসংখ্যক ফেরেশতা সকাল পর্যন্ত তার জন্য দ্আু করতে থাকে। এবং তার জন্য জান্নাতে একটি বাগান তৈরি করা হয়। (মেশকাত) একবার হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাঃ বায়তুল্লাহর দিকে তাকিয়ে বললেন, হে কাবা, তুমি কত সুমহান উচ্চ’ তোমার মর্যাদা কত উর্ধেŸ। তদুপরি একজন মুমিন আল্লাহর নিকট তোমার চেয়েও অধিক মর্যাদাসম্পন্ন ও সম্মানিত। (তিরমিজি)। মানুষ হচ্ছে “আশরাফুল মাখলুকাত” তাদের প্রতি ভালবাসা থাকতেই হবে তাছাড়া  সমস্ত সৃষ্টির প্রতিই করতে হবে দয়া, রাখতে হবে প্রেম। এই প্রসিদ্ধ হাদিস সকলেই জানি যে, জনৈক মহিলা বিনা কারণে বিড়াল আঁটকে রেখে অনাহারে হত্যা করেছিল। সে জন্য তাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আরেক ব্যক্তি পিপাসায় কাতর কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। মহানবী সাঃ বলেন, সমস্ত মাখলুক আল্লাহর পরিবার। আর সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক প্রিয়, যে তাঁর পরিবারের প্রতি অনুগ্রহ করে। আমরা যদি মানব প্রেম ও মানব সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করি। তাহলে সমাজে ফিরবে নববী আমলের মদিনার পরিবেশ। দূর হবে পাপাচার অন্যায় অসংগতি।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক-ইসলামী গবেষক
০১৭৩৪-৭১৮৩৬০