মানব পাচার রোধে কর্মসংস্থান

মানব পাচার রোধে কর্মসংস্থান

 মোহাম্মদ নজাবত আলী : তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্রদেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। যদিও দেশের আর্থ সামাজিক অবস্থা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আবার দেশটি পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতি ও জনবহুল। বেকারের সংখ্যাও ভয়াবহ। কারণ আমাদের দেশে পর্যাপ্ত শিল্প কলকারখানা নেই। শিক্ষিত-অশিক্ষিত বেকার যুবকদের আত্মকর্মসংস্থান ও চাকরির তেমন সুযোগ-সুবিধাও নেই। ফলে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সরকার যে ভাষাতেই কথা বলুক না কেন বর্তমানে দেশে কর্মসংস্থানের ব্যাপক সংকট রয়েছে।
কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়া মানেই বেকারত্বের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া। আর আমাদের দেশের বেকারের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। ১৬ কোটি মানুষের দেশে ৩ কোটি বেকার এ সংখ্যাটি দেশের উন্নয়নের অন্তরায়। আর বেকারত্ব জীবন যুবকদের কাছে একটি অভিশাপ। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের প্রতিটি পরিবারের কর্তা ব্যক্তি মনে করে তাদের সন্তানরা লেখাপড়া শিখে একটি ভালো চাকরি পেয়ে বাকি জীবনটা আরাম আয়েশে কেটে দিবে। তাদের ধারনা যে অমূলক তা নয়। যদিও শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ভিন্ন। কিন্তু আর্থ সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত বা অশিক্ষিত তরুণ অর্থ উপার্জনে একটি ভালো পথ খুঁজে না পেলে অধিকাংশ পরিবারে নেমে আসে চরম হতাশা ও অর্থনৈতিক দৈন্য দশা। আবার লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে কোনো চাকরি পাওয়া সব পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ বাংলাদেশে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র। অথচ দেশের মোট জনসংখ্যার বেশিরভাগ মানুষই গ্রামে বাস করে। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তিলাভের আশায় বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, কাজ করছে। বিশেষ করে মধ্য প্রচ্যের সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার সহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শ্রমিক পেশাজীবিরা বিভিন্ন কর্মে নিয়োজিত। তাছাড়া মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়াতেও বহু তরুণ, যুবক নানা পেশায় নিয়োজিত রয়েছে। এ সমস্ত দেশগুলোতে শিক্ষিত তরুণরা যেমন রয়েছে তেমনি অল্প শিক্ষিতও আছে। আর দক্ষ অদক্ষ শ্রমিকদের প্রেরিত অর্থ যাকে রেমিটেন্স বলি। এ বৈদেশিক অর্থ দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আবার কেউ কেউ উন্নত জীবনের আশায় অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে করুণভাবে মৃত্যুবরণ করেন। আমাদের দেশে এর অনেক নজির রয়েছে। অতি সম্প্রতি অবৈধভাবে ইতালি যাবার পথে নৌকাডুবিতে  কারো কারো সলিল সমাধি হয়।  
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে প্রায় সত্তর জন মানুষ মারা গেছেন তাদের মধ্যে অন্তত সাঁইত্রিশ জন বাংলাদেশি রয়েছে।
ইতালি পাঠাচ্ছি এ লোভনীয় সুযোগে ঝুঁকে পড়ছে হাজার হাজার যুবক বেকারত্বের অভিশাপ থেকে নিজেকে বাঁচাতে দালালদের প্রস্তাবে রাজি হয়। পরিশেষে অধিকাংশের জীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় দুঃখ, কষ্ট, নির্যাতন আবার কখনও মৃত্যু। জীবন জীবিকার তাগিদে সংসারে অভাব মোচন বা সচ্ছলতা লাভের আশায় মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে সুমদ্র পথে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে শ্রমিকরা এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। প্রায় বিভিন্ন দুর্ঘটনায় এদের মৃত্যুর খবরও পাওয়া যায়। পাচারকারীদের অল্প অর্থে প্রতি বছর এক শ্রেণীর যুবক এ পথে ঝুঁকি আছে জেনেও তারা পাড়ি জমাচ্ছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সুবিধা নেই। উপরোক্ত বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় বেকার সমস্যার সমাধানের কোনো সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনাও নেই। অথচ প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার সৃষ্টি হচ্ছে।
বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় প্রতি বছর বৈধভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমাচ্ছে। পাচারকারীরা অতিলোভ দেখিয়ে বা ছলে বলে কৌশলে তাদের আবার অনেককে আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের কাছে বিক্রি করেও দেয়। বিদেশ গমনকারীদের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। আর মানব পাচারকারী বা দালালদের কোনো বিবেক-বিবেচনা মনুষ্যত্ববোধ নেই। দালাল বলতে যা বুঝায় সবটাই তাদের মধ্যে আছে। এদের নেটওয়ার্ক খুব শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত। তাই দেশের হতভাগ্য শিক্ষিত-অশিক্ষিত বেকার যুবক এবং দক্ষ বা অদক্ষ শ্রমিকরা কোনো দেশে যেতে চাইলে সে দেশের বৈধ ভিসা আছে কি না অথবা যার মাধ্যমে যাবে সে ব্যক্তিটির অতীত বর্তমান এবং অল্প টাকায় যাবার লোভ পরিহার করে নিজেদের আরও সচেতন হতে হবে। জীবনের স্বপ্ন পূরণে বৈধভাবে হলে কোনো কাজে ঝুঁকি নেয়া ভালো। কিন্তু অবৈধভাবে সে ঝুঁকি যদি মৃত্যুর কারণ হয় তাহলে সে পথে না যাওয়ায় বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ স্বপ্ন পূরণে ভাগ্য মিলছে মৃত্যু, এর চেয়ে নিষ্ঠুর ও অমানবিক ঘটনা আর কি হতে পারে। সরকারকে অবশ্যই এ ব্যাপারে নজর দেয়া উচিত।
মানব পাচারকারীরা খুবই কৌশলী ও শক্তিধর। অবৈধভাবে বিদেশ যেতে প্রতিবছরই নৌকা কিংবা ট্রলার ডুবে শত শত মানুষের সলিল সমাধি ঘটছে। বর্তমান বিশ্বে যে সব গুরুতর সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম মানব পাচার। এ বিষয়কে অতি গুরুত্বের সাথে সরকারের বিবেচনা করা উচিত। আমরা মনে করি মানব পাচার রোধে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি আইনের সুষ্ঠু প্রায়োগ খুবই জরুরি।
লেখক ঃ শিক্ষক-কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১