মাদকের প্রসারতা রোধ

মাদকের প্রসারতা রোধ

মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ : মানব সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে জানা যায় যে, মানবীয় অপরাধ, নৈতিকতার অবক্ষয়, পারিবারিক ও সামাজিক অবক্ষয় ও বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হলো মাদকতা ও অশ্লীলতা/ মদপান যেমন নিজের জন্য এবং অপরের জন্য ক্ষতির কারণ হয়, অনুরূপভাবে অশ্লীলতাও নিজের জন্য এবং অপরের জন্য ক্ষতির কারণ হয়। আধুনিক সভ্যতার নামে যারা মাদকতা ও অশ্লীলতায় অভ্যস্ত তাদের ইহকাল পরকাল উভয় জগতেই বিপর্যয় অনিবার্য। বিশ্ব বিবেকবান ব্যক্তিরা মদের বিরুদ্ধে অনেক কিছু বলে ও তা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় অশ্লীলতাকে বিভিন্ন নামে আখ্যায়িত করে তা সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। উভয় ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যুব সমাজ।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান মতে ধুমপান ও ড্রাগের চেয়েও মদপান বেশি ক্ষতিকর তারপরেও আধুনিক বিশ্বের মানুষ ধুমপান ও ড্রাগ এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও মদের বিরুদ্ধে সোচ্চার নয়। কোন কোন দেশের ১৫% মানুষ মদপানজনিত সমস্যা দিতে ভুগছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাশিয়ার মানুষ। রাশিয়ার মোট জনসংখ্যার ১/৩ অংশ মদপানজনিত মারাত্মক রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডঐঙ এর পরিসংখ্যান অনুসারে বর্তমান বিশ্বের সকল রোগব্যাধির শতকরা ৩.৫ ভাগ হলো মদপানের কারণে। এজন্য ইসলাম মদপান ও সকল প্রকার মাদকদ্রব্য হারাম করেছে এবং ভয়ঙ্করতম কবীরা গুণাহ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ফলে ইমানের চেতনায় অধিকাংশ মুসলমান মদপান থেকে বিরত থাকেন। ইতিপূর্বে মুসলিম বিশ্বে “মদপান” সমাজে প্রশ্রয় পেত না বরং তা ঘৃণিত ও নিন্দিত মনে করা হতো। কিন্তু বর্তমানে অনেক মুসলিম দেশের মুসলমান ইসলামি শিক্ষার অভাবে কিংবা প্রবৃত্তির প্ররোচনায় মদপান শুরু করে দেন। আমাদের দেশের অনেক কিশোর-কিশোরী এখন মদপান বা নেশাগ্রস্ত দ্রব্য পানে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন কারণে তারা এখন মাদকাসক্তিতে ভুগছে। সরকার এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছেন। কারাগারে বন্দী হয়ে আছে অনেক অল্প বয়স্ক ছেলেরা।

তারপরেও মাদকদ্রব্য আসা অব্যাহত রয়েছে। অনেকেই মদের কল্যাণকর দিক ভেবে মদপান করেন। অনেকেই মদের ব্যবসায় লাভ বেশি মনে করে এ অবৈধ ব্যবস্থা করে থাকে। কিন্তু ইতিহাস ও বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, মদের মধ্যে যে কল্যাণকর দিক খুবই সামান্য আর অকল্যাণ অনেক ভয়ঙ্কর। এজন্য মহান আল্লাহ প্রথমে মদ সম্পর্কে বলেছেন, “কিছু কল্যাণ রয়েছে তবে উপকারের চেয়ে অপকারই (পাপ) বেশি। বাকারা ২১৯। পরবর্তীতে সুরা মায়িদার ৯০ নং আয়াত দ্বারা মদকে “শয়তানের কর্ম, কাজেই তোমরা তা বর্জন কর।” উক্ত আয়াতের তাফসীরে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহ:) এর একটি হাদীস উল্লেখ আছে। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাছ (রা.) বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন একব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে এক বোতল মদ উপঢৌকন স্বরূপ দেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বলেন- ওহে! তুমি কি জাননা যে, আল্লাহ মদ হারাম করেছেন? ইহা শুনে লোকটি তার গোলামকে বললো ইহা বিক্রয় করে দাও। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন তুমি উহাকে কি বললে? লোকটি বললো আমি উহাকে মদ বিক্রি করে দিতে বললাম। তখন রাসুল (সা.) বললেন- যিনি মদপান হারাম করেছেন তিনি ইহার ক্রয়-বিক্রয়ও হারাম করেছেন। একথা শুনে লোকটি তার গোলামকে বললো শহরের বাহিরে গিয়ে বোতলটি ভেংগে মদ ফেলে দিয়ে আস। সহীহ হাদীসে আসছে রাসুল (সা.) বলেছেন, “মহান আল্লাহ মদকে অভিশপ্ত করেছেন। আর অভিশপ্ত করেছেন মদ পানকারীকে, মদ সরবরাহকারীকে, মদ বিক্রেতাকে, মদ ক্রেতাকে, মদ প্রস্তুতকারককে, মদ প্রস্তুতের ব্যবস্থাকারিকে, মদ বহনকারীকে যার নিকট মদ বহন করা হয় তাকে এবং মদের মূল্য যে ভক্ষণ করে তাকে।” (তিরমিজী) মদপানের ন্যায় ধুমপানও ক্ষতিকর। শরীয়তের ভাষায় ধুমপান সর্বাবস্থায় মাকরূহ বা অপছন্দনীয় কিন্তু বর্তমানে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত যে, ধুমপান মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক।

এজন্য আধুনিক যুগের অধিকাংশ আলিম ধুমপানকে হারাম বলেছেন। কারণ সুনিশ্চিতভাবে ধুমপান অপচয়, দুর্গন্ধময় এবং ক্ষতিকারক। ৩১শে মে বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবস এবং ২৬ শে জুন বিশ্ব মাদকমুক্ত দিবস শুধু পালন করা হয়। বক্তারা উক্ত দিবসদ্বয়ে “তামাক ও মাদক” বিষয়ে আলোচনা করে থাকেন। ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরেন। একেবারেই না বলার সাহস কারো নেই। কারণ তাদের ধারণা “তামাক ও মাদক” না বলা অনেকের মতে ব্যক্তিগত অধিকারে হস্তক্ষেপ করা অথবা সরকারের ট্যাক্স কমে যাবে অথবা কালোবাজারী বেড়ে যাবে ইত্যাদি। বলা বাহুল্য যে, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ধ্বংস ডেকে আনে এমন কিছু মানবাধিকার নয়। যে সভ্যতা মানবাধিকারের নামে মদ বা ড্রাগস নিষিদ্ধ করতে দেয় না সে সভ্যতাই লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে। বিশ্বের ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, ইসলামই একমাত্র জীবন বিধান যাতে এগুলোর বিরুদ্ধে নির্মূলের ব্যবস্থা দিয়েছে। সকল মুসলিমের দায়িত্ব এ বিষয়ে সচেতন হওয়া। সন্তানদেক সঠিক সময়ে শিক্ষার মাধ্যমে এর কুফল শিক্ষা দেওয়া। মাধ্যমিক শিক্ষার প্রাথমিক শ্রেণীগুলোতে উপরোক্ত বিষয়ে সিলেবাস করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মদেক শিক্ষা দিয়ে সুনাগরিক হিসাবে গড়ে তোলা। বিশেষত যারা মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছেন সর্বাত্মক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এ আমানত আদায় করা। আলিম সমাজের দায়িত্ব এ বিষয়ে বেশি বেশি আলোচনা করা। জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা। মহান আল্লাহ আমাদেক মাদকতার করালগ্রাস থেকে রক্ষা করুন। আমীন।মাদকতার মতই আরেকটি ধ্বংসাত্মক বিষয় হলো অশ্লীলতা। অশ্লীলতা ও মাদকতার মতই হারাম বা নিষিদ্ধ। প্রাক ইসলামি যুগে আরবরা ধার্মিকতার সাথে নগ্নতা বা অশ্লীলতার সংমিশ্রণ ঘটাতো। এমনকি উলঙ্গ হয়ে কাবা ঘরে তাওয়াফ করাকে পুণ্যের কাজ বলে মনে করতো। পুরুষরা দিনে মহিলারা রাতে উলঙ্গ হয়ে কা’বা তাওয়াফ করতো।

পবিত্র কুরআনের সুরা আরাফের ২৮ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “যখন তারা কোন অশ্লীল-বেহায়া কর্ম করে তখন বলে আমাদের পূর্ব পুরুষরা এরূপ করতো বলে আমরা দেখেছি এবং আল্লাহ আমাদেক এরূপ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। বল আল্লাহ কখনই অশ্লীলতার নির্দেশ দেন না। তোমরা আল্লাহর নামে এমন কিছু কি বলছো যা তোমরা জান না।” ভালবাসার নামে অশ্লীলতা কিংবা ধর্মের নামে অশ্লীলতা জঘন্যতম বর্বরতা। অশ্লীলতার জন্য খোদায়ী প্রতিশ্রুতি হলো দুনিয়া ও আখিরাতে ‘যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা নূর আয়াত নং ১৯)। অশ্লীলতার কারণে দুনিয়ার এমন এমন রোগ ব্যাধি ছড়িয়ে পড়বে যা ইতিপূর্বে দেখা যায়নি। (সহীহ ইবনু মাজাহ)। অশ্লীলতা যুব সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। ব্যাভিচারের পথ খুলে দেয়। ফলে জাতি আল্লাহর গজবের যোগ্য বিবেচিত হয়। লক্ষ্য করুন বর্তমান সভ্যতার যুগেও উন্নত চিকিৎসার যুগে এইডস এর ভয়াবহতা ব্যাপক। জানা যায় ২.৫ কোটি আফ্রিকান এ রোগে আক্রান্ত। প্রতিদিন এ রোগে আত্রান্ত হচ্ছে ১৫ হাজার লোক। আমাদের পার্শ¦বর্তী দেশ ভারতে ৪০ লক্ষাধিক লোক এ রোগে আক্রান্ত। ২০০৩ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, বাংলাদেশে এ রোগে আক্রান্ত মাত্র ৫৭ জন। এইচআইভি পজিটিভ ৩৬৩ জন। মারা গেছে ৩০ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ধারণা বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২০ হাজার লোক এ রোগে আক্রান্ত। যে দেশে অশ্লীলতা যত বেশি সে দেশ এইডস রোগীর সংখ্যাও তত বেশি। এজন্য মহানবী (সা.) বলেছেন “তোমরা তোমাদের সন্তানদের যতœ নিবে এবং তাদেক উত্তম মূল্যবোধ শেখাবে।” এ কঠিন রোগ-ব্যাধি থেকে বাঁচার উপায় হলো অশ্লীলতা বর্জন সহ ইসলাম ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা।” মহান আল্লাহ আমাদেক রক্ষা করুন। আমিন।
লেখক : খতীব, উপশহর মসজিদ, বগুড়া।
মুহাদ্দিস, উম্মুল কুরা কওমি মাদ্রাসা, বগুড়া।
০১৭১২-৫১৪৪৭৮