মাদকের আগ্রাসন নির্মূল করতেই হবে

মাদকের আগ্রাসন নির্মূল করতেই হবে

আব্দুল হাই রঞ্জু : খুব বেশি দিনের কথা নয়, যখন মাদক বলতে মদ, ভাং, গাঁজাকে বুঝাতো। এরপর কাশের সিরাপ ফেন্সিডিল মাদকের শীর্ষে উঠে আসে। প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা সিরাপের সাংকেতিক নাম নিল ‘ডাইল’। ৪০ টাকা ডাইলের বোতল বিক্রি হয়েছে তিন চার শত টাকা পর্যন্ত। এখান থেকেই শুরু হয় দেশের তরুণ ও যুব সমাজকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া। সেই শুরুর পথ যে এত দীর্ঘ হবে, যা কল্পনাও করা যায়নি। কিন্তু বাস্তবে ফেন্সিডিলের আগ্রাসনকে তীব্র গতিতে ছাড়িয়ে গেছে সহজে বহনযোগ্য ইয়াবার আগ্রাসন। এখন হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় ইয়াবা নামক মরণঘাতি ছোট ছোট ট্যাবলেট। সহজলভ্য হওয়ায় এর ব্যাপকতা বেড়েছে কয়েক‘শ গুণ। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই এখন ইয়াবায় আসক্ত।

 ইয়াবার মরণ নেশা গোটা দেশের তারুণ্যকে ধ্বংসের পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যে পরিবারে একজন মাদকাসক্ত রয়েছে, সে পরিবারের সুখ শান্তি প্রতিনিয়তই নিঃশেষ হচ্ছে। একজন মাদকসেবী এক একটি পরিবারের অভিশাপ হয়ে উঠছে। একজন মাদকাসক্তের কাছে মায়া, মমতা, ভালবাসা, ন্যায় অন্যায় বোধ বলতে কিছুই নেই। এমন কোন হীন কাজ নেই, যা করতে সে দ্বিধাবোধ করে। ফলে মাদকাসক্ত স্বামীর হাতে স্ত্রী, সন্তানের হাতে বাবা-মা, ভাইয়ের হাতে ভাইবোন কিম্বা ছাত্রের হাতে শিক্ষক খুন হচ্ছেন। শুধু কি তাই? একজন মাদকাসক্ত নেশার টাকার জন্য চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাইয়ের মত অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অনেক সময়ই একজন মাদকাসক্ত মাদকের টাকার জন্য মানুষকে খুন পর্যন্ত করছে। প্রতিনিয়তই দেশের কোথাও না কোথাও এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। শুধু মাদকের কারণেই তছনছ হচ্ছে কত পরিবার, ভাঙছে কোন না কোন সংসার। বাড়ছে পারিবারিদ্ব দ্বন্দ্ব, বিভেদ আর অস্থিরতা। মাদকের টাকার জন্য আদরের সন্তানকে বিক্রি করে দেওয়ার মত মর্মস্পর্শী ঘটনাও ঘটছে।

এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে নেশাগ্রস্ত সন্তানের হাতে খুন হয়েছেন কমপক্ষে ৩৮৭ জন মা-বাবা। মাদকসেবী স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন ২৫৬ জন নারী। মাদকাসক্ত প্রেমিক-প্রেমিকার হাতে খুন হয়েছেন ৬৭০ জন তরুণ তরুণী। আবার মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় একই সময়ে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৮৮৭টি। কি পরিমাণ সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক মূল্যবোধের অপমৃত্যু ঘটেছে, যা এই পরিসংখ্যান দেখলেই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। গোটাবিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তিতে যতদূর সমৃদ্ধ  হয়েছে, ততটুকু মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটেনি। ফলে আকাশ অপসংস্কৃতি, মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারে পর্ণ ছবির জগতে প্রবেশের পর কোমলমতি স্কুল, কলেজগামী শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে আসক্ত হচ্ছে মাদক এবং রুচিবর্জিত যৌনাচারের দিকেই। ফলে বাবা-মায়ের আদরের সন্তানটি কখন কিভাবে নিজেকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে, তা অজানাই থেকে গেছে। ফলে বিপথগামী সন্তানের ভবিষ্যৎ ভেবে কত বাবা-মায়েই না আজ অসহায়ের মত ভাগ্যকে নিয়তির হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে! কোথায় এর প্রতিকার? কোন বাবা-মা-ই তো চান না, নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এভাবে ধ্বংস হয়ে যাক। তারপর তাইতো হচ্ছে প্রতিনিয়তই। এ দায় পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র কি করে এড়াবে? কোথায় এর সমাধান? যখন এমনি হাজারো প্রশ্ন ভুক্তভোগিদের অস্থির করে তুলছে, তখন ঘোষনা এলো, মাদককে যে কোন মূল্যে ধ্বংস করে দিতে হবে।

 গত ২০মে সন্ধ্যায় গণভবনে প্রাধানমন্ত্রী ঘোষনা করলেন, আমরা যেমন জঙ্গিবাদকে দমন করেছি, তেমনি মাদক থেকেও দেশকে উদ্ধার করবো। এ ঘোষণাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। প্রাধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, মাদককে নির্মূল করতেই হবে। তা না হলে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের নিষ্কৃতির তো আর কোন পথ খোলা নেই। এ জন্য প্রয়োজন গোটা দেশের মানুষকে সচেতন করা। প্রতিটি পরিবার যেন নিজের সন্তানদের মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন গড়ে তোলে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকের কুফল নিয়ে কাউন্সিলিং করতে হবে। স্মরণে রাখতে হবে, আমরা ভোগবাদী একটি রাষ্ট্র কাঠামোর অধীনে বসবাস করছি। আর ভোগবাদী রাষ্ট্রের ধর্মই হচ্ছে, নীতি নৈতিকতার কোন বালাই নেই, যেখানে চাই শুধু টাকা আর টাকা। সে টাকা ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট করে যেভাবেই হোক রাতারাতি কোটি টাকার মালিক হতে হবে। এ যেন ভোগবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থার এক নগ্ন প্রতিযোগিতা! সংগত কারণেই মাদকের অনৈতিক ব্যবসার সুযোগকে অনেকেই হাত ছাড়া করতে চান না। সুযোগ পেলেই ইয়াবার ব্যবসায়ী হয়ে যান। তা না হলে গত ৫মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক চিকিৎসককে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চান্দিনা উপজেলার বাগুর এলাকায় এক হাজার দুইশত পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার হতে হবে কেন?

এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানা গেছে, প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ইয়াবা দেশে প্রবেশ করে। দেশের প্রায় ৬৫ ভাগ তরুণ তরুণী ইয়াবার মরণ নেশায় আসক্ত। যেমন রমরমা বিক্রি তেমনি লাভও অনেক। রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়ার অপূর্ব সুযোগ! মূলত যেসব এলাকা দিয়ে ইয়াবার চালান ঢোকে, তার মধ্যে টেকনাফ অন্যতম। টেকনাফে মোট ১৩৩টি গ্রাম রয়েছে, যার মধ্যে ১০০টি গ্রামই ইয়াবার ব্যবসার সংগে জড়িত। জনশ্রুতি আছে, জনপ্রতিনিধিদের কেউ কেউ অনৈতিক এ ব্যবসার সংগে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে জড়িত আছে। আবার আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ কেউ অনৈতিক সুবিধা আদায়ের বিনিময়ে মাদককে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছেন। পুলিশি তৎপরতা বাড়ার কারণে ইয়াবার বিক্রির কৌশলও পরিবর্তন হয়েছে। মোবাইল ফোনে ডেকে এনে অথবা মটর সাইকেলে ফেরি করে তরুণ-তরুণীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে ইয়াবা।

পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, মরন নেশা ইয়াবার ব্যবহার শুরু হওয়ার পর জ্যামিতিক আকারে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যাও যেমন বেড়েছে, তেমনি মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যাও বেড়েছে। বর্তমান আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর জিরো টলারেন্স অভিযান অব্যাহত থাকলে এবং প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করলে হয়তো এ আগ্রাসনের হাত থেকে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচানো সম্ভব হবে। এ জন্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে যেমন দায়িত্বশীল পেশাদারীত্বকে নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি গোটা দেশেই পাড়ায় মহল্লায় মাদক বিরোধী প্রচার প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে হবে অর্থাৎ দলমত নির্বিশেষে সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া সর্বগ্রাসী মাদকের ভয়াল থাবা রোধ করা অনেকাংশেই কঠিন হবে।
 লেখক: প্রাবন্ধিক
[email protected]
-০১৯২২৬৯৮৮২৮