মাদকবিরোধী অভিযানে ৮ জেলায় আরও ১১ জন নিহত

মাদকবিরোধী অভিযানে ৮ জেলায় আরও ১১ জন নিহত

চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে আট জেলায় আরও অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। এনিয়ে গত নয় দিনে নিহতের সংখ্যা দাঁড়াল ৯০ জন।

রোববার রাতে অভিযানে সাতক্ষীরায় দুজন, কুমিল্লায় দুজন, পিরোজপুরে দুজন, ঢাকায় একজন, মুন্সীগঞ্জে একজন, চাঁদপুরে একজন, ঝিনাইদহে একজন এবং পাবনায় একজন নিহত হয়েছেন।

নিহতরা সবাই মাদক কেনা-বেচায় জড়িত বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। তবে তাদের বক্তব্য ও ঘটনার বিবরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

শুরুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা পড়ার কথা জানানো হলেও এখন গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধারের খবর দিয়ে বলা হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গোলাগুলিতে মারা পড়ছেন তারা।

সমালোচনার মধ্যেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, তারা মাদকের বিরুদ্ধে ‘অলআউট’ যুদ্ধে নেমেছেন, নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।

কুমিল্লা: দেবিদ্বারের পশ্চিম ভিংলাবাড়ি এবংসদর দক্ষিণ উপজেলার ভারতীয় সীমান্তবর্তী গলিয়ারা এলাকায় পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন এনামুল হক দোলন ভূইয়া (৩৫) ও নুরু (৫৫) নামের দুজন।

দেবিদ্বারে নিহত দোলন উপজেলার ভিংলাবাড়ি (মির্জানগর) গ্রামের মৃত আবদুল্লা ভূইয়ার ছেলে এবং সদর দক্ষিণে নিহত নুরু উপজেলার কালিকাপুর গ্রামের আবদুল কাদের ওহাবের ছেলে।

পুলিশ বলছে, দোলন ভূইয়া পুলিশের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি এবং ও নুরুও মাদক কেনা-বেচায় জড়িত।

দেবিদ্বার থানার ওসি মো. মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, মাদক উদ্ধারে পুলিশের একটি দল পশ্চিম ভিংলাবাড়ি এলাকায় গোমতী বাঁধে অবস্থান নিয়েছিল।

“সেখানে দোলনসহ তার সহযোগীদের আটকাতে চাইলে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এ সময় পুলিশও আত্মরক্ষায় ২৩ রাউন্ড শটগানের গুলি চালায়। উভয় পক্ষের গুলিবিনিময়ে মাদক ব্যবসায়ী দোলন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়।”

দোলনকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক।

অভিযানের সময় থানার এসআই যুবরাজ বিশ্বাস, পুলিশ সদস্য গনেশ, মনির ও রাজ্জাক আহত হন বলে জানান ওসি মিজান।

তিনি বলেন, দোলনের বিরুদ্ধে দেবিদ্বার ও মুরাদনগর থানায় ১২টি মাদকের মামলা রয়েছে।

অন্যদিকে রাত দেড়টার দিকে সদর দক্ষিণ উপজেলার গলিয়ারায় পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান নুরু।

সদর দক্ষিণ থানার ওসি নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশ সীমান্তবর্তী গলিয়ারা এলাকায় অভিযানে গেলে নুরু ও তার সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।

“পুলিশও আত্মরক্ষায় গুলি চালালে ঘটনাস্থলে গুলিবিদ্ধ হয়ে নুরু গুরুতর আহত হয়। তাকে উদ্ধারের পর কুমেক হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।”

অভিযানের সময় তিনি পুলিশ সদস্য আহত হন বলে ওসি জানান। ঘটনাস্থল থেকে একটি বিদেশি রিভলবার ও ৫ কেজি গাঁজা উদ্ধারের কথাও বলেন তিনি।

ওসি বলেন, নুরু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী এবং তার বিরুদ্ধে ১১টি মাদক ও ১টি অস্ত্র মামলা রয়েছে।

মাদকবিরোধী অভিযানে কুমিল্লায় এ নিয়ে  গত এক সপ্তাহে ১০ জন নিহত হলেন। সদর উপজেলার কোতোয়ালিতে ২ জন, চৌদ্দগ্রামে ১জন, সদর দক্ষিণে ৩ জন, বুড়িচংয়ে ১ জন, ব্রাহ্মণপাড়ায় ২ জন এবং দেবিদ্বারে ১ জন।

পিরোজপুর: সদর উপজেলায় অহিদুজ্জামান অহিদ এবং মঠবাড়িয়া উপজেলায় মো. মিজান নামে দুজন নিহত হন কথিত বন্দুকযুদ্ধে।

অহিদ নেছারাবাদ উপজেলার দক্ষিণ কৌড়িখারা সোহাগদল গ্রামের মৃত আব্দুর রহমান খানের ছেলে। মিজানের বাড়ি মঠবাড়িয়ার দাউদখালী ইউনিয়নে। একটি মামলায়  দণ্ডিত অহিদের বিরুদ্ধে আরও ৮টি মাদক মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। মিজানের বিরুদ্ধেও একাধিক মাদক মামলা রয়েছে।

পিরোজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জিএম আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের জানান, অহিদকে কৃষ্ণনগর এলাকা থেকে রোববার দুপুরে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। রাতে তাকে নিয়ে মাদক উদ্ধারের জন্য অভিযানে বের হয় গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল।

তিনি বলেন, “দলটি কলাখালী ইউনিয়নের কৌবত্তখালী গ্রামে অভিযানে গেলে রাত পৌনে ১টার দিকে অহিদের সহযোগীরা পুলিশের উপর হামলা চালালে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। এসময় এএসআই মো. আলামিন ও পুলিশ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান আহত হয় এবং অহিদ গুলিবিদ্ধ হয়।”

অহিদকে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনাস্থল থেকে ১ টি পাইপগান, ২টি দা, ৫ রাউন্ড বন্দুকের কার্তুজ ও ১৭৫টি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

মঠবাড়িয়া থানার ওসি মো. গোলাম ছরোয়ার সাংবাদিকদের বলেন, উপজেলার বড় মাছুয়া ইউনিয়নে অভিযানে যাওয়া পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মিজান নিহত হন।

অভিযানে মঠবাড়িয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাজাহারুল ইসলামসহ ৪ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে বলে জানান ওসি।

ঘটনাস্থল থেকে দেড় কেজি গাঁজা, ৬০টি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধারের কথাও জানান তিনি।

সাতক্ষীরা: ভোমরা সড়কের বাঁকালের আগুনপুর গ্রামে রাস্তার পাশে অজ্ঞাত পরিচয়ের দুই ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, তারা মাদকের ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের মধ্যে গোলাগুলিতে নিহত হয়েছেন।

সদর থানার এসআই প্রবীর কুমার দাস সাংবাদিকদের জানান, “ভোরে খবর আসে যে আলীপুর ইউনিয়নের আগুনপুর গ্রামের বাঁকালের সবুরের ঘেরের পাশে দুটি লাশ পড়ে রয়েছে। নিহত প্রত্যেকের দেহে একটি করে গুলির চিহ্ন রয়েছে।

“পাশেই পাওয়া গেছে একটি ওয়ান শুটার গান ও ১০৫ বোতল ফেনসিডিল। এ ছাড়া মদের খালি বোতলও পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে যে তারা মাদকের ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।”

ঢাকা: রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর এলাকায় গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে একজন নিহত হন।

নিহতের নাম পুলিশ নিশ্চিত করতে না পারলেও স্থানীয়রা বলছেন, তিনি রূপনগরের চলন্তিকা বস্তির ‘শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী’ নজরুল ইসলাম নজু।

ডিএমপির ডিবির উপ কমিশনার মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, “রূপনগর সরকারী কর্মচারীদের জন্য নির্মাণাধীন ভবনে মাদক ব্যবসায়ীদের অবস্থানের খবর পেয়ে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল রাত ৩টার দিকে সেখানে যায়।

“এ সময় মাদক ব্যবসায়ীরা গুলি ছুড়লে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। এতে একজন গুলিবিদ্ধ হয়।”

গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে পুলিশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনাস্থল থেকে দুই রাউন্ড গুলিসহ একটি পিস্তল ও পাঁচ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধারের কথা জানিয়ছে পুলিশ।

মুন্সীগঞ্জ: সদর উপজেলার মুরমা গ্রামে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সুমন বিশ্বাস (৩৬) নামে একজন নিহত হন। তিনি ওই এলাকার বাবুল বিশ্বাসের ছেলে।

মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার মোহাম্মদ আবজারুল বাসার সাংবাদিকদের বলেন, সুমনকে রাত আড়াইটার দিকে পুলিশ মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসে।

মুন্সীগঞ্জ সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গাজী সালাউদ্দিন জানান, “মিরকাদিম পৌরসভার মুড়মা এলাকায় দুই দল মাদক বিক্রেতার বন্দুকযুদ্ধ হয়। এই সময় প্রতিপক্ষের গুলিতে সুমন নিহত হয়।”

সুমন মাদকসহ ২০ থেকে ২৫টি মামলার আসামি বলে পুলিশ জানিয়েছে।

ঘটনাস্থল থেকে একটি ছুরি ও বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধারের কথাও জানান পুলিশ কর্মকর্তা সালাউদ্দিন।

ঝিনাইদহ: সদর উপজেলার জারগ্রামে ফরিদ হোসেন ( ৪২ ) নাম একজন মাদকের টাকার ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের গোলাগুলিতে নিহত হন বলে পুলিশের দাবি।

ফরিদ ঝিনাইদহ শহরের পাগলা কানাই এলাকার মহম্মদ আলীর ছেলে। তাকে জেলার ‘শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী’ বলছে পুলিশ।    

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ( ঝিনাইদহ সদর সর্কেল ) কনক কুমার দাস সাংবাদিকদের বলেন, “রাত ১টার দিকে জারগ্রামে গোলাগুলির শব্দ শুনে টহল পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে একজনের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে।”

ঘটনাস্থল থেকে  একটি পিস্তল, ২টি গুলি, ১টি ম্যাগজিন, কেজি খানেক গাঁজা, ২০ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

চাঁদপুর: ফরিদগঞ্জ উপজেলায় পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে আবু সাঈদ বাদশা ওরফে লাল বাদশা (৪৫) নামে একজন নিহত হয়েছেন। বাদশা ফরিদগঞ্জের গোবিন্দপুর গ্রামের আবদুর রশিদ ছৈয়ালের ছেলে। তার বিরুদ্ধে ১০টি মাদক মামলা রয়েছে।

ফরিদগঞ্জ থানার ওসি শাহ আলম সাংবাদিকদের বলেন, “পুলিশের একটি দল গভীর রাতে অভিযানে বের হয়ে গুপ্টি ব্রিজ এলাকায় গেলে মাদক ব্যবসায়ীরা পুলিশের উপর হামলা ও গুলি চালায়। এ সময় পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। এতে গুলিবিদ্ধ হয় আবু সাঈদ বাদশা।”

বাদশাকে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

অভিযানস্থলে ১১১টি ইয়াবা ট্যাবলেট, ১টি একনলা বন্দুক, ৪ রাউন্ড গুলি ও ১টি হাতবোমা পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

পাবনা: বেড়া উপজেলায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ইজ্জত আলী প্রামানিক (২৮) নামে একজন মারা গেছেন। তিনি উপজেলার হাটুরিয়া পূর্বপাড়ার মৃত আজাহার আলী প্রামাণিকের ছেলে। তার বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও অপহরণের অভিযোগে ১৪টি মামলা রয়েছে।

পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস সাংবাদিকদের বলেন, রাত দেড়টার দিকে বেড়া থানা পুলিশের একটি দল টহল দেওয়ার সময় পৌর এলাকার তেঘরী মহল্লার একটি বাগানের সামনের রাস্তায় একদল ডাকাত দেখতে পায়।

“তারা রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে গাড়ি থামানোর চেষ্টা করছিল। পুলিশ সদস্যরা গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথে পুলিশকে লক্ষ্য করে তারা গুলি ছোড়ে ও ককটেল ফাটায়। তখন পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়।”

‘বন্দুকযুদ্ধে’র এক পর্যায়ে ডাকাত দল পিছু হটলে ঘটনাস্থলে ইজ্জত আলীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায় বলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

গৌতম বিশ্বাস বলেন, এ ঘটনায় এসআই সুব্রত কুমার বিশ্বাসসহ ৫ পুলিশ সদস্য আহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় একটি দেশি শাটারগান, ৪ রাউন্ড গুলিসহ বেশ কিছু মাদকদ্রব্য।