মাদক বিক্রয় লব্ধ অর্থ হারাম

মাদক বিক্রয় লব্ধ অর্থ হারাম

মোহাম্মদ শাহ আলম : হে ঈমানদারগণ! (তোমরা জেনে রেখো) মদ, জুয়া ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর হচ্ছে ঘৃণিত শয়তানের কাজ। অতএব তোমরা (সম্পূর্ণ রূপে) তা বর্জন করো। আশা করা যায়, তোমরা মুক্তি পাবে। শয়তান এই মদ ও জুয়ার মধ্যে ফেলে তোমাদের আল্লাহ তাআলার স্মরণ ও নামাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, তোমরা কি (মদ ও জুয়া থেকে) ফিরে আসবে না (সুরা আল মায়েদা ৯০-৯১)।অবশেষে সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। যখন এ কলাম লিখছি শুরু থেকে ততদিনে মাদক বিরোধী অভিযানে শতাধিক মাদক ব্যবসায়ীর নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ একটি মুসলিম রাষ্ট্র।  এদেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মভীরু। এ ধর্মভীরুতার মাঝেই বিদেশী সংস্কৃতির আনুকূল্যে আমরা তথা বাংলাদেশের প্রত্যেকটি পরিবার মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতায় ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম হতাশায় ভুগছি। এ হতাশা সকলের আপনার আমার সবার। এ অবস্থায় সরকারের মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণায় সাধুবাদ পাওয়ার দাবি রাখে। কেননা সরকারের আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা জানে বাংলাদেশের কোন এলাকায় কে মাদক ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। প্রিয় পাঠক, আপনাদের সামনে আমি মদ সম্পর্কিত পবিত্র কোরআন ও হাদিস থেকে কিছু তথ্য তুলে ধরবো। মদের সংজ্ঞা: মদ বা মাদক বলতে আমরা বুঝি, যা পান করলে বা গলধ:করণ করলে পানকারীর জ্ঞান তথা মস্তিষ্কের কার্যক্রম লোপ পায়। পূর্বে, মদ তৈরি হত, আঙ্গুর, খেজুর, মধু, গম, আখ ও যব দ্বারা কিন্তু বর্তমানে মদ বা মাদকের উন্নতর সংস্করণ হলো গাজা, হেরোইন, প্যাথেড্রিন, ইয়াবা, বাবা, ফেন্সিডিল সহ আরো হরেক রকম মাদক।

আজকে এই একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে মাদকের অভিজাত গন্ডি পেরিয়ে দেশের আনাচে-কানাচে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, গরিব সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে মাদক গ্রহণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ফলে সমাজের সকলের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পাঠক, মাদকের এই ভয়াবহ আগ্রাসন থেকে বাঁচতে হলে আমাদের সকলকে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে ছেলে/মেয়েদের ছোট বেলা থেকেই গড়ে তুলতে হবে। চলুন জেনে নিই মদ সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ কি বলছে?মদ হারাম হওয়ার ইতিকথা: ইমাম আহমদ (রহ:) হযরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেছেন, আল্লাহ পাক তিনবার মদ হারাম করেছেন। প্রথমবার যখন রাসুল (রা.) মদিনায় আগমন করেন, তখন মদিনাবাসীরা মদ্যপান করতো এবং জুয়ালব্ধ মাল ভক্ষণ করতো।

“হে নবী, এরা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছে, তুমি তাদের বলে দাও, এ দুটো জিনিসের মধ্যে অনেক বড় ধরনের পাপ রয়েছে। (সুরা বাকারা-২১৯)। আলোচ্য আয়াত নাজিল হলে লোকেরা বলতে থাকে আমাদের জন্য মদ কেন হারাম হবে? আল্লাহ তাআলা তো বলেছেন এতে তো কম উপকার ও বেশি অপকারের কথা, নিষেধতো করা হয়নি। তাই এরপরও তারা মদ পান করতে থাকে। তখন একদিন এক মোহাজের সাহাবী মাগরিবের নামাজে সুরা কাফিরুন পড়তে গিয়ে উল্টাপাল্টা করে ফেলেন। অত:পর আল্লাহতাআলা উপরোক্ত আয়াত থেকে নিম্নের কঠিন বিধান সম্বলিত আয়াতটি নাজিল করেন। “হে ঈমানদাররা। তোমরা কখনো নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের ধারে কাছেও যেওনা। যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা এতটুকু নিশ্চিত না হবে। তোমরা যা কিছু বলছো তা তোমরা (ঠিক ঠিক) জানতে ও বুঝতে পারছো।” (সুরা আন নেছা, আয়াত-৪৩)।

উল্লেখ্য, এ আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বারণ করার নির্দেশ না থাকার কারণে লোকেরা একটু থেমে আবার পুরোদমে মদ পান শুরু করে এবং একদিন এক ব্যক্তি পূর্বের মত নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজে রত হলে আল্লাহ তাআলা কঠোর ও সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দেন- “হে ঈমানদারগণ। (তোমরা জেনে রেখো) মদ, জুয়া ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর হচ্ছে ঘৃণিত শয়তানের কাজ। অতএব তোমরা (সম্পূর্ণ রূপে) তা বর্জন করো। আশা করা যায়, তোমরা মুক্তি পাবে। শয়তান এই মদ ও জুয়ার মধ্যে ফেলে তোমাদের আল্লাহ তাআলার স্মরণ ও নামাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, তোমরা কি (মদ ও জুয়া থেকে) ফিরে আসবে না” (সুরা আল মায়েদা ৯০-৯১) এ আয়াত নাজিল হলে সাহাবায়ে কেরামগণ বললেন, হে আমাদের প্রভূ! এই মুহূর্তে আমরা মদ ও জুয়াসহ সকল নিষিদ্ধ কাজ বর্জন করলাম।

সহীহ বোখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) মিম্বরে উঠে ভাষণ দিলেন, হে লোক সকল মদ হারাম করা হয়েছে।মদ বিক্রয়ের অর্থ হারাম: ইমাম আহমদ (রহ:) হযরত ইয়ালা (রহ:) থেকে বর্ণনা করেন, ইয়ালা বলেন, আমি মদ বিক্রয় সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রা.) কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন- বনী সাকীফ অথবা বনী দাওস গোত্রের রসূল (সা.) এর এক বন্ধু মক্কা বিজয়ের দিন এক বোতল মদ উপঢৌকন আনেন। তখন রসূল (সা.) তাকে বলেন, ওহে! তুমি কি জানো না, আল্লাহ তাআলা মদ হারাম করেছেন? একথা শুনে লোকটি এগিয়ে এসে তার গোলামকে বললো, যাও, এটা বিক্রি করে দাও। নবী (সা.) তাকে বললেন, ওহে! তোমার গোলামকে কি বললে? লোকটি বলল, আমি তাকে এ মদ বিক্রি করে দিতে বলেছি। রসূল (সা.) বললেন, যিনি মদ হারাম করেছেন, তিনি এর ক্রয়-বিক্রয় ও হারাম করে দিয়েছেন। অত:পর লোকটি তার গোলামকে মদের সকল বোতল শহরের বাইরে নিয়ে ভেঙ্গে ফেলার আদেশ করেন।
অন্য এক হাদীসে ইমাম আহমদ (রহ:) বলেন, ইয়াহইয়া ইবনে সাইদ হোমাইদ থেকে আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আনাস (রা.) বলেছেন, একদা আমি হযরত আবু তালহা (রা.) এর ঘরে বসে হযরত আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.), হযরত উবাই
ইবনে কাব (রা) ও হযরত সাঈদ ইবনে বায়যা (রা.) সহ একদল সাহাবীকে মদ পরিবেশন করছিলাম। এমন কি তারা মদপান করতে উদ্যত হয়েছেন। এমন সময় জনৈক মুসলমান এসে আমাদের বললেন, মদ যে হারাম করা হয়েছে। তা তোমরা জান কি? তখন তারা তাকে বললেন, তোমার কথার সত্যতা যাচাই করতে হবে। অবশেষে তারা লোকটির দিকে তাকিয়ে তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলো এবং আমাকে বললেন, হে আনাস! তুমি অবশিষ্ট মদগুলো পাত্রে রেখে দাও। বাকী সকলে বললেন, ঠিক আছে আমরা আর কখনো মদ পান করবো না। আল্লাহর কসম, আমরা আর কখনো মদ পান করবো না। আমি যে মদপান করাচ্ছিলাম, তা ছিল খেজুর ও যব থেকে তৈরি।

হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, আরেকটি হাদীস। হযরত আনাস (রা.) বলেন, যেদিন মদ হারাম করা হয়, সেদিন আমি হযরত আবু তালহার ঘরে মদ পরিবেশন করছিলাম। এমন সময় আমি শুনতে পেলাম, বাহিরে কোন এক আহ্বানকারী লোকদের সম্বোধন করে উচ্চস্বরে কি যেন বলছিলেন। অত:পর আমি বের হলাম, জনৈক আহ্বানকারী বলছিলেন, খবরদার মদ হারাম করা হয়েছে। লক্ষ্য করলাম, মদিনার অলি-গলি দিয়ে মদ প্রবাহিত হচ্ছে। তখন আবু তালাহা (রা.) আমাকে বললেন, তুমি বাহির হও। আমি আমার মদের পাত্রগুলি ভেঙ্গে ফেলব। এ বলে তিনি তার মদের মটকিগুলি ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ করলেন।ইমাম আহমদ (রহ:) হযরত কায়স ইবনে সাঈদ ইবনে উবাদা (রহ:) থেকে বর্ণনা করেন, রসূল (সা.) বলেছেন, আমার প্রভু মদ, পাশা মোট কথা যা পান করলে নেশা হয়, তা সমূদয় হারাম করেছেন।ইমাম আহমদ (রহ.) হযরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রসূল (সা.) বলেছেন মদ/ মাদকের সাথে জড়িত দশ ব্যক্তির উপর আল্লাহর অভিশাপ। তারা হলো মুল মদ, মদ্যপায়ী, মদ পরিবেশক মদ বিক্রেতা, মদের ক্রেতা, মদ উৎপাদনকারী কর্মচারি, মদ উৎপাদক, মদের পরিবাহক, মদ আমদানিকারক ও মদের বিক্রয়লব্ধ অর্থ ভক্ষণকারী এ সকল ব্যক্তির উপর আল্লাহ তাআলার অভিশাপ।

ইমাম আহমদ (রহ:) হযরত আসমা বিনতে ইয়াজীদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আসমা (রা.) বলেন, আমি রসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, যে লোক মদ্যপান করবে, মহান আল্লাহ তাআলা চল্লিশ দিন তার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকবেন। যদি এ সময়ের মধ্যে সে মারা যায় তবে কাফের অবস্থায় সে মারা যাবে। কিন্তু সে যদি তওবা করে তবে আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করবেন। এরপরও যদি সে পুনরায় মদ্যপান করে, তবে তাকে (জাহান্নামে) “তীনাতুল খাবাল” পান করানো হবে। হযরত আসমা (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রসূল “তীনাতুল খাবাল” কি? নবীজি (সা.) বললেন, তা হলো জাহান্নামীদের শরীরের বিগলিত রক্ত ও পুঁজ। (সূত্র: আল কোরআন) দৈনিক পত্রিকা, তাফসীরে ইবনে কাসীর, সাহাবীদের জীবনী ও বেদায়াহ ও নেহায়াহ)। পাঠক, লেখার কলেবর বৃদ্ধি পাওয়ায় লেখা অনেক সংক্ষেপ হলো ক্ষমা করবেন।
লেখক ঃ প্রভাষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
মহাস্থান মাহী সওয়ার ডিগ্রি কলেজ, বগুড়া।
০১৮৫৭-৪৫২১৬২