মাঠের মত রাজনীতিতেও ভাল খেলা চাই

মাঠের মত রাজনীতিতেও ভাল খেলা চাই

আতাউর রহমান মিটন : যেভাবেই বলুন, আশা থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ‘আশা’র সঙ্গে ‘প্রত্যয়’ যুক্ত হলে যে ‘প্রত্যাশা’ তৈরি হয় সেটাই মানুষকে বিজয়ী করে। বিশ্বকাপ ২০১৮ শেষে আমরা নিশ্চিতভাবেই প্রত্যাশার বিজয় দেখলাম। যদিও এই জয়ের জন্য ফ্রান্সকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ২০ বছর! প্রত্যাশা, আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য্য এবং অধ্যবসায় সফলতার জন্য অপরিহার্য, এবারের বিশ্বকাপে ফরাসী টিম সেটা প্রমাণ করেছে। অভিনন্দন ফরাসী দলকে এবং প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও স্বাগতম বিশ্বের এ মুহূর্তের কনিষ্ঠতম ফুটবল তারকা এমবাপ্পেকে! ব্রাজিলের ফুটবল কিংবদন্তী পেলের পর ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে হচ্ছেন দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় যিনি বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে গোল দিয়েছেন। সব মিলিয়ে এবারের আসরে তিনি চারটি গোল করেছেন।

ফ্রান্স বা ফরাসি প্রজাতন্ত্র আয়তনের দিক থেকে রাশিয়া ও ইউক্রেনের পরে ইউরোপের তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র। বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো জাতি-রাষ্ট্রের মধ্যে একটি হল ফ্রান্স। এটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতিগুলির একটি। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ফ্রান্সের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। ফ্রান্স ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম প্রধান সদস্য এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো প্রদানের ক্ষমতাধারী পাঁচ স্থায়ী সদস্য-দেশের অন্যতম। ফরাসি রাজনীতির ইতিহাসে নেপোলিয়নের পরে সর্বকনিষ্ঠ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নাম লিখিয়েছেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। প্রায় ১১৩ বছর ফরাসি সাম্রাজ্য দখল করে ৩৫ বছর বয়সে রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছিলেন ইতালির সামরিক কমান্ডার নেপোলিয়ন, আর তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে নেপোলিয়ন পরবর্তী ফ্রান্সের সবচেয়ে কমবয়সী রাষ্ট্রপতি হয়েছেন ইমানুয়েল। উন্নত দেশগুলোর জোট জি ৭-এর নেতাদের মধ্যেও তিনি সর্বকনিষ্ঠ।

ফরাসী প্রেসিডেন্টের তারুণ্যের সেই বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাসের প্রমাণ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ একসঙ্গে টেলিভিশনের পর্দায় দেখল বিশ্বকাপ ফুটবলের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে। ফ্রান্সের জয়ের পর উল্লাস দেখাতে গিয়ে অভিজাত এই প্রেসিডেন্ট মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ফাইনালের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বৃষ্টির পরোয়া না করেই কোট-টাই পরে ভিজতে থাকলেন। জয়ের আনন্দে চুম্বনে সিক্ত করলেন ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট কোলিন্দা গ্রাবার-কিতারোভিচকে। বৃষ্টিভেজা বিশ্বকাপের এই পুরস্কার বিতরণী পর্বটিও সত্যিই চরম শিহরণের! অনুষ্ঠান চলাকালে হঠাৎ নেমে আসা বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ছাতার আশ্রয় নিলেও সে পথে যাননি ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্টদ্বয়। বরং বৃষ্টিকে ‘কুচ পরোয়া নেহি’ জানিয়ে তাঁরা দুজনেই বৃষ্টিতে সিক্ত হয়ে বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের হৃদয়ে এক মোহনীয় রোমাঞ্চের ঝংকার তুলেছেন। বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দের সাথে ফ্রান্স-ক্রোয়েশিয়ার নেতৃদ্বয়ের সেই বৃষ্টিভেজা প্রীতিও আমাদের মত দর্শকদের চরম পুলকিত করেছে। আমরা এই ঐতিহাসিক পর্বেরও সাক্ষী হয়ে থাকলাম!

বিশ্বকাপ ফাইনাল আগেও হয়েছে এবং আগামীতেও হবে। কিন্তু পুরস্কার প্রদানের এমন রোমাঞ্চকর বৃষ্টিভেজা রজনী আর কেউ কেখনও দেখার সুযোগ পাবেন কিনা জানিনা। এ সময়কালে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আবেদনময়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে খ্যাত ক্রোয়েশিয়ার কোলিন্দা গ্রাবার- কিতারোভিচকে পুরো বিশ্বকাপ খেলায় গ্যালারীতে ও পুরস্কারের অনুষ্ঠানে যেভাবে দেখলাম তা খেলার উত্তেজনার চেয়ে কোন অংশে কম নয়! এবারের বিশ্বকাপের আলোচিত নারী চরিত্র হিসেবে তিনি আবির্ভূত হয়েছেন আর হৃদয় নাচিয়েছেন অসংখ্য পুরুষের! রাশিয়ায় গিয়ে কোলিন্দা কিতারোভিচ কূটনীতি যতটুকুই করেছেন, সেটিও ফুটবলকেন্দ্রিক। পুতিন আর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দিয়েছেন ক্রোয়েশিয়ার জার্সি। ন্যাটোর সম্মেলনে গিয়ে জার্সি উপহার দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। আর ফাইনালের অনুষ্ঠানে ইমানুয়েল বাড়তি উপহার হিসেবে পেয়েছেন চুম্বন। ফাইনাল নিয়ে ক্রোয়াট নেত্রী তাই যথার্থই বলেছেন ‘ফল যা-ই হোক, আমরাই জয়ী।’ খেলা নিয়ে তাঁর উন্মাদনা, সবার সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা, ইত্যাদি সব মিলিয়ে তিনিও রাশিয়া বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত তারকা!

বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে সৃষ্ট উন্মাদনার শেষ হতে না হতেই ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতে গত সোমবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর বৈঠক নিয়ে বিশ্ব গণ্যমাধ্যম সরব হয়ে উঠেছে। হেলসিঙ্কি বৈঠকে পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের সিরিয়া যুদ্ধ, পরমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ, বিশ্ব বাণিজ্য ইত্যাদির পাশাপাশি গত শুক্রবারে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত কর্তৃক রাশিয়ার ১২ কর্মকর্তাকে ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগে অভিযুক্ত করার প্রসঙ্গ নিয়েও আলোচনা হবার কথা। তবে এসবের বাইরেও এই বৈঠকে তেল নিয়ে ভবিষ্যত বাণিজ্য রূপরেখা প্রণয়নেরও সম্ভাবনা রয়েছে। কিমের পরে পুতিনের সাথে বৈঠক নানা দিক থেকেই ট্রাম্পের বৈশ্বিক কূটনৈতিক সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন আর না থাকলেও ভøাদিমির পুতিন রাশিয়াকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ‘শক্তিধর’ রাষ্ট্রে পরিণত করার তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে সকলেই মনে করেন। সে কারণে ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বহু আগে থেকেই বৈরি সম্পর্ক  বিদ্যমান। ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ এর অভিযোগ সেই সম্পর্ক আরো খারাপ করে তুলেছে। এটা সবাই জানেন যে, ভøাদিমির পুতিন রাশিয়াকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে নিয়ে যেতে চান এবং যুক্তরাষ্ট্র সেটা কোনভাবেই হতে দিতে চায় না, ফলে উভয়ের মধ্যে প্যাঁচ কষাকষি বা কুস্তির লড়াই চিরন্তন!

সত্যিই এসব বড় বড় নেতাদের বৈঠকে কি লাভ হয় তা বলা কঠিন। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই তাদের এই মিটিং অনুষ্ঠিত হয় গণমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণার উদ্দেশ্যে। প্রকৃত আলোচনা বা সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় অনেকগুলো ধাপে, বিভিন্ন পর্যায়ে আলাপ-আলোচনার নিরিখে। পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়াকে ভয় পায়। আবার জ্বালানির উপর নির্ভরশীলতার জন্য অনেককেই রাশিয়ার উপর নির্ভর করে চলতে হয়। পুতিন একজন নিঃশব্দ কূটনীতিক। ট্রাম্প এর মত বাগাড়ম্বর না করেও পুতিন রাশিয়ার লক্ষ্য অর্থাৎ শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সেখানে বাধা হবে জেনেই পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দেন-দরবার চালাচ্ছে যাতে করে তাঁর স্বার্থ সুরক্ষা হয়। রাজনীতির ময়দানে স্বার্থ ছাড়া কোন পক্ষই সূচ পরিমাণ ছাড় দিতে রাজি নন। বিশেষ করে নিজেদের সমরাস্ত্র সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যাপারে কোন পক্ষই নিজেদের স্বার্থকে ভূলুন্ঠিত হতে দিতে চাইবেন না। ট্রাম্প ঝানু ব্যবসায়ী তাতে কোন সন্দেহ নেই। যত সমালোচনাই হোক নিজের দেশের ব্যবসায়িক স্বার্থকে তিনি সবার আগে স্থান দিতে চাইবেন, পুতিনের সাথে দর কষাকষির সেটাই তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য। গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী, ট্রাম্প-পুতিন বৈঠকে ২০২১ সালে শেষ হতে যাওয়া এই অস্ত্র চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে। তাতে কারোরই আপত্তি থাকার কথা নয়। বর্তমান বিশ্বের নিজেদের শাসন টিকিয়ে রাখতে ‘শ্যাম ও কুল দুই’ই রাখার চেষ্টা উভয় স¤্রাটের জন্যই জরুরী।

বিশ্ববাজারে তেলের মজুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঠিক পেছনেই রাশিয়া। রাশিয়ার মজুতে আছে ৮০ হাজার মিলিয়ন ব্যারেল কালো সোনা। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে দৈনিক ১০ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন ছিল রাশিয়ায়। ন্যাটোর সঙ্গে বিবাদ করে ট্রাম্প যদি এবার রাশিয়ার সঙ্গেই গাঁটছড়া বাঁধেন, তবে পেট্রো-ডলারের লাগাম থাকবে ট্রাম্প-পুতিন জোটের হাতেই। ফলে, ‘পুতিন একলা হয়ে যাবে’ এই স্বপ্ন যাঁরা দেখছেন তাঁদের আশার গুড়েবালি ছাড়া আর কিছু পাবার নেই। পুতিন ঝানু খেলোয়াড় এবং সংগঠক। বিশ্বকাপে ফুটবলারদের পায়ের জাদু থেকে ক্ষণিকের জন্য দৃষ্টি সরিয়ে গ্যালারিতে তাকালে দেখতে পাবেন বিশ্বনেতাদের পাশে বসিয়ে হাসিমুখে খেলা দেখছেন পুতিন! পাঁচ বছর একাকি থেকেও তিনি বিশ্বরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়েই আছেন। অন্ততঃ ২০১৬ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সেই কথা স্পষ্টভাবেই উঠে এসেছে। বিশ্ব রাজনীতি সব সময়ই টালমাটাল। অন্যদের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার মন্ত্র নিয়ে সকলেই পথ চলেন। সেখানে পুতিন বা ট্রাম্প উভয়ই এক। বাঘ নাকি সিংহ কে বেশি নিরাপদ- এই প্রশ্নটাই আসলে অবান্তর। বিশ্ব নেতাদের আদর্শ বস্তুত এক। তাঁরা চান উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও বজায় রাখতে। নিজেদের অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষায় তাঁরা নজর দিবেন নতুন খদ্দের ধরার দিকে। ছুটবেন উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকে। দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান দেশগুলো হবে তাঁদের টার্গেট। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের মত দেশগুলো তাই উভয়ের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আগামীতে কে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে, চীনের সাথে কে সফল বোঝাপড়া করতে সক্ষম হবে সেটাই আমাদের দেখার বিষয়।

বিশ্বকাপ ফুটবল শেষ হলো। নানা হিসাব নিকাষ উল্টিয়ে শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই একটা ভাল বিশ্বকাপ প্রত্যক্ষ করলাম। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল বলয়ের বাইরে শিরোপা জিতল ফ্রান্স আর নানাভাবে আলোচনায় শীর্ষে থাকল ক্রোয়েশিয়া। এই বিশ্বকাপে কোন দল সবচেয়ে ভাল খেলেছে বা কোন দল প্রকৃতপক্ষে সেরা সেই প্রশ্নটা এখন অপ্রয়োজনীয়। যে জিতেছে সেই সেরা। যারা ভাল খেলেছে তারাও অসাধারণ ও দুর্দান্ত! শুভেচ্ছা সকলের জন্যই। তবে ফ্রান্স প্রমাণ করেছে ‘স্লো বাট ষ্টিডি ক্যান উইন দ্য রেস’। আমরা যেন কথাটা মনে রাখি। আমাদেরও সফল হতে হবে। আমরাও ভাল করতে চাই। আগামীতে বিশ্বের কোন না কোন কাপে আমাদের সন্তানেরাও তাদের মেধার স্বাক্ষর রাখবে সেই প্রত্যাশা রাখছি। সরকারের উচিত হবে তরুণ সমাজের প্রতি মনোযোগ দেয়া, তাদের সহায়তা করা। আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। মাঠের মত রাজনীতিতেও ভাল খেলা যারা দেখাবে তাদেরই সবাই মনে রাখবে। শিরোপা জয়ের মত ক্ষমতা জয়ের লক্ষ্য হয়তো স্বাভাবিক কিন্তু তারও চেয়ে বেশি প্রয়োজন ভাল খেলার মত করে রাজনীতির মাঠেও নিজেদের শ্রেষ্ঠটাই তুলে ধরা। দখলবাজ, নিষ্ঠুর, স্বার্থপর একচোখা রাজনীতিকে সবাই অপছন্দ করে। সেখান থেকে দূরে থাকাটাই মঙ্গল।
লেখক: সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
-০১৭১১৫২৬৯৭৯