মহাস্থানগড়ের ঐতিহাসিক জিয়ৎকুন্ড জৌলুস হারাতে বসেছে

মহাস্থানগড়ের ঐতিহাসিক জিয়ৎকুন্ড জৌলুস হারাতে বসেছে

শিবগঞ্জ (বগুড়) প্রতিনিধি : বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের জিয়ৎকুন্ড একটি দর্শনীয় বিশারাকৃতির কুপ বা ইঁদারা। এটি সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে এর জৌলুস হারিয়ে যেতে বসেছে। জিয়ৎকুন্ডটি উন্মুক্ত থাকায় দর্শনার্থী,পর্যটক ও স্থানীয় জনসাধারণদের নিক্ষেপ করা ইট বালি-পাথর ও মাটিতে ভরে যেতে বসেছে কূপটি। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে কূপটি ভরাট হয়ে বন্ধ হয়ে যাবে। এতে করে এক সময় দর্শনার্থীরাও এটি দর্শনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। অথচ কথিত আছে এই জিয়ৎকুন্ডের পানি ব্যবহার করে পরশুরাম তার মৃত সৈনিকদের পুনর্জীবিত করতেন। এই টানে এখনও হাজারো মানুষ আসেন এ জিয়ৎকুন্ড দর্শন করতে।প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা জানান, ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে জিয়ৎকুন্ডটি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে উর্ধর্তন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন দুর্গনগরী মহাস্থানগড়ের রাজা পরশুরাম প্যালেসের পূর্ব দিকে জিয়ৎকুন্ডর অবস্থান। পরশুরামের প্যালেসের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ প্রায় দেড়শ’ ফুট জায়গা। এর পাশেই রয়েছে মূল সম্রাজ্যের প্রধান ফটক, যেটি বর্তমানে পশুরাম গেইট নামে পরিচিত। আর পূর্ব পাশে রয়েছে আলোচিত সেই জিয়ৎকুন্ড। প্রতিদিন দর্শনার্থীরা আসেন রাজা পরশুরামের প্যালেস দেখতে। দেখেন জিয়ৎকুন্ড। জিয়ৎকুন্ডের কাহিনী শুনে তারা অভিভূত হয়ে পড়েন। মহাস্থান জাদুঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত (কাস্টোডিয়ান) সহকারী পরিচালক মুজিবুর রহমান জিয়ৎকুন্ড প্রসঙ্গে জানান, জিয়ৎকুন্ডর উপরের ব্যাস ৩ দশমিক ৮৬ মিটার এবং নিচের দিকে ক্রমহ্রাসমান। একটি চতুস্কোণ গ্রানাইট পাথর কূপের পূর্ব ধারে স্থাপিত। খুব সম্ভবত পানি উত্তোলনের জন্য এটি নির্মিত। কূপ নির্মাণের প্রথম পর্যায়ে এটিকে ব্যবহার করা হতো। কূপটির তলদেশ পর্যন্ত দুই সারিতে আরও অনেকগুলো প্রস্তরখন্ড আংশিক বাইরে রেখে দেয়ালের সাথে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করা হয়েছে।

 তিনি বলেন, এটি  সাম্প্রতিক কালের তৈরি এবং খুব সম্ভবত পরশুরামের প্রাসাদের সমসাময়িক, অর্থাৎ ১৮শ’ থেকে ১৯ শ’ শতকের। সহকারী পরিচালক মুজিবুর রহমান আরও জানান, প্রবাদ আছে, শাহ সুলতান (বখলী) মাহীসওয়ারের সাথে যুদ্ধের সময় রাজা পরশুরাম এ কূপের জল ব্যবহার করে মৃত সৈনিকদের আবার পূণ:জীবিত করতে পারতেন। হযরত শাহ সুলতান বলখী মাহীসওযার (র.) বিষয়টি জানতে পেরে একটি চিলের সাহায্যে ওই কূপের মধ্যে এক টুকরো গরুর মাংস নিক্ষেপ করান। এতে করে ওই কূপের আলৌকিক ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে রাজা পরশুরাম যুদ্ধে পরাজিত হন। তবে তিনি এই প্রবাদ বাক্যের ঐতিহাসিক কোনো ভিত্তি নেই বলে দাবি করেন।

 বগুড়ার গাবতলী উপজেলার খোট্টাপাড়া গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম রোববার দুপুরে তার বিয়াইকে জিয়ৎকুন্ড দেখাতে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি বলেন, আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে বাবার হাত ধরে তিনি এই কূপটি দেখতে এসেছিলেন। তখন কূপটি অনেক গভীর ছিল। নিচের দিকে তাকালে ভয়ে গা শিউরে উঠত। আর এখন ইট-পাথর নিক্ষেপে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, এখন অনেকেই কূপের ভিতরে নেমে পড়েন। তিনি কূপটি সংরক্ষণের দাবি জানান। প্রতœতত্ত্ব বিভাগের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা জানান, ইতিহাসের অংশ এ জিয়ৎকুন্ড। এর প্রতœগুরুত্ব অপরিসীম। এটিকে অবশ্যই সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেয়া হবে।