মহানবীর মহাভ্রমণ

মহানবীর মহাভ্রমণ

মোহাম্মাদ আব্দুল আজিজ : পবিত্র কুরআন হাদীস, ইতিহাস, যুক্তি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে বিশ্ব নবীর মিরাজ অভ্রান্ত সত্য তাতে একবিন্দু মাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। নবুয়তের দশম বছর ২৭শে রজব তারিখে মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল। আমরা রজব মাসের ২৭ তারিখের রাতকে শবে মিরাজ বা মিরাজের রাত বলে থাকি। আমাদের সমাজে ২৭শে রজব মিরাজের রাত বলেই প্রসিদ্ধ। সে হিসাবেই আমাদের দেশের মুসলিমগণ এদিন উদযাপন করে থাকেন। সরকারি-বেসরকারি, আধাসরকারি, অফিস-আদালত সহ স্কুল-কলেজ মাদরাসা সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ওই দিন বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসায় মিরাজ সম্পর্কে আলোচনা, মিলাদ দু’আ ইত্যাদি পাঠ করা হয়। ইসলামের ইতিহাস তথা রাসূলের জীবন চরিত পাঠ করলে জানা যায় যে, আবু তালিবের মৃত্যুর কয়েক দিন পর উম্মুল মুমিনিন খাদীজাতুল কুবরার মৃত্যুতে পূর্বের চেয়েও অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে উঠে। কাফেরদের কুটকৌশল ও ষড়যন্ত্রের মাত্রাও বৃদ্ধি পায়। নিরুপায় হয়ে নবীজি তখন মক্কা হতে প্রায় ৬০ (ষাট) মাইল পূর্বে অবস্থিত তায়েফে পায়ে হেঁটে তাঁর মুক্ত করা ক্রীতদাস যায়েদ বিন হারেসা (রা.)কে সাথে নিয়ে যান। সেখানে দশ দিন অবস্থান করেন।

 তায়েফের সকল নেতৃস্থানীয় লোকের কাছে যান এবং তাদের সাথে কথা বলেন কিন্তু সবাইর একই জবাব, তুমি আমাদের শহর থেকে বের হয়ে যাও। তারা তাঁর বিরুদ্ধে উচ্ছৃঙ্খল বালকদেরকে উসকে দেয়। তারা তাঁকে গালি দিত, পিছে পিছে চলতো আর হাততালি দিত এমনকি নবীজির দিকে পাথর ছুড়ে মেরে রক্তাক্ত করে ফেলছিল। এক সময় তিনি রবিয়ার দুই ছেলে ওতবা ও শায়বার বাগানে আশ্রয় নেন। এ বাগান তায়েফ হতে তিন মাইল দূরে ছিল। বাগানের মালিকরা তাঁকে কিছু খাবার দিলে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে আংগুর খেতে শুরু করেন। বিস্তারিত ঘটনা বুখারী শরীফে আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত রয়েছে। তায়েফ থেকে ফিরে এসে যখন দাওয়াত ও তাবলীগের সাফল্য অত্যাচার নির্যাতনের মাঝামাঝি পর্যায় অতিক্রম করে চলছিল ঠিক এ সময়ে মিরাজের ঘটনা ঘটে। আরব বিশ্বের বিভিন্ন গোত্রে বিভিন্ন সমাজে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে গেছে। মুসলমানদের উপর মক্কার কোরেশ নেতারা অত্যাচার করতে করতে মুসলিম সমাজ অতিষ্ঠ হয়ে গেছে কিন্তু আল্লাহর নবী এখন অধৈর্য্য হননি।

 একদা খাব্বাব ইবনু আরাত (রা.) নবীর নিকট এসে দেখেন তিনি কাবা ঘরের ছায়ায় একখানা চাদরকে বালিশ বানিয়ে শুয়ে আছেন। খাব্বাব বলেন সে সময় আমরা মুশরিকদের হাতে লাঞ্ছিত হচ্ছিলাম। আমি বললাম হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আল্লাহর কাছে দু’আ করছেন না কেন? একথা শুনে তিনি উঠে বসেন, তাঁর চেহারা লাল হয়ে উঠল। তিনি বললেন, তোমাদের পূর্ববর্তী মুসলিমগণ এরূপ হয়েছিল যে, তাদের গোশত এবং ধমনীসমূহ লোহার চিরুনি দিয়ে আঁচড়ানো হত, দেহে থাকতো শুধু হাড়। তাতেও তাদেক আল্লাহর দ্বীন থেকে সরিয়ে নিতে পারেনি। আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে পূর্ণতা দান করবেন। এমনকি একজন ঘোড়ার পিঠে চড়ে সানআ থেকে হাদরামাউত পর্যন্ত সফর করবে এ সময় আল্লাহর ভয় ছাড়া কোন ভয় থাকবে না। তবে হ্যাঁ বকরীর জন্য বাঘের ভয় থাকবে। বুখারী বিশুদ্ধ মতে হিজরতের এক বছর নয় মাস পূর্বে মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল। আসাহহুস সিয়ার।

সঠিক বর্ণনা অনুসারে নবী করিম (সা.) সশরীরে মক্কা শরীফের হারাম শরীফ হতে বায়তুল মোকাদ্দাস হয়ে ১ম, ২য়, ৩য়, ৪র্থ, ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম আসমান পার হয়ে আসমান জগতের চূড়ান্ত বর্ডার যেখানে বরই গাছ শেষ সীমানা হয়ে মহান আল্লাহর অতি নিকটে পৌঁছেন। উম্মতের জন্য নিয়ে আসেন ৫ ওয়াক্ত ছালাত। ফেরার পথে আওয়াজ শুনতে পান, আমি আমার ফরজ চালু করে দিয়েছি এবং আমার বান্দাদের জন্য কমিয়ে দিয়েছি। যাদুল মায়াদ ২য় খন্ড। জান্নাত, জাহান্নাম দেখেন। অবস্থানকারীদের অবস্থা অবলোকন করেন। মোট কথা মহান আল্লাহর, নিদর্শন সরাসরি প্রত্যক্ষ করায় আইনুল ইয়াকীন তথা স্বপক্ষে দেখার অবস্থানগত মর্যাদা এমন হলো, যা অনুমান করে বলা সম্ভব নয়। মক্কী জীবন শেষ পর্যায়ে এসে যখন দাওয়াতের কাজ চরমভাবে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছিল ঠিক সেই সময়ে মিরাজের পর পরেই মদীনা হতে হজ্জের মৌসুমে লোকজন মক্কায় এসে মিনা বাজারের আকাবা উপত্যকায় মুসলমান হয়ে নবীকে মদীনায় নিয়ে যাওয়ার কথা ব্যক্ত করেন। মিরাজের শিক্ষা হতেই নবী হিজরতের বিষয় উপলব্ধি করেছিলেন।

 মিরাজের পরবর্তী সুরা বনি ইসরাইল পাঠ করলে মুশরিকদেক সুস্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দেয়া হয়েছে মর্মে জানা যায়। দেখুন সুরা বনি ইসরাইল আয়াত নং ১৬। এজন্য মিরাজের পরবর্তী কুরআনের কি বিষয় নাজিল হয়েছিল তা আমাদেরক জানতে হবে। শুধু শবে মিরাজ পালন করলেই দায়িত্ব শেষ নয় বরং শবে মিরাজে কি আদেশ দেয়া হয়েছিল তা আমরা কতদূর বাস্তবায়িত করাই তা ভেবে দেখতে হবে। আমরা সবাই জানি ৫০ ওয়াক্ত সালাত প্রথমে ফরয করা হয়েছিল তারপর ৪ বারে ১০ ওয়াক্ত করে কম করে ৫ম বারে ৫ ওয়াক্ত কমিয়ে মাত্র ৫ ওয়াক্ত রেখে দিয়ে বলা হয়েছিল যে, ৫ ওয়াক্ত সালাত সঠিকভাবে আদায় করলে ৫০ ওয়াক্তের সমান সওয়াব দেওয়া হবে। মিরাজে যা ফরয করা হলো তা বাদ দিয়ে যদি শুধু শবে মিরাজ পালন করেই মনে করলাম যে, বিরাট কিছু অর্জন করলাম এটা ভুল হবে। এজন্য সাহাবীগণ এমনকি আল্লাহর নবী আমাদের মত শুধু শবে মিরাজ উদযাপন করেন নি বরং মিরাজের রাতে আল্লাহর কি আদেশ এবং পরবর্তীতে কুরআনের কি নির্দেশ তা পালন করে গেছেন। আমরা ২৭ শে রজবে মিরাজের কিচ্ছা বললাম আর কিচ্ছা শুনলাম কিন্তু ৫ ওয়াক্ত নামাজ যা মিরাজ ফরয করা হয়েছিল তা আদায় করলাম না তাহলে বুঝতে হবে যে, আমরা মিরাজের গুরুত্বই বুঝিনি। অথচ সাহাবারা নামাজ পড়া আর না পড়াকে মুসলমান এবং কাফের হিসাবে মনে করতেন। আসুন আমরা রজব মাসে তওবা করে ফিরে আসি আল্লাহর দিকে। নিজের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হই। ৫ ওয়াক্ত নামাজ সঠিকভাবে আদায় করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করি এবং মিরাজের পরবর্তী কুরআনের নির্দেশ মেনে চলি তাতেই আমাদের কল্যাণ হবে। মহান আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন। আমিন।
লেখক ঃ খতীব, উপশহর মসজিদ, বগুড়া।
মুহাদ্দিস, উম্মুল কুরা কওমি মাদ্রাসা, বগুড়া।
০১৭১২-৫১৪৪৭৮