বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্র্র ঘাটতি পূরণে প্রতি বছর ২২০০ কোটি টাকার মসলা আমদানি

মসলার নতুন জাত উদ্ভাবন হলেও এর প্রসার ঘটছে না

মসলার নতুন জাত উদ্ভাবন  হলেও এর প্রসার ঘটছে না

তৌহিদুর রহমান মানিক, শিবগঞ্জ (বগুড়া) : বগুড়ায় মসলা গবেষণা কেন্দ্রের সাফল্য সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার অভাবে এর প্রসার ঘটছে না। সুফল বার্তা পৌঁছে না মাঠ পর্যায়ের চাষিদের মাঝে। অথচ গত এক দশকে এই গবেষণা কেন্দ্রে ২৪ জাতের মসলা উদ্ভাবন করা হয়েছে। তবুও চাহিদা মোতাবেক মসলার ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। আর এ জন্য দেশে প্রতি বছর ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার মসলা আমদানি করতে হচ্ছে। অথচ দেশের মাটিতেই বিভিন্ন মসলা উৎপাদন করা সম্ভব। বগুড়ায় অবস্থিত মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞরা এমন মন্তব্য করেছেন। বিশেষজ্ঞরা এও করেছেন, এখন দেশের মাটিতেই মসলা উৎপাদনের জন্য গবেষণা চলছে। এতে ভাল ফলও মিলেছে।
মসলা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শহীদুল আলম বলেন, তারা সব ধরনের মসলার ওপর গবেষণা চলাচ্ছেন। গবেষণার জন্য আবহাওয়া ও মাটির গঠন ভেদে এই কেন্দ্রের আওতায় খাগড়াছড়ি, কুমিল্লা, মাগুরা, জৈন্তাপুর (সিলেট), লালমনিরহাট, ফরিদপুর, জয়দেবপুরে উপকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো কোন অঞ্চলের মাটিতে কি ধরনের মসলা উৎপাদন করা     সম্ভব তার গবেষণা করা। বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, এ পর্যন্ত তাদের সফলতা হলো ১৩টি জাতের মসলা গবেষণা করে তারা ২৪ ধরনের জাত উদ্ভাবন করেছেন। বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে এই মসলাগুলো চাষ করতে হবে।
উদ্ভাবিত জাতের মধ্যে রয়েছে পেঁয়াজের ৫টি, হলুদের ৫টি, মরিচের ৩টি, আদার ১টি, রসুনের ২টি, ধনের ১টি, মেথির ২টি, কালি জিরার ১টি, গুলমরিচের ১টি, আলু বোখারার ১টি, বিলাতি ধনের ১টি, পাতা পেঁয়াজের ১টি (শুধু পাতা ব্যবহার হয়)। উদ্ভাবিত এই জাতগুলো গবেষণায় মাঠে সফলতা পাওয়া গেছে। সেটি কৃষকদের ব্যবহারের জন্য বিএডিসির কাছে দেয়া হয়েছে। তারা তাদের বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে কৃষকের কাছে সেগুলো বিক্রি করেন। এছাড়া নির্ধারিত মূল্যে যে কোনো কৃষক গবেষণা কেন্দ্র থেকেও বীজ সংগ্রহ করতে পারবে।
গবেষণাগারের বিজ্ঞানীদের দেয়া তথ্য মতে, মসলা গবেষণা কেন্দ্রের জন্ম ১৯৯৫ সালের নভেম্বর মাসে। ১৯৯৬ সালের মে মাসে মাত্র ৯ জন বিজ্ঞানীর যোগদানের মধ্যদিয়ে কাগজে কলমে কার্যক্রম শুরু হলেও এর গবেষণা কার্যক্রম শুরু হতে সময় লাগে আরও প্রায় দুই বছর। পরবর্তী সময়ে ৭০ একর জায়গা নিয়ে প্রাচীন বাংলার রাজধানী বলে খ্যাত ঐতিহাসিক মহাস্থানগড় এলাকায় সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে নির্মাণ করা হয় মসলা গবেষণা কেন্দ্র।
কৃষি বিভাগের সূত্র মতে, দেশে রসুনের চাহিদা বছরে সাড়ে চার লাখ টন হলেও প্রায় ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় মাত্র সাড়ে তিন লাখ টন। বাকি প্রায় এক লাখ টন রসুন আমদানিতে ব্যয় হয় (গড়ে ৫০ টাকা কেজি) প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।
এছাড়াও বছরে দেড় লাখ টন আদার চাহিদা (বীজসহ) হলেও প্রায় সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর জমিতে (হেক্টর প্রতি সাড়ে আট টন) উৎপাদন হয় প্রায় ৬০ হাজার টন। বাকি প্রায় ৯০ হাজার টন আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে (গড়ে ৮০ টাকা কেজি) প্রায় ৭২০ কোটি টাকা। হলুদের চাহিদা বছরে প্রায় সোয়া দুই লাখ টন (বীজসহ) হলেও দেশের প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে (প্রতি হেক্টরে ১৮ টন) উৎপাদন হয় প্রায় ৯০ লাখ টন। বাকি প্রায় সোয়া এক টন আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে (গড়ে ৫০ টাকা কেজি) প্রায় ৬২৫ কোটি টাকা।
মরিচের চাহিদা বছরে প্রায় দুই লাখ টন (বীজসহ) হলেও দেশের প্রায় এক লাখ ২৭ হাজার হেক্টর জমিতে (প্রতি হেক্টরে দেড় টন) উৎপাদন হয় প্রায় এক লাখ ৫৫ হাজার টন। অবশিষ্ট প্রায় ৪৫ হাজার টন আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে (গড়ে ৭৫ টাকা কেজি) প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা।
মসলা গবেষণা কেন্দ্রের সূত্র জানায়, হলুদের ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ পাঁচ বছর গবেষণার মাধ্যমে বারি-১,২,৩,৪,৫ জাতের উচ্চ ফলনশীল হলুদ উদ্ভাবন করেছেন। বারি হলুদ প্রতি হেক্টরে ফলন ২৫ থেকে ৩০ মেট্রিক টন। পাশাপশি মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা বারি মেথি-১,২ নামে উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছেন। মেথির উদ্ভাবিত এই জাত পুষ্টি উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। গবেষণাগারের একটি পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, মসলার উৎপাদন কোনো বছর বাড়ছে, আবার কোনো বছর কমছে। জমি কমলেও বাড়ছে মসলার চাহিদা। কিন্তু উৎপাদন কম, লাভ বেশি। যেমনÑ আদা চাষে একর প্রতি খরচ হয় মাত্র ১৮ হাজার টাকা। ফলন হয় প্রায় ৬ মে. টন। এ থেকে মোট আয় হয় ৮০ টাকা কেজি হিসেবে প্রায় ৪৮ হাজার টাকা।
হলুদ চাষে একর প্রতি খরচ হয়  প্রায় ১৩ হাজার টাকা। ফলন হয় প্রায় ১২ টন। শুকানোর পর হয় ৩ টন। প্রতি কেজি ২০০ টাকা হিসেবে ৬ লাখ টাকা আয় হয়।
বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কলিম উদ্দিন বলেন, গাছের ছায়ায়ও আদা ও হলুদ চাষ করা যায়। সার সেচসহ উৎপাদন খরচ কম। পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়া, মরিচ ইত্যাদি ফসলেও উৎপাদন খরচ কম, লাভ বেশি।
তিনি আরও জানান, উৎপাদন বাড়াতে হলে অধিক লাভজনক এটা প্রচার, সম্প্রসারণ ও প্রদর্শনী প্লট করে প্রমাণ করতে হবে। আবহাওয়া উপযোগী জাত উদ্ভাবন করার পর বীজ সরবরাহ ও সহজলভ্য করতে হবে, মসলা ফসল সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব করা গেলে কৃষক মসলা চাষে আরও আগ্রহী হয়ে উঠবে।