বাজেট বাড়লেও নিধন হচ্ছে না মশা

মশার উপদ্রবে চিকুনগুনিয়া আতঙ্কে রাজধানীবাসী

মশার উপদ্রবে চিকুনগুনিয়া আতঙ্কে রাজধানীবাসী

স্টাফ রিপোর্টার : শীতের প্রকোপ কমার পর থেকেই মশার উপদ্রব বেড়েছে রাজধানীতে। মশার উপদ্রবে বাসাবাড়িসহ কর্মস্থলে অবস্থান করাটা এক প্রকার অত্যাচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই অতিরিক্ত মশার কারণে আবারও চিকুনগুনিয়ার আশঙ্কায় রয়েছে নগরবাসী। বাসায় মশারি টাঙিয়ে বা কয়েল জ্বালিয়ে কিছুটা সুবিধা করা গেলেও কর্মস্থলে বসে চরম বিপাকের সম্মুখীন হতে হচ্ছে রাজধানীবাসীকে। বৃহস্পতিবার ধানমন্ডি এলাকায় ঘুরে জানা গেছে, এই এলাকায় মশার সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল ধানমন্ডি লেক। লেকের পাড়ে ময়লা-আবর্জনার স্তূপে ভর্তি। এ কারণে লেকের আশপাশে যাদের বাস তারা মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ। ধানমন্ডির জিগাতলার বাসিন্দা আকবর আলী জানান, ঢাকায় শীত শেষে গরম নামে অনেক দ্রুত। আর গরমে দরজা-জানালা খুলে রাখা হয়। কিন্তু দরজা-জানালা খোলা রাখলেই মশার কারণে বাসায় অবস্থান করা কষ্টকর হয়ে যায়। দিনের যে সময়ই হোক মশার জন্য কয়েল জ্বালিয়ে আবার সন্ধ্যার পর মশারি টাঙিয়ে বসে থাকতে হয়। ছেলেমেয়েরা এখন পড়াশোনা করে খাটে মশারির ভেতরে। আর সিটি কর্পোরেশনের মশার ওষুধে কোনো কাজ হয় না। মশার উপদ্রব থেকে বাঁচতে দরকার এর উৎপত্তিস্থল নষ্ট করা।

ধানমন্ডি ২৭ নম্বর এলাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাফিজ উদ্দীন বলেন, বাসায় কয়েল জ্বালালেও মশার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায় না। আর এদিকে অফিসে এসির মধ্যে তো কয়েল জ্বালানো যায় না। আবার কাজেও ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই মশা এখানে শান্তিতেই তাদের কাজ চালাতে পারে! অ্যারোসলেও কাজ হয় না। আবার চিকুনগুনিয়া হয়ে যায় কিনা এই আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছি। এদিকে সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের মতামত, ধানমন্ডি লেকে আসা দর্শনার্থীদের জন্যই লেক দূষিত হচ্ছে এবং মশার আদর্শ জন্মস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) ১৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাকির হোসেন স্বপন  জানান, লেকটাকে সবাই ময়লার স্তূপ হিসেবে ব্যবহার করে। জনগণ সচেতন না হলে এই সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়। আমরা নিয়ম করে মশার ওষুধ ছিটিয়ে যাচ্ছি। লেকও পরিষ্কার করছি।

 কিন্তু তাতেও লাভ হচ্ছে না। আর লেকের সব জায়গায় জনসচেতনতামূলক সাইনবোর্ড ও ব্যানার আমরা কম ব্যবহার করছি। কেননা তাতে করে এই বিনোদন কেন্দ্রটির পরিবেশ নষ্ট হবে। ধানমন্ডির বিভিন্ন এলাকার ময়লার ডাস্টবিনগুলোর অবস্থাও খুব করুণ। যে এলাকায় ডাস্টবিন রয়েছে তার অনেক দূর থেকেই ময়লার গন্ধ পাওয়া যায়। প্রতিদিনের ময়লা প্রতিদিন নেওয়া হয় না। আর এ কারণেই দুর্গন্ধ ও মশার বংশবৃদ্ধির স্থান সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী। ময়লা প্রতিদিন সরিয়ে নেওয়া হয় জানিয়ে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. শফিকুল আলম বলেন, ময়লা মানুষ রাতে বা সকালে ফেলে। আমরা দিনে রাস্তার পাশে থাকা কন্টেইনারগুলো একবার পরিষ্কার করে ফেলি। এই সময়ের মধ্যেই দেখা যায় দূর্গন্ধের সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে আমাদের কড়া নজরদারি রয়েছে।


বাজেট বাড়লেও নিধন হচ্ছে না মশা
রাজধানীর পশ্চিম নাখালপাড়া পানির পাম্প এলাকার বাসিন্দা ফাতেমা বেগম (৪৫)। গত কয়েকদিনে মশার কামড়ে তার দুই হাতের কনুই থেকে কব্জি পর্যন্ত ঘা হয়ে গেছে। মশার যন্ত্রণায় দিনেও কয়েল জ্বালাতে হয়। তবুও নিস্তার নেই এ এলাকার বাসিন্দাদের। নিজের হাতের অবস্থা দেখিয়ে ফাতেমা বেগম বলেন, মশার যন্ত্রণায় টেকা দায়। রাতে মশারি টাঙালেও মানায় না। সিটি করপোরেশন থেকে লোক এসে গত ১৪/১৫ দিন আগে স্প্রে করে গেছে। কিন্তু ওই স্প্রেতে খালি কেরোসিনের গন্ধ, ওষুধ দেয় না। যেদিন স্প্রে করে তার পরেরদিন থেকে আবার মশার যন্ত্রণা বাড়তে থাকে। আবার যিনি স্প্রে করতে আসেন তাকে টাকা না দিলে স্প্রে করেন না। নাখালপাড়ার এই বাড়িতে ৪৫ ঘর মানুষের বাস। প্রতিবার ওষুধ দিতে এলে সিটি করপোরেশনের ওই কর্মীকে প্রত্যেকেই ২-২০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। বাড়ির ম্যানেজার এই টাকা তুলে ওই কর্মীকে দিলে তবেই বাড়ির ভিতরে স্প্রে করেন তিনি। এদিকে গত কয়েকদিনে ফাতেমা বেগমের মতো পুরো রাজধানীবাসী দিশেহারা মশার উৎপাতে।

সাধারণত বর্ষাকালে মশার প্রজনন মৌসুমে উৎপাত বেশি থাকে। কিন্তু এবছর শীত শেষ না হতেই মশার দাপটে দিশেহারা মানুষ। নাখালপাড়া রেলগেটের ভাঙাড়ি শ্রমিক আব্দুল বারেক  বলেন, এটা মশার এলাকা। রাতে মশা মনে হয় যুদ্ধ ঘোষণা করে। বিকেল থেকেই কয়েল জ্বালাতে হয়। এদিকে নাখালপাড়া রেল লাইনের গা ঘেঁষে যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে রেখেছেন এলাকাবাসী। একইসঙ্গে পাগলারমোড় এলাকায় ভাঙাড়ির দোকানে বিভিন্ন ধরনের ভাঙা জিনিসপত্র এনে স্তূপ করা হয়েছে। এছাড়া নাখালপাড়া খালের দু’ধারে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ও ময়লা আবর্জনা ফেলা হয়। এতে এসব এলাকা মশার প্রজনন কেন্দ্র ও আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। অপরদিকে সিটি করপোরেশন থেকে প্রতিবছর বাজেটে মশা নিধনের জন্য বড় ধরনের বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। তবে কোনো বছর তা খরচ করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। অথচ মশাও নিধন হচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মশক নিধনের জন্য ব্যয় ধরা হয় ১৪ কোটি টাকা। কিন্তু সারা বছর ধরে এই বাজেটের ১১.৯৫ কোটি ব্যয় করে সিটি করপোরেশন। একইভাবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মশক নিয়ন্ত্রণে বাজেট ধরা হয় ২৩ দশমিক ২৫ কোটি টাকা। কিন্তু ওই বছরও পুরো টাকা ব্যয় করতে পারেনি তারা। সেবছর ব্যয় হয় মাত্র ১৬ দশমিক ৮৫ কোটি টাকা। পরে চলতি অর্থবছরে (২০১৭-১৮) মশক নিধনে বাজেট কিছুটা কমিয়ে ২০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।

ক্ষোভ প্রকাশ করে গাড়ি চালক আনোয়ার  বলেন, খালি বাজেট বাড়লেই কি মশা মরবে? মশা মারার জন্য টাকার ব্যবহার করতে হবে। স্প্রে মেশিনে কোরোসিন ভরে ধোঁয়া ছিঁটালেই হবে না। সার্বিক বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাকির হাসান  বলেন, সিটি করপোরেশনের কর্মীরা টাকা নেয় এমন অভিযোগ আমাদের কাছে নেই। অভিযোগ পেলে তাকে বহিষ্কার করা হবে। আর মশা নিধনে আমাদের নিয়মিত কার্যক্রম চালু রয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারিথেকে বিভিন্ন এলাকায় রুটিন স্প্রে চালু হয়েছে, যা আগামী ১২ মার্চ পর্যন্ত চলবে। বাজেটের বিষয়ে তিনি বলেন, বাজেট আনুমানিক ধরা হয়। আমরা পর্যাপ্ত ওষুধ, মেশিন কিনেছি, নিয়মিত ছিঁটানোও হচ্ছে। তবে মানুষ সচেতন না হলে মশা কমবে না। আমরা স্প্রে করে এলাম, কিন্তু মানুষ যদি যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা বন্ধ না করে তাহলে মশা কমবে না।