মধ্যপ্রাচ্যে প্রভূত্ব ও আধিপত্য বিস্তারে শীতল যুদ্ধ

মধ্যপ্রাচ্যে প্রভূত্ব ও আধিপত্য বিস্তারে শীতল যুদ্ধ

 রায়হান আহমেদ তপাদার : ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত অবস্থানের কারণে বিশ্বের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইস্টার্ন ওয়ার্ল্ড এবং ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডের প্রায় মধ্যস্থলে অবস্থিত এই অঞ্চলটির বিস্তৃতি এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপ- এ তিনটি মহাদেশ জুড়ে। বহুবিস্তৃত মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মোট রাষ্ট্রের সংখ্যা ১৭টি এবং জনসংখ্যা প্রায় ৪১১ মিলিয়ন। এর মোট আয়তন প্রায় ২৭৮২৮৬০ বর্গমাইল। পাঁচটি মহাসাগর-ভূমধ্যসাগর, লোহিত সাগর, আরব সাগর ও ডেড সি’র তীরে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল বিশ্বের নৌ যোগাযোগের চারটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী অর্থাৎ বসফরাস প্রণালী, দার্দানেলিস প্রণালী, বাবেল মানডেব প্রণালী ও হরমুজ প্রণালীর ওপর আধিপত্য স্থাপন করায় এ অঞ্চলটির গুরুত্ব সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য। তাই এ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যতা দৃষ্টি কেড়েছে পুরো বিশ্ব সম্প্রদায়ের। তেল আর প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য যুগে যুগে বৃহৎ ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো তাই মধ্যপ্রাচ্যে প্রভূত্ব ও আধিপত্য বিস্তারের জন্য শীতল যুদ্ধে জড়িয়েছে বা কখনো আবার সরাসরি সশস্ত্র সংঘাতে বা যুদ্ধে জড়িয়েছে এবং কখনো কখনো প্রক্সিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী ওপেক ভূক্ত দেশগুলোর দৈনিক তেল উৎপাদনের ক্ষমতা প্রায় ২৩.২ মিলিয়ন ব্যারেল। এর মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো উৎপাদন করে সর্বাধিক ১৪.২ বিলিয়ন ব্যারেল। পরিসংখ্যান মতে, বিশ্বের মোট মজুত তেলের ৬২% শতাংশই মজুত রয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোতে।
কাজেই তেলের ওপর আধিপত্য স্থাপনজনিত কারণেও এ অঞ্চল উত্তপ্ত রয়েছে বছরের পর বছর ধরে। একাধিক কারণেই মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল এতো সংঘাত ও যুদ্ধপ্রবণ অঞ্চল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়কালে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অপরিকল্পিত বিভক্তি, প্যালেস্টাইনী ভূখন্ডে মুসলমানদের বুকের ওপর অগ্রহণযোগ্য একটি ইহুদি রাষ্ট্র অর্থাৎ ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করা, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের অবস্থান ও এর প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি বিদেশী আগ্রাসী শক্তিগুলোর লোলুপ দৃষ্টি ঐ অঞ্চলের জনগণ ও রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ধর্মীয় অর্থাৎ শিয়া-সুন্নী বিভাজন ও সংঘাত এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা ইত্যাদি কারণের পাশাপাশি রাষ্ট্র ক্ষমতা নিয়ে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা ও সংঘাত উল্লেখযোগ্য প্রতিপাদ্য বিষয় এবং এসবের কোনো না কোনো কারণের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে অব্যাহতভাবে যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ ও সংঘাত লেগেই আছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন আকস্মিক ও অব্যাখ্যাতভাবে তেহরানের বিরুদ্ধে অব্যাহত শক্তি ব্যবহার করার যে হুমকি দিয়েছেন, তার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা এক নতুন উচ্চতায় উঠেছে। কিন্তু এর প্রভাব শুধু এই দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রাণঘাতী বিষের মতো, তাদের পারস্পরিক শত্রুতার প্রভাব ইতিমধ্যেই অস্থিতিশীল হয়ে পড়া মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। জন বোল্টন ইরানকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো সুস্পষ্ট কারণ উল্লেখ করেননি, তবে জন বোল্টন ইরান এবং বিশেষ করে ইরানের রাষ্ট্রবহির্ভূত মিত্রগোষ্ঠী ও ভাড়াটে বাহিনীগুলোকে একমাত্র উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গোষ্ঠীগুলো সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন এবং গাজাসহ বেশ কয়েকটি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে গভীরভাবে জড়িত এবং এরা যেকোনো সময় হামলা চালাতে পারে। বোল্টন বলেছেন, বেশ কিছু সমস্যা, উসকানিমূলক আচরণ ও হুমকির পাল্টা জবাব হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরান সরকারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায় না, তবে আমরা যেকোনো হামলা মোকাবিলার জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত, হোক সেটা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের বা ইরানের নিয়মিত বাহিনীর হামলা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘ইরান এখন হামলার মেজাজে রয়েছে। যেকোনো সময় এই হামলা হতে পারে। যদি তারা তৃতীয় পক্ষ যেমন মিলিশিয়া গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মাধ্যমে হামলা চালায়, তাহলে আমরা তার জন্য সরাসরি ইরানের নেতৃত্বকে দায়ী করব।’ তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের হামলার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছে।জন বোল্টন এবং মাইক পম্পেও হয়তো এটা ভেবে চিন্তিত যে ইরান তার বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কঠোর করার প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর জন্য গাজাকে ব্যবহার করছে বা অন্য কোথাও বড় কোনো পরিকল্পনা করছে। সিরিয়ায় অব্যাহত সংঘাত ইরানকে হুমকি দেওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হতে পারে। সিরিয়ায় চলমান দ্বন্দ্বের জন্য ওয়াশিংটন রাশিয়ার চেয়ে ইরানকে দায়ী করছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর সিরিয়ায় ঘাঁটি তৈরি করেছে এবং মস্কো সমর্থিত বাশার আল-আসাদের শাসনের প্রতি অনুগত শিয়া মিলিশিয়া বাহিনীকে সমর্থন দিচ্ছে।
এমনকি বিভিন্ন দাতা সংস্থার সাহায্যকর্মিদের মতে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হামা ও ইদলিব শহরে ব্যাপক বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এমনকি বেশ কয়েকটি হাসপাতালেও হামলা চালানো হয়েছে। এতে বহু মানুষ হতাহত হয়েছে এবং বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই হামলা আসাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ইদলিব শহর পুনরুদ্ধারের চেষ্টা কি না তা স্পষ্ট নয়, যা সিরিয়ার বিদ্রোহীরা সর্বশেষ দখল করেছে। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন গত সপ্তাহে এ সম্ভাবনার কথা অস্বীকার করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, নতুন আক্রমণ সম্ভবত ইরানের নেতৃত্বে কোনো স্থলবাহিনী চালাবে। পুতিনকে সমালোচনা করার ব্যাপারে অনিচ্ছুক ট্রাম্প সিরিয়ার সহিংসতার জন্য ইরানকেই দায়ী করেন এবং এ জন্যই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই হুমকি। ওয়াশিংটনের হতাশা ইরানকে হুমকি দেওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের নীতিগুলো সবখানে অব্যাহতভাবে ব্যর্থ হওয়ার কারণে ওয়াশিংটনের এই হতাশা। ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের বোমা হামলা কেবল বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষতি করতে এবং আন্তর্জাতিক নিন্দা অর্জনের ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটরা সৌদি যুদ্ধাপরাধীদের সহায়তা ও সহযোগিতা করার জন্য ট্রাম্পকে অভিযুক্ত করেছে। তারা এখন সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করে দিতে চায়। ইরাকে অবশিষ্ট মার্কিন সেনার উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ইরাকের ক্ষমতাসীন শিয়া রাজনীতিকদের বেশির ভাগ স্পষ্ট করেছে যে তারা তাদের দেশকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে দিতে চায় না।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও জোর দিয়ে বলেছেন, আগামী ২ মের পর যেসব দেশ ইরান থেকে তেল কিনবে, তাদের শাস্তি পেতে হবে। তবে কীভাবে সাজা দেয়া হবে, তা উল্লেখ করা হয়নি। তিনি বলেন, আমরা পরিষ্কার করে বলছি-যদি আপনি এ নীতি অমান্য করেন, তবে নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হবে। আমরা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাব।
এ ছাড়া গ্রিস, ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানও ইরান থেকে তেল ক্রয় কমিয়ে দিয়েছে। আর দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনায় বসবেন। সর্বশেষ সময়সীমা নিয়ে সর্বোচ্চ কাজ করার চেষ্টা করবেন। ইরান থেকে তেল কেনা হলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার পর রাতের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে। ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় দেশগুলো তেহরানের সঙ্গে জাতিসংঘের অনুমোদিত ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিকে সমর্থন করে চলছে, যে চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র গত বছর বেরিয়ে যায়, যখন কিনা ইরান জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থার দেওয়া সব শর্ত মেনে চলছিল। বিশ্বশক্তির সঙ্গে করা পারমাণবিক চুক্তির সুবাদে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে যে যে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিল, গত নভেম্বরে সেগুলো পুনর্বহাল করে যুক্তরাষ্ট্র। জাহাজ নির্মাণ, বাণিজ্য, ব্যাংক, জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা আবার কার্যকর হয়। এই খাতগুলো ইরানের অন্যতম অর্থনৈতিক ভিত্তি। ওয়াশিংটনের এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় কেবল ইরানই ছিল না, যারা এই দেশের সঙ্গে ব্যবসা করবে কিংবা তেল কিনবে, তাদের ওপরও মার্কিন প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। তবে ভারত, ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, চীনকে ছয় মাস নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়। পরে তুরস্কও ইরানি তেল কেনার ক্ষেত্রে এ ছাড় চায়। তবে এখন আর সময় বাড়াচ্ছেন না ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র এক মে থেকে ইরানের কাছ থেকে আর কোনো তেল কেনা যাবে না বলে ঘোষণা করেছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে চীন, তুরস্ক, ভারত ও ইরান থেকে তেল কেনার ব্যাপারে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করবে। চীন গত মাসে ইরানের সঙ্গে বৈধ সহযোগিতার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ না করার জন্য অনুরোধ করেছে। এখন ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই হুমকি আদৌ ইরানকে কোনো ধরনের হামলা থেকে বিরত রাখবে কি না- সেটাই দেখার বিষয়।
লেখক ঃ কলামিস্ট
[email protected]