মঙ্গলময় নতুন সূর্য উদিত হোক

মঙ্গলময় নতুন সূর্য উদিত হোক

রিপন আহসান ঋতু : ধূলোমাখা বাউল হয়ে এগিয়ে আসছে বৈশাখ। যদিও বৈশাখ মাস শুধু বাংলা মাসের নাম নয়, বৈশাখ নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশাখা নক্ষত্রের নাম। কিংবা পহেলা বৈশাখ শুধু বাঙালিদের উৎসব নয়। এ ঐতিহ্য দুই হাজার বছরের বেশি হবে। আর তা মৈত্রীবন্ধনে বেঁধেছে কত জনপদ ও জনগোষ্ঠীকে ভাবা যায়! জাপান থেকে চীন হয়ে মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ ভূখন্ড জুড়ে বৈশাখী উদযাপিত হয়ে আসছে, মধ্য এশিয়া থেকে পশ্চিমে কাস্পিয়ান তীর পর্যন্ত ছিল এর চল। এদিকে আফগানিস্তানসহ পুরো উপমহাদেশেই বৈশাখীর আয়োজন চলে আসছে। আমাদের আশপাশে ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো যে বৈশাখী উৎসবে মেতে ওঠে, তাও তো একই স্মৃতির প্রদীপকে উস্কে দেয়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলসহ নেপাল ও শ্রীলংকাতে বৈশাখকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে গণ্য করা হয় এবং বছরের প্রথম দিনটি কেন্দ্র করে তাদেরও রয়েছে নানা উৎসব। তবু বাঙালির জীবনে বৈশাখ ও পহেলা বৈশাখ খুবই স্বতন্ত্র। বিশেষ করে বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখের রাজনৈতিক পটভূমি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করায় এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করায় গোটা বিষয়ের গুরুত্ব অন্য সব জাতিগোষ্ঠী থেকে ভিন্ন। বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের কাল থেকেই বাংলাভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি একটা আবেগের টান তৈরি হয়েছিল। তার চর্চা হয়েছে প্রধানত একুশে ফেব্রুয়ারি ও বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে।

 একুশে উদযাপনের আয়তন যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে নববর্ষ আবাহনের আয়োজন ও আড়ম্বর। মানুষের ঢল নামছে রীতিমতো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। অংশগ্রহণ উৎসব-অনুষ্ঠানের সাফল্যের একটা মাপকাঠি অবশ্যই এবং সে হিসেবে আমাদের বাঙালিত্বের চেতনার বহিঃপ্রকাশ যে ভালোই ঘটছে তা মানতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে খানিকটা হতবিহ্বল হয়ে এ কথাও কি মানতে হবে না যে, যতই একুশের আয়তন অংশগ্রহণে বাড়ূক না কেন বাংলাকে ছাপিয়ে ইংরেজি ভাষার দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়ে চলেছে এ দেশে। একইভাবে বাংলা বর্ষবরণের ধুম পড়লেও বাংলা গান ও সংস্কৃতিকে প্রায় মাড়িয়ে ইংরেজি-হিন্দি ও বাংরেজি সংস্কৃতির প্রভাব শনৈঃ শনৈঃ বাড়ছে। তাহলে, গোলমালটা কোথায়? সোজাসাপ্টা হয়তো বলে দেওয়া যায় যে, ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে যে ভাবাবেগের প্রকাশ ঘটে একুশে ফেব্রুয়ারি বা নববর্ষের দিনে তা অনেকটাই ভাসা ভাসা, বহিরঙ্গের বিষয়, উদযাপন-উপভোগে সীমিত; আন্তরিক বিশ্বাস থেকে জীবনসাধনার অংশ হয়নি। ফলে কালের হাওয়া যেমনটা বইছে মানুষ গা ভাসাচ্ছে তাতেই। ইংরেজি-বাংরেজি সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত মেয়েটি বা ছেলেটি হয়তো নববর্ষের প্রভাতি অনুষ্ঠান মাতিয়ে রাখছে তার গানে। পারিবারিক ধর্মান্ধতার সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে চলেও নববর্ষের অসাম্প্রদায়িক বাঙালি অনুষ্ঠানে হাজির থাকছেন অনেকেই। চিন্তা-চেতনার দ্বন্দ্ব-সংঘাত থেকে পরিণতি আসে মনোজগতে আর তার বালাই যদি না থাকে, যদি ঘাটতি পড়ে যায় তাতে বা চলে বিভ্রান্তি, ঘটে ভুলচুক, তবে সে সমাজে পরিণতি ও প্রজ্ঞার পরিচয় মেলা মুশকিল।

 আবেগের উচ্ছ্বাস সাময়িক এবং তা এতটা গভীর ও সক্রিয় নয় যে মনকে চিন্তা ও মনন পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবে। রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামে যে বড় অর্জনগুলো আমাদের আছে তার সবটাতেই এই সমস্যা আবেগজাত বর্ণাঢ্য ফুলের জৌলুস ছড়ালেও ভাবনার ফসল ফলেনি। ঝাঁপিয়ে মুকুল এসে ঝড়ঝাপটায় ঝরে যাওয়ার মতো যেন। নববর্ষে কথা ভাবতে ভাবতে এখন আমার চেতনায় দেখা দিচ্ছে ভিন্ন এক ভাবনা। আমাদের যে কয়টি ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব আছে, নিঃসন্দেহে নববর্ষ উৎসব তার অন্যতম। অতীতে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী বাঙালী জাতি মিলিতভাবে নববর্ষ পালন করেছে, করছে এখনো। কিন্তু জাতীয় জীবনে এখনো দূর হয়নি সঙ্কীর্ণ সম্প্রদায় চেতনা, সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি। নববর্ষ উৎসবের অন্যতম শিক্ষাই হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ও মিলিত জীবনপ্রবাহ। কিন্তু বাংলাদেশে এক্ষেত্রে বিরাজ করছে এক বিশাল শূন্যতা। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এদেশে এখন আসন্ন মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর। চারদিকে কেবল ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থ উদ্ধারের গোপন/প্রকাশ্য প্রতিযোগ। বাংলাদেশ এখন বিদেশী দাতাদের খবরদারির অবাধ লীলাক্ষেত্র। চারদিকে বিরাজ করছে হতাশা, নৈরাজ্য আর চরম অসহায়তা। এ অবস্থা থেকে পয়লা বৈশাখ কি আমাদের কোনো পথ দেখাতে পারবে? সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। আমরা জানি উৎসব হলো বিনোদন। তার সবই আর্থিক ও সাংস্কৃতিক। তাই শেষ বিচারে উৎসব হলো বিনোদনমূলক সামাজিক কর্মকান্ড। যে কোনো সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মে আর্থিক যোগ গুরুত্বপূর্ণ। উৎসব সার্বজনীন হলেও সবার অংশগ্রহণ সমান নয়। সেটি নির্ভর করে আর্থিক সামর্থ্যরে ওপর। যার আর্থিক সামর্থ্য যত বেশি, উৎসব আয়োজন ও উপভোগে তার তত বেশি অধিকার। মানে দাঁড়াল, উৎসব মানে ফেলো কড়ি, মাখো তেল। পয়সা নেই তো আনন্দও নেই।

পয়লা বৈশাখ মানে বাঙালীর আপন শিকড়-অন্বেষা। পয়লা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপনকে একটা সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে না দেখে দেখতে হবে ঔপনিবেশিক আমলের মতো রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে। এই বৈশাখের বুকের ভিতরে আছে আগুন প্রতিরোধের আগুন। কেবল সাংবাৎসরিক নববর্ষ উদযাপন নয়, ওই প্রতিরোধের আগুনসম্ভব পয়লা বৈশাখ উদযাপনই হোক আমাদের অঙ্গীকার। ১৪২৬ বঙ্গাব্দের প্রথম সূর্য উদিত হোক সকলের মঙ্গল কামনায়। এই বৈশাখ আমাদের কাছে আসুক দুরবস্থা উত্তরণের সৃষ্টিশীল বিকল্পের উৎস হয়ে। বহুবিধ বিপর্যয় ও বিপন্নতার মধ্যেও এই বৈশাখে আমরা মিলিতভাবে আশায় বুক বাধি বহু শ্রুত এক মিথ-কাহিনীর অনুষঙ্গে। মিথ-কাহিনীর সেই ফিনিক্স পাখি যেমন আপন দেহভস্ম থেকে আবার জেগে উঠতে পারে সপ্রাণ সত্তায়। ঠিক তেমনই বাংলাদেশের জনগণের মাঝেই আছে ফিনিক্স পাখির সেই জেগে ওঠার শক্তি। তাই তারাই আমার দেশের অগ্রযাত্রায়, উন্নত সমাজ-প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে, বৈশাখী চেতনার শেষ প্রতিরোধ, অন্তিম ভরসা।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সংগঠক
০১৭১৭-৪৯৬৮০৩