ভয়াবহ বায়ুদূষণের ঝুঁকির মুখে আমরা

ভয়াবহ  বায়ুদূষণের ঝুঁকির মুখে আমরা

অলোক আচার্য : আমাদের দেশ ক্রমেই শহরায়ন প্রক্রিয়ায় এগিয়ে চলেছে। গ্রামগুলো শহরে রূপ নিচ্ছে। মিল-কারখানা স্থাপিত হচ্ছে। মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য এটা প্রয়োজন। গাছপালা কেটে বাড়িঘর তৈরি করা হচ্ছে। দূষণের সবগুলো মাধ্যমেই বাংলাদেশর অবস্থা ক্রমেই শোচনীয়। প্রতিদিন প্রতিনিয়তই আমাদের মাটি,পানি ও বায়ু দূষিত হচ্ছে। আমরা যে নিঃশ^াস নিচ্ছি তাতে ফুসফুসে জমা হচ্ছে বিষ। বিখ্যাত গায়ক নচিকেতার গানের সেই লাইনের মতো আমাদের অবস্থা’ নিঃশ^াসে নিকোটিন জমা হয় প্রতিদিন’। আমাদের নিঃশ^াসে কেবল নিকোটিন নয় বরং এর সাথে সীসাসহ আরো মারাত্মক সব ক্ষতিকারক উপাদান জমা করছে। এসব বিষাক্ত উপাদান আমাদের শরীরে বহু রোগের জন্ম দিচ্ছে। প্রতিদিন কঠিন সব অসুখ নিয়ে আমাদের ডাক্তারের কাছে দৌড়াতে হচ্ছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে আমাদের তিলোত্তমা শহর ঢাকা। মেগাসিটির রুপ নেয়া ঢাকা এখন বহুমুখী সমস্যায় পার করছে। এর অস্তিত্ব নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে। আরো কয়েক দশক এই শহর টিকে থাকবে তো। কারণ দূষণের সব কয়টি মাধ্যমই এ শহরে মারাত্বক আকার ধারণ করেছে। ঢাকার মানুষের জন্য একটি বড় ঝুঁকি হলো দূষিত বায়ু। গাছপালার সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং গাড়ি, কলকারখানার ধোঁয়াসহ নানা কারণে এই শহরের বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। এই বিষাক্ত বাতাস ফুসফুসে টেনেই এ শহরের মানুষগুলো টিকে রয়েছে। কেবল ঢাকা নয় বাকি শহরগুলোর অবস্থাও সুবিধার নয়। ডব্লিউএইচওর মানদন্ড অনুযায়ী, বিশে^র যেসব দেশের শতভাগ মানুষ মাত্রাতিরিক্ত বায়ুদূষণের মধ্যে বাস করছে তার একটি বাংলাদেশ। আর বলাই বাহুল্য যে আমাদের দেশের অন্য শহরের তুলনায় রাজধানীর বায়ু দূষণের মাত্রা বেশি।

এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশে^ যেসব কারণে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় তার মধ্যে বায়ু দূষণ পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস এন্ড ইভালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ুতে যেসব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক উপাদান হচ্ছে পিএম ২ দশমিক ৫। প্রতিবেদনে শীর্ষ বায়ু দূষণকারী দেশ হিসেবে চিন, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও পাকিস্তানের পরেই ও রয়েছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদন অনুসারে ২০১৫ সালে প্রায় ৪২ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে বায়ু দূষণের ফলে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থা ইপিএ’র গত বছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশে^ সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। সংস্থাটি বিশে^র ১৮০টি দেশ পরিবেশ সুরক্ষায় কী ধরণের ভূমিকা রাখছে তা নিয়ে একটি সূচক তৈরি করেছে। তাতে বাংলাদেশের ১৮০ টি দেশের মধ্যে ১৭৯ তম অবস্থান নিয়েছে।

আমাদের দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজন হয় বর্ধিত আবাসনের। উন্নত দেশগুলোতে আবাসন ব্যবস্থা পরিকল্পিত। কিন্তু আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এমনটা দেখা যায় না। যার যেখানে ইচ্ছা জমি, বন উজাড় করে বাড়িঘর তৈরি করছে। বাতাসে নানা কারণে দূষিত ও ক্ষতিকর কণা মিশে যাচ্ছে। কলকারখানা, যানবাহন ও জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়ানোর কারণে এসব ক্ষতিকর ধোঁয়া বাতাসে মিশে বাতাস বিষাক্ত করে তুলছে। এসব ইমারত নির্মাণ করতে প্রতিদিন ক্ষতিকর কণা বাতাসে গিয়ে মিশছে। সেই বাতাস থেকে আমাদের ফুসফুসে স্থান পাচ্ছে। এভাবে এলোমেলো বাসস্থান তৈরি করার ফলে গত কয়েক দশকে আমাদের দেশে কমেছে গাছপালার পরিমাণ। কোনো দেশের আয়তনের তুলনায় শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকার কথা থাকলেও আমাদের রয়েছে ১৭ ভাগ। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি থাকলেও তাতে বনভূমি খুব বেশি বৃদ্ধি পায়নি। তাছাড়া প্রতিদিন কোথাও না কোথাও গাছপালা কাটার কারণে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু তা শোষণ করার মতো পর্যাপ্ত গাছপালা থাকছে না। ফলে ক্রমশই বিষাক্ত হয়ে উঠছে বাংলাদেশসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়া। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে দিনের বেলা ধোঁয়ায় আচ্ছন হয়ে থাকার পেছনে দায়ী মারাত্বক বায়ু দূষণ। এভাবে বায়ু দূষণের মারাত্বক প্রভাবের দিকে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। সতর্ক হওয়ার এখনই সময়।
লেখক ঃ সাংবাদিক-কলামিস্ট ংড়ঢ়হরষ.ৎড়ু@মসধরষ.পড়স
০১৭৩৭-০৪৪৯৪৬