ভোটদানের আগ্রহ কম-দূরত্ব বাড়ছে ভোটারের

ভোটদানের আগ্রহ কম-দূরত্ব বাড়ছে ভোটারের

মো. ওসমান গনি : দিন যত যায় দেশের রাজনীতির মাঠের ভোট ও ভোটারের ভোটদানের আগ্রহ যেন দিন দিন কমে যাচ্ছে।ভোটদানের আগ্রহ কমে যাওয়ার ধারাবাহিকতাটা যদি আর কিছুদিন চলমান থাকে তাহলে একদিন হয়ত দেখা যাবে দেশে ভোট কি জিনিস তা মানুষ আর জানবে না,জানার চেষ্টাও করবে না। কারণ যে দেশে নির্বাচনে ভোটারের ভোট দেওয়ার প্রয়োজন লাগে না সেদেশে ভোট দিয়ে বা ভোট নিয়ে ভেবে কি লাভ হবে। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দেশ সংবিধান অনুযায়ী। দেশের জনগণ ভোটের মাধ্যমে ৫ বছর পর পর ভোট দিয়ে নতুন নেতা তৈরি করবে আর নেতারা সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করবে এমনটাই হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমানে যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে মনে হয় মানুষ ভোটের কথা ভুলেই গেছে। কোন একসময় যখন ঢাকা সিটির নির্বাচন হতো তখন সারাদেশের মানুষ ঢাকার সিটি নির্বাচনের দিকে চেয়ে থাকত,কোন দল নির্বাচনে জয়লাভ করে। কিন্তু সেদিনকার সিটি নির্বাচনে বিভিন্ন মিডিয়ার চিত্রে দেখা গেল অনেক কেন্দ্রেই নগণ্য ভোটারের উপস্থিতি।

 ভোট দেওয়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ নাই। যার জন্য মানুষ ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা মনে করে না। সিটি নির্বাচনে ভোটের মাঠ যেরকম জাঁকজমক হওয়ার কথা সেরকম নাই। যেহেতু বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নাই সেহেতু বিএনপি সমর্থিত নেতাকর্মিরা কেন্দ্রে যাওয়ার ও প্রয়োজনীয়তা মনে করে না। ভোটারের ভোট নিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা টানা পাঁচ বছর রাজত্ব করেন। ভোটের আগে প্রার্থীরা ভোটারের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও ভোটের পর প্রার্থীদের দেখা পাওয়াই দুষ্কর। এমন রেওয়াজই অনেকটা জায়গা করে নিয়েছে দেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে। এটাকে প্রচ্ছন্নভাবে মেনে নিয়েই ভোটাররা কাঙ্ক্ষিত সেই দিনটির জন্য বসে থাকেন- যেদিন অনুষ্ঠিত হয় ‘নির্বাচন’। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে ওই একদিনই ভোটাররা হয়ে উঠেন রাজা। কারণ এদিনই ভোটাররা ভোটের মধ্য দিয়ে তার প্রতি অবহেলার যেমন জবাব দেন, তেমনি দেন তার প্রতি যথার্থ সম্মানের প্রতিদানও। কিন্তু সে দিন এখন হারাতে বসেছে। ভোট ও ভোটারের মধ্যে বাড়ছে দূরত্ব। গত কয়েক বছরে জাতীয় ও স্থানীয় কয়েকটি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির ক্রমহ্রাসমানতাই বলে দিচ্ছে কীভাবে ভোটের সঙ্গে ভোটারের দূরত্ব বেড়ে চলেছে। এ নিয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা যেমন রীতিমতো ভাবিত তেমনি গণতন্ত্রমনা নাগরিকরাও উদ্বিগ্ন।

গত ১ মার্চ জাতীয় ভোটার দিবসে খোদ রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ভোটের ব্যাপারে ভোটারদের সচেতনতার ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, ‘ভোটাররা যত সচেতন হবে ততই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে।’ একই দিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা জানিয়েছেন, ভোটদানে ভোটারদের উৎসাহিত করতেই আলাদাভাবে ‘ভোটার দিবস’ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে দেশের ভোটাররা কী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগে কম সচেতন বা ভোটদানে উৎসাহিত নন?গত কয়েক বছরে যে কটি নির্বাচন হয়েছে তার অধিকাংশই অংশগ্রহণমূলক বা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়নি। আবার এসব শর্ত পূর্ণ হলেও  দেখা যাচ্ছে ভোটাররা ভোট দিতে পারছেন না। কখনো কখনো ভোট দিয়েও সে ভোটের প্রতিধ্বনি দেখতে পাচ্ছেন না ফলাফলে। এর প্রভাব পড়ছে ভোটারদের মন-মানসে। তাদের মধ্যে এমন ধারণা জন্ম নিচ্ছে- ‘ভোট দিলেও যে ফল হবে, না দিলেও একই ফল হবে।সর্বশেষ গত ২৮ ফেব্র“য়ারি (বৃহস্পতিবার) ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উপনির্বাচনেও ভোটার উপস্থিতি ছিল আশঙ্কাজনকভাবে কম। বিএনপিসহ সংসদের বাইরের বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্য দিয়ে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ ছিল না। ফলে ভোটারদেরও আগ্রহ দেখা যায়নি। নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ না হলে ভোটাররা আগ্রহ হারাবেই। আগ্রহ হারানোর আরও বড় কারণ হলো, ভোটাররা ভোট দিতে পারছেন না, তাদের ভোট আগেই হয়ে যায়, বুথ দখল হয়ে যায়। আগের বড় নির্বাচনগুলোতে যা হয়েছে তার প্রভাব পড়েছে ডিএনসিসি নির্বাচনেও। সামনে উপজেলা নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়বে।

আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে যে একই অবস্থা বিরাজ করবে তারই ইঙ্গিত মিলেছে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কথায়ও। গত ২মার্চ (শনিবার) ঢাকার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘উপজেলা নির্বাচন একেবারে পারফেক্ট হবে, এটা আমি মনে করি না। পারফেক্ট বিষয়টি ভিন্ন বিষয়। কোনো বিষয়কে পারফেক্ট বলা ঠিক না, ভুলত্রুটি নিয়েই আমরা এগিয়ে যাই।’ বেশ কয়েক বছর ধরে দেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকছে না। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দল ও প্রার্থীদের মধ্যে আচরণবিধি ভঙ্গের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের প্রভাব একচ্ছত্র ও একতরফা রূপ নিচ্ছে। ইসির ওপর ভোটারদের আস্থা নষ্ট হচ্ছে- এমন কথা মানতে নারাজ প্রধান নির্বাচন কমিশনার।  নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার দায় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের কারণে হয়। কমিশনের কাজ হলো নির্বাচনের জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করে দেওয়া। আর ভোটার নিয়ে আসার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলো কিংবা প্রার্থীদের। রাজনীতিতে ক্রিয়াশীল দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকার ঘাটতি রয়েছে। শুধু সরকার বা ক্ষমতাসীন দলই নয়, ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোরও দায়িত্ব থাকে নির্বাচনী পরিবেশকে উৎসাহপূর্ণ ও উপভোগ্য করে তোলা। কিন্তু রাজনৈতিক সমঝোতার অভাবে বারবার নির্বাচন তার চরিত্র হারাচ্ছে। জনগণ হারাচ্ছে ভোটাধিকার। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে জনগণের কাছে যেতে হবে। জনগণ যা চায় তার পক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোকে অবস্থান নিতে হবে, দাঁড়িয়ে কথা বলতে হবে। দাঁড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। রাজনৈতিক দলের নেতারা দাঁড়াবে, সঙ্গে জনগণ থাকবে। জনগণ যদি চায়, সবকিছু ভেঙে যায়। এটা আমরা বারবার দেখেছি। প্রতিকার হচ্ছে, জনগণকে নিয়ে আন্দোলন করা। জনগণই হচ্ছে সব ক্ষমতার উৎস। সংবিধানে এমনটাই বলা আছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে হবে। যে-ই রাজনীতি করবে, জনগণকে সঙ্গে রাখবে। তাহলেই প্রতিকার হবে একসময়। যার পক্ষে জনগণ থাকবে তারাই টিকবে এ দেশে।
লেখক : সাংবাদিক -কলামিস্ট
[email protected]
০১৮১৮-০৩৬৯০৯