ভোটটা দেই কারে!

ভোটটা দেই কারে!

আতাউর রহমান মিটন: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ট্রেনটা ছেড়ে দিয়েছে। বেশ কয়েকটা স্টেশন পার হয়ে সে আগামী ৩০ ডিসেম্বর স্ষ্ঠুুভাবে তার গন্তব্যে পৌঁছাবে বলে আমরা আশা করি। নির্বাচনী ট্রেনের যাত্রীদের মতই সারাদেশের মানুষ এখন উত্তেজনা, উৎকণ্ঠা নিয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে। একেকজনের বিশ্লেষণ আর ভবিষ্যতবাণীতে মুখরিত চারিদিক। প্রায় দশ বছর পর বাংলাদেশের মানুষ আবার একটা টান টান উত্তেজনায় ভরপুর একটি নির্বাচন করতে যাচ্ছে। জনগণের প্রত্যাশা নির্বাচন সুষ্ঠু হোক, মানুষ নিরাপদে এবং নিশ্চিন্তে তাদের ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পাক।
‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশী তাকে দেব’ - এই শ্লোগানটা আমাদের রক্তের মধ্যে মিশে আছে বহুকাল থেকেই। একটি ভোট আমাদের কাছে কেবল একদিনের উৎসব নয়। এটি আমাদের কাছে নিজেদের পছন্দ প্রকাশ এবং প্রতিনিধি নির্বাচনের স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা কেড়ে নেবার যে কোন অপচেষ্টা তাই জনগণ রুখে দেয়ার জন্য সর্বদা প্রস্তুত। গণতন্ত্রের কেতাবী সংজ্ঞার চাইতেও এই ভোটাধিকার আমাদের কাছে অহংকার ও মর্যাদার প্রতীক। আমার পছন্দের প্রার্থীকে জিতিয়ে আনার জন্য সে কারণেই আমাদের দেশের মানুষ গাঁটের পয়সা খরচ করে, রোজা রাখে, দোয়া করে প্রাণ ভরে, হাত পেতে ভোট চায় অন্যের দ্বারে গিয়ে। ভোট নিয়ে আমাদের জনগণের এই আগ্রহ, এই উত্তেজনা পৃথিবীর বহুদেশেই দেখা যায় না। আমাদের মত করে পৃথিবীর বহুদেশেই ভোটের দিন জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে গণ্য হয় না। সুতরাং এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমরা অন্য অনেক দেশের চাইতে বেশি গণতন্ত্র প্রিয়! ভোট আমাদের জীবনের অন্যতম আনন্দের দিন!

এটা আমাদের দুর্ভাগ্য যে, স্বার্থান্বেষী মহল আমাদের ভোটের উৎসবকে কলঙ্কিত করেছে। তারা টাকা দিয়ে ভোট বেচা-কেনা শিখিয়েছে, অস্ত্রের ব্যবহার করেছে, ভয় দেখিয়ে ভোট কেন্দ্র দখল করেছে, পোলিং এজেন্টদের বের করে দিয়েছে, একজনের ভোট অন্যজন দিয়েছে, ভোটের ব্যালট বাক্স কেড়ে নিয়েছে, ভোট কেন্দ্রের চারপাশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে, ভোটের আগের দিন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শাসিয়ে এসেছে, এমনকি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভোটের ফল পাল্টিয়ে দিয়েছে। অতীতে আমরা আরও দেখেছি বিনাভোটে তথাকথিত জয়ের নির্লজ্জ উৎসব! এই সবই আমাদের গণতন্ত্রমনা, উৎসবমুখর, ভোট পাগল মানুষগুলোকে আহত, ক্ষত-বিক্ষত করেছে! একটু ভাল করে দেখুন তো এই অপশক্তিকে আমরা চিনতে পারি কি না? হ্যাঁ বন্ধুরা। আমরা ওদের চিনি। আমরা চিনি কারা ওদের চালায়? আমরা এটাও জানি এভাবে জোর করে ভোটের দখল নিয়ে ওরা প্রকৃতপক্ষে আমাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য লাগানো ফল বাগানের ফলগুলো চুরি করে নিয়ে যায়। ওরা নিজেদের পেট ভরায়, নিজেদের আখের গোছায় আর বঞ্চিত করে সাধারণ মানুষকে। ওরা ভোটের সময় হলেই ওরা জনদরদি মার্কা ফটো তুলে বড় বড় করে পোষ্টার, ফেষ্টুন, বিলবোর্ড বানিয়ে ঝুলিয়ে দেয়। নিজেদের নামের আগে ‘জনদরদি’ টাইটেল বসিয়ে দেয়। ভাবখানা এমন যে, আমরা জনগণ ওদের চিনি না, জানিনা ওরা কে এবং অতীতে ওরা কি কি করেছে। আমরা জনগণ সব জানি, সব মনে রেখেছি। ভোটের মাধ্যমেই আমরা আমাদের জবাব দিয়ে দেব। তোমরা ভেবো না আমরা জনগণ ‘ভীতু’, ‘অসহায়’! আমরা আসলে ধৈর্য্যশীল। আমরা অপেক্ষমাণ সঠিক সময়ের। আগামী ৩০ ডিসেম্বর সেই শুভদিন। আমরা জনগণ সেদিন আমাদের মতামত স্পষ্ট করে জানিয়ে দেব। ভোট বিপ্লবের মাধ্যমেই আমরা বুঝিয়ে দেব, দিন বদলাচ্ছে। এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ! আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে তা বহুলাংশে নির্ভর করছে আমরা এবারের নির্বাচনে কি ধরনের প্রতিনিধি নির্বাচন করছি তার উপর। বলার অপেক্ষা রাখে না বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা বদলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তির নয়, এই পরিবর্তন মানসিকতার, স্বপ্ন দেখার, সুন্দর আগামীর বীজ বোনার।

গত দশ বছরে আমাদের বিপুল সংখ্যক তরুণ নতুন ভোটার হিসেবে যোগ দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে সংখ্যাটা প্রায় সোয়া দুই কোটি। এই তরুণ ভোটারদের যারা কাছে টানতে পারবেন তারাই হয়তো আগামী নির্বাচনে জয় পাবেন। তাই তরুণদেরকে সবাই টার্গেট করে ভোটের ক্যাম্পেইন সাজাতে শুরু করেছে। তরুণ বন্ধুদের মনে রাখতে হবে এই আকৃষ্ট করার কৌশলটা অনেকটাই ফাঁদ বা জাল পেতে মাছ শিকারের মত। সাবধানে পথ চিনে চলতে না পারলে পাতানো ফাঁদে আটকে যাবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তরুণদেরকে ভোট দেয়ার আগে দলগুলোর স্বপ্ন ও সেই স্বপ্ন পূরণের কর্মসূচি কি সেটা বিবেচনায় নিতে হবে। আমার প্রস্তাব এই যে, আগামীতে নির্বাচিত হয়ে যারা তরুণবান্ধব সমাজ গঠনে আগ্রহী হবেন, অর্থাৎ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রতিটি কমিটিতে কমপক্ষে একজন তরুণ প্রতিনিধি রাখার সুযোগ নিশ্চিত করবেন, ভোটের ক্ষেত্রে এমন প্রার্থীদের বিবেচনায় নিতে হবে। আগামীর বাংলাদেশে নেতৃত্বদানে সক্ষম হবে এমনভাবে তরুণদের গড়ে তুলতে সহায়তা দিতে হবে। এর জন্য তরুণ সমাজের মন্ত্রণালয় অর্থাৎ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বাজেটে জিডিপি’র ন্যুনপক্ষে ৩% বরাদ্দ দেয়ার অঙ্গীকার থাকতে হবে। আমার প্রস্তাব, আসন্ন নির্বাচনে তরুণ প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেয়া হোক। সকল মানুষের সমান সুযোগের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এমন প্রার্থীদের আমরা স্বাগত জানাই। যাঁরা তরুণদের হাতে নেশার সামগ্রী তুলে দেয়, যারা সন্ত্রাসে উৎসাহ দেয়, যারা অতীতে সমাজবিরোধি বা গণবিরোধি কাজে জড়িত ছিল তাদেরকে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ দেয়াটা হবে ‘নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা’। এদেরকে রুখে দাঁড়াতে হবে বন্ধুরা।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন বছর বছর হয় না। একবার ভুল হলে আবার পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে। এবার সঠিক প্রার্থী নির্বাচনে ব্যর্থ হলে আগামী পাঁচ বছর তার খেসারত টানতে হবে। সেটা কেবল ব্যক্তিগতভাবে নয়, পুরো জাতিকেই সেই অস্বস্তি ভোগ করতে হবে। তাই তরুণ বন্ধুদের নিজেদের ভোট সম্পর্কে সজাগ হতে হবে। যিনি ভোট করছেন তিনি যদি সত্যিই আমাদের ভাল করার জন্য নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে থাকেন, আর সেটা যদি আপনি বিশ্বাস করেন তাহলে সেই প্রার্থীকে জয়ী করার জন্য সকলেই এগিয়ে আসুন। সেই প্রার্থীর হয়তো টাকা নেই, আপনারা চাঁদা দিয়ে তার মাইকের বিল পরিশোধ করুন। তিনি যদি নির্বাচনী ক্যাম্প করার জন্য টাকা খরচ করতে না পারেন তাহলে নিজেদের উদ্যোগে প্রত্যেক এলাকায় সাদামাটা ক্যাম্প তৈরি করে টাকাওয়ালা, লুটেরা প্রার্থীদের বুঝিয়ে দেন এদেশের যুব সমাজ নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই গড়তে জানে।

ভাবছেন এটা অসম্ভব, এটা কখনও হয়? হ্যাঁ হয়। ইন্টারনেটে গিয়ে ছক্কা ছয়ফুর লিখে সার্চ করুন দেখবেন সিলেটের জনৈক ছয়ফুর রহমান এর নামে অনেক লেখা আসবে। তাহলে এখানে ছয়ফুর রহমান সম্পর্কে কিছু কথা জানাই। পেশায় বাবুর্চি এই মানুষটি একাধিকবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেছিলেন কিš‘ জিততে পারেন নি। কথিত আছে তিনি খুব ভাল বক্তা ছিলেন। তিনি সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় রসিকতাপূর্ণভাবে বক্তব্য রাখতেন। বক্তব্য শেষে তিনি সবাইকে মাইকের খরচ পরিশোধের জন্য আহ্বান করতেন আর উপস্থিত লোকজনও তার পাতানো গামছায় কিছু কিছু টাকা দিয়ে সত্যি সত্যি মাইকের বিল পরিশোধ করতেন। ছক্কা ছয়ফুর প্রেসিডেন্ট হতে না পারলেও নব্বই এর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সিলেট সদর উপজেলায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা ছয়ফুর রহমান এমনিই জনপ্রিয় বক্তা ছিলেন, গণমানুষের মধ্যে তার ভিত্তি এত মজবুত ছিল যে, নির্বাচনী জনসভায় তাকে আনার জন্য ৫০০ টাকা অগ্রীম দিয়ে তাকে ‘বুক’ করে আসতে হতো। যতটুকু জানি, বাংলাদেশের নির্বাচনে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যার নিজের নির্বাচনী সভায় বক্তব্য দেয়ার জন্য যিনি উল্টো জনগণের কাছ থেকে টাকা নিতেন। কারণ তিনি সবাইকে বলতেন, নির্বাচনে আসার কারণে তার বাবুর্চি পেশা বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবারের ভরণ-পোষণ যোগানোর খরচ তাই জনগণকেই বহন করতে হবে। তা না হলে তার পক্ষে জনগণের সেবায় কাজ করা সম্ভব নয়।

ছক্কা ছয়ফুরের গল্পটা প্রায় ত্রিশ বছর আগের। দিন বদলেছে, বদলে গেছে মানুষের মানসিকতাও। সেটা আমি মানি। এখনকার নির্বাচনে হয়তো ছক্কা ছয়ফুরের মতো গণমানুষের মধ্যে থেকে সেবক হিসেবে উঠে আসা প্রার্থীদের দেখা পাওয়া কঠিন কিন্তু ভালমত লক্ষ্য করলে এমন প্রার্থী পাওয়া বা গণমানুষের বন্ধু প্রার্থী পাওয়াটা কঠিন নয়। এর জন্য বৃত্তের বাইরে তাকাতে হবে। আমাদের দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থা দ্বি-ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আমি বলছি না যে, এই প্রতীক নিয়ে যারা নির্বাচন করছেন তারা গণমানুষের বন্ধু নন, আমি বলতে চাইছি এই দ্বি-দলীয় বলয়ের বাইরেও প্রার্থী আছে এবং আমাদের উচিত তাদেরকেও ভোটের বিচারের আলোচনায় নিয়ে আসা।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বললেও অত্যুক্তি হবে না। এটা কৌতুক করার জায়গা নয়। সংবিধান মোতাবেক সকলেরই নির্বাচনে প্রার্থী হবার অধিকার আছে এবং সেই অধিকারের মর্যাদা রক্ষায় আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কিন্তু তাই বলে সবাই এমপি-মন্ত্রী হতে চাইবেন এটা কেমন কথা?

এটা আমাদের দুর্ভাগ্য যে, বাংলাদেশে ইয়াবা ব্যবসায়ী, চোরকারবারি, গুন্ডা, দখলবাজ ইত্যাদি ব্যক্তিদেরও এমপি হতে ইচ্ছে করে, এদের অনেকেই আবার মনোনয়নও পায়। আমি কারও ইচ্ছার স্বাধীনতায় বাধা দেয়ার পক্ষে নই। কিন্তু একজন ভোটার হিসেবে, একজন নাগরিক হিসেবে আমি পরিস্কার করে বলে দিতে চাই যে, আমার ভোট আমি দেখে, শুনে ও বুঝে দেব। পাছে আমার নিজের কপালে ঝাঁটার বাড়ি দিতে হবে, এমন কোন প্রার্থীকে আমি ভোট দেব না। আমি এমন ব্যক্তিকেই ভোট দেব যিনি মানুষের পাশে থাকবেন। হঠাৎ হঠাৎ এলাকায় আসেন বা কদাচিৎ দেখা মেলে বা সাধারণ মানুষের সাথে কেবল ভোটের সময়ে দেখা হয় এমন প্রার্থী নয়, বরং সারা বছর সুখে-দুঃখে যাকে পাশে পাওয়া যাবে এমন সৎ ও জনদরদি ব্যক্তিদের ভোট দেয়ার জন্য আমি সকলকে আহ্বান জানাই।
লেখক: সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
-০১৭১১৫২৬৯৭৯