নদী বন্দরগুলোর অস্তিত্ব বিপন্ন

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১০ মিটার নিচে বরেন্দ্র এলাকায় নলকূপে পর্যাপ্ত পানি উঠছে না

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১০ মিটার নিচে বরেন্দ্র এলাকায় নলকূপে  পর্যাপ্ত পানি উঠছে না
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১০ মিটার নিচে বরেন্দ্র এলাকায় নলকূপে  পর্যাপ্ত পানি উঠছে না

নবির উদ্দিন, নওগাঁ : উত্তরাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া অব্যাহত থাকায় শীতকাল থেকেই নলকূপে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি উঠছে না। ফলে এ অঞ্চলের জনসাধারণকে বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার ৩৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পানি সংরক্ষণ ও নিরাপদ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে জেলা পরিষদের পুকুর, দীঘি, জলাশয়সমূহ পুন:খনন/সংস্কার’ শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে।

অন্যদিকে নদ-নদীতে পানি কমে যাওয়ায় এক সময়ের কোলাহলমুখর নদী বন্দরগুলোর অস্তিত্ব এখন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে ৩০টির বেশি নদীর প্রায় ২০০ নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৩ থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। পল্লী অঞ্চলে পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় পুকুর পুনঃখনন ও নতুনভাবে খনন করা হচ্ছে। এসব পুকুর পুনঃখনন করে পানি পন্ড স্যান্ড ফিল্টার পদ্ধতিতে সরবরাহের মাধ্যমে নওগাঁ জেলাসহ দেশের সব জেলায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভশীলতা কমিয়ে আনা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন পৌরসভায় নিরাপদ জলের জন্য নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছে। ইতিমধ্যে ১২২টি পৌরসভায় পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়া ৩৭টি জেলা শহরে পানি সরবরাহ প্রকল্প, ৪০টি পৌরসভা ও গ্রোথ সেন্টারে অবস্থিত পানি সরবরাহ ও এনভায়রনমেন্টাল স্যানিটেশন (২য় পর্যায়) প্রকল্প এবং থানা সদর ও গ্রোথ সেন্টারে অবস্থিত পৌরসভাসমূহে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া আর্সেনিকমুক্ত নিরাপদ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে পানি সরবরাহে আর্সেনিক ঝুঁকি নিরসন প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্ল¬ী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন গত ৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে উল্লিখিত বিষয়গুলি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন।

এদিকে দেশের পরিবেশবিদ ও বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে আগাম আভাস দিয়েছিল যে, অদূর ভবিষ্যতে দেশের উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকাজুড়ে পানির তীব্র সংকট দেখা দেবে। এরই পতিফলন স্বরূপ বরেন্দ্র অঞ্চলের বেশ কিছু এলাকার ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর বিগত এক যুগে দ্বিগুণের বেশি নিচের দিকে নেমে গেছে। এর কারণে অনেক আগে থেকেই উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকায় খাবার পানির সংকট লক্ষ্য করা যাচ্ছিল।

এদিকে উত্তরাঞ্চলের কোনো রকমে টিকে থাকা নৌ-ঘাটগুলোরও বেহাল দশা। অনেক নদী একেবারে পানিশূন্য হয়ে পড়ায় সেগুলো এখন আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে। নদীর বুকে জেগে উঠেছে ছোট বড় অসংখ্য চর। ২৫টির মত  নৌপথ কোন রকমে চালু রয়েছে। প্রায় এক যুগ এসব নদী চাহিদা মোতাবেক ড্রেজিং করা হয় না।

ডিসেম্বর থেকে ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, তিস্তা, করতোয়া ও যমুনাসহ ছোট বড় সবগুলো নদীর পানি দ্রুত কমতে শুরু করে। ফেব্রুয়ারিতে এসে অব্যাহত পানি কমার ফলে নদীগুলো নিজেদের অস্তিত্ব হারাতে বসে।

পানির অভাবে গাইবান্ধার  বালাসীঘাট থেকে দূরদূরান্তের নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। নৌ ঘাটটি সরিয়ে এখন সাতারকান্দিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যে সব নৌ ঘাট এখনও কোন রকমে টিকে রয়েছে সেগুলোও  বেহাল দশায় পড়েছে। চরাঞ্চলের নৌ যাত্রীদের বালুচরে হেঁটে গিয়ে অনেক দুরে নৌকায় উঠতে হচ্ছে। এছাড়া চ্যানেলের অভাবে নৌযান কমে গেছে অর্ধেকেরও বেশি। এই হারে নদীর পানি কমতে থাকলে যে কোন সময় নৌ চলাচল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যে সব রুটে এখনও যান্ত্রিক নৌকাগুলো চলছে জেগে ওঠা চরের কারণে ঘুর পথে চলাচল করতে হচ্ছে বলে গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে সময় লাগছে দ্বিগুণেরও বেশি। অপরদিকে ছোট ছোট নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় ওইসব নদীতে ইতিপূর্বে স্থাপিত সেচ যন্ত্রগুলো এখন পানি সংকটের মুখে পড়ছে।

গত বছর অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও যমুনাসহ ছোট বড় সবগুলো নদীর পানি দ্রুত কমতে শুরু করে। অব্যাহত পানি হ্রাসের ফলে নদীগুলো নিজেদের অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সদর উপজেলার পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্র্ণ চরাঞ্চলের বসবাসকারী হাজার হাজার মানুষ নদীতে নাব্যতা থাকার সময় স্বাভাবিকভাবে নৌকায় চলাচল করে। এখন নদী বুকে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চর এবং শীর্ণকায় নদীর শাখাগুলো পায়ে হেটে গন্তব্য স্থলে তাদের পৌঁছতে হয়। ইতোমধ্যে অনেক চরে ভ্ট্টূা, বাদাম ও মরিচসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়েছে।