ভুরুঙ্গামারীর বাল্যবিয়ের শিকার সুমাইয়া ঘুরে দাঁড়াতে চায়

ভুরুঙ্গামারীর বাল্যবিয়ের শিকার  সুমাইয়া ঘুরে দাঁড়াতে চায়

ভুরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি : ভুরুঙ্গামারীতে ভারতীয় নাগরিকের সাথে বাল্যবিয়ের শিকার সুমাইয়া আবারও ঘুরে দাঁড়াতে চায়। বাল্যবিয়ের শিকার মেয়েটির পুরো নাম সুমাইয়া আখতার স্বপ্না। পিতার নাম মোঃ ছলিম উদ্দিন পেশায় দিনমজুর। কুড়িগ্রাম জেলার তিলাই ইউনিয়নের পশ্চিম ছাট গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা। সম্প্রতি দাতা সংস্থা সিডা ও প্লান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এর সহযোগিতায় বেসরকারি সাহায্য সংস্থা আরডিআরএস বাংলাদেশ কর্তৃক বাস্তবায়িত বিল্ডিং বেটার ফিউচার ফর গার্লস প্রকল্প- এর পক্ষ থেকে সফল নারী হিসেবে সম্মাননা পেয়েছে।

সম্প্রতি সুমাইয়ার বাড়িতে আলাপকালে সে জানায়, ২০১৪ সালে সুমাইয়া তিলাই উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। ওই সময় ভারতের দিনহাটা থানার ঝাউকুঠি গ্রামের তার সম্পর্কীয় দাদা মোগর আলী তাদের বাড়িতে বেড়াতে এসে তাকে দেখে পছন্দ করেন এবং তার গ্রামে (ভারতের দিনহাটা থানার ঝাউকুঠি গ্রাম) দুরসম্পর্কীয় এক নাতীর সাথে বিয়ের প্রস্তাব দেন। বিয়েতে কোন ডিমান্ড ছিল না। ছেলের ভালো মন্দের দায়িত্ব মোগর আলী নিজেই নেয়। এই প্রলোভনে সুমাইয়ার বাবা-মা বাল্যবিয়েতে রাজি হয়ে যায়। দাদুর (মোগর আলী) চাপাচাপিতে পরের দিনই ভারতে দিনহাটা থানার ঝাউকুঠি গ্রামের মোঃ এমদাদুল হকের পুত্র মাদ্রাসা পড়–য়া ছাত্র মাইদুল ইসলামের (২০) সাথে বিয়ে হয়ে যায়। মেয়ের বয়স কম হওয়ায় ভুয়া কাবিন নামা তৈরি করে সুমাইয়ার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি করে বিয়ে দেয়া হয়।

সুমাইয়া বলে, বিয়ের এক মাস পর কারণে অকারণে তার উপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালাতো। শুধু তাই-নয় বিয়ের সময় যৌতুক নিবে না বললেও পরে তাকে সাজিয়ে চায়। পরে বাবা গরু বিক্রি করে চুরি, মালা ও কানের দুল দেয়। এরপর আবার ২ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। বাবা এত টাকা দিতে পারবে না বলে জানালে নির্যাতন আরও বেড়ে যায়। এভাবে ৬ মাস সংসার করার পর সে নিজ বাড়িতে চলে আসে এবং সব নির্যাতনের কথা সাহস করেবাবা মাকে বলে। সে আর সংসার করবে না বলে বাবা-মাকে জানিয়ে দেয়। এসময় তার বাবা মা দিশেহারা হয়ে পড়ে। সুমাইয়ার আপন দাদা তার কথা বুঝতে পারে এবং দাদার সহযোগিতায় তার স্বামীকে একদিন তালাক দেয়। সুমাইয়া যখন পুনরায় লেখাপড়ার চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল ঠিক তখনি প্রতিবেশী ধনাঢ্য ব্যক্তি শাহাজাহান আলী (৫৫) তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। তার তিন স্ত্রী এবং অনেকগুলো সন্তান ও নাতী-নাতনি রয়েছে। বাবাকে বাড়ি করে দিবে, একটি অটো এবং বিয়ের সব খরচ দিবে বলে প্রলোভন দেখানো হয়। এ জন্য স্থানীয় কয়েকজন লোক ম্যানেজ করে তাদের মাধ্যমে দাদু ও বাবাকে চাপ দিতে থাকে।  

অবস্থা বেগতিক দেখে একদিন সুমাইয়া পাশের বাড়িতে গিয়ে কান্নাকাটি করে বলতে থাকে আমি বিয়ে করব না। লেখাপড়া করতে চাই। ওই সময় রাস্তার পাশ দিয়ে আলতাফ ও আনিস নামে দুই শিক্ষক তার কথা ও কান্না শুনতে পেয়ে বাড়ির ভিতর যেয়ে সকল ঘটনা শুনতে পেয়ে তারা তার বাবা ও দাদাকে বুঝানোর দায়িত্ব নেয় এবং লেখাপড়ার ব্যাপারে তারা সহযোগিতা করবে বলে জানায়। এভাবে তার ২য় বিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৬ সালে পুনরায় তিলাই উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণিতে ভর্তি হয় এবং জিপিএ-৫ পেয়ে জেএসসি পাশ করে। সে এখন ওই বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ছে। সে জানায় লেখা পড়ার ব্যাপারে তার শিক্ষকরা যথেষ্ট সহযোগিতা করছে।
সুমাইয়া জানায় জীবনে অনেক কষ্ট পেয়েছি। এখন সে লেখাপড়া শিখে বিসিএস ক্যাডার অফিসার হতে চায়। সুমাইয়ার মা মর্জিনা বেগম জানান, তখন কিছু বুঝিনি। ভালো ছেলে মনে করে বিয়েতে রাজি ছিলাম। পরে ভুল বুঝতে পারি। প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন জানান, মেয়েটি লেখাপড়ায় ভালো। তারা লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে।