ভালো নেই কৃষক

ভালো নেই কৃষক

আব্দুল হাই রঞ্জু : বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশ। দেশের ভৌগলিক সীমারেখা কার্যত স্থির। কিন্তু জনসংখ্যা বাড়ছেই। ফলে ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় একটি চ্যালেঞ্জ। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিরন্তর কাজ করছে দেশের কৃষককুল। যাদের শ্রমের উপর ভর করে দেশের খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে কয়েকগুণ। বলতে গেলে খাদ্য ঘাটতি অনেক কমে এসেছে। এক সময়ের খাদ্য সংকটে মানুষের হাহাকার এখন আর নেই। এটা সত্য। কিন্তু কৃষকের অবস্থা ভাল নেই। গত বোরো মৌসুমে কৃষক ধানের উপযুক্ত মূল্য পাননি। ফলে তাদের লোকসান গুণতে হয়েছে। আশা ছিল আউশ ও আমন মৌসুমে কৃষক ধানের ন্যায্য মূল্য পাবেন। কিন্তু এখানেও তথৈবচ অবস্থা। ইতিমধ্যে আউশ  ধান কাটা মাড়াই শুরু হয়েছে। কিন্তু ধানের দাম কম। সামনে আশা করা হচ্ছে আমনের ফলনও ভাল হবে। শংকার বিষয় কৃষক কি এ বছর আমন ধানের ন্যায্য মূল্য পাবেন?
সরকার কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রতি বছরই আমন ও বোরো মৌসুমে ধান ও চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করে থাকেন। সামনের আমন মৌসুমে সরকার কি পরিমাণ ধান ও চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করবেন, তা এখনও ঘোষণা করেনি। তবে নামমাত্র পরিমাণ ধান ও চাল সংগ্রহ করলে যা হবে গতানুগতিক। আর গতানুগতিক পরিমাণ ধান চাল সংগ্রহ করলে কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। যা অনেকটাই নিশ্চিত করেই বলা যায়।
উল্লেখ্য, এখন চাষাবাদের উপকরণ ও কৃষি মজুরের দাম বেশি হওয়ায় ধান উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে প্রতি বিঘা জমিতে ধান চাষে খরচ হয় ১১-১২ হাজার টাকা। আর বিঘা প্রতি ধান উৎপাদন হয় ১৫ থেকে ১৬ মণ। এখন বাজারে এই ধান বিক্রি হচ্ছে ৫৩০ থেকে ৫৭০ টাকায়। উৎপাদন থেকে শুরু করে কাটা মাড়াই পর্যন্ত যে খরচ হয়, সে খরচ বর্তমান বাজার দরে ওঠে না। ফলে হতাশ কৃষক।  কৃষকের ধানের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত না হলে তারা ধান চাষ ছেড়ে দিয়ে অন্য চাষাবাদের দিকেই হাঁটবে, এটাই স্বাভাবিক। অথচ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে খাদ্যশস্য চাষের কোন বিকল্প নেই।
অতিসম্প্রতি জাতীয় এক দৈনিকে ‘ধানের রাজ্যে ড্রাগন রাজা’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত খবরে জানা যায়, খাদ্য ভান্ডার খ্যাত উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এখন জনপ্রিয় ও পুষ্টিসমৃদ্ধ বিদেশি ‘ড্রাগন’ ফলের চাষ হচ্ছে। এ ফলের চাষ করে অনেকের ভাগ্যের বদলও হয়েছে। দিনাজপুরের মাটি ধান চাষের জন্য উপযুক্ত। কিšু— যেহেতু ধান চাষ করে কৃষকের লোকসান গুণতে হয়, সেহেতু এখন ড্রাগন ফলের চাষ শুরু করেছেন। আর এ ফলের বাজার মূল্যও ভাল হওয়ায় কৃষক এ ফলের চাষের দিকেই এগুচ্ছে। অবশ্য ফলমুলের চাষ করে জীবন-জীবিকার উন্নতি করা গেলে, সে চাষে মন্দ কি! কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মানুষের খেয়ে পরে বেঁচে থাকার ধানি জমিতে যদি ফলের চাষ করতে থাকে, তাহলে চাহিদার খাদ্য শস্য চাষাবাদ করা সম্ভব হবে না। আর অবস্থা এমন হলে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘিœত হবে। আমরা চাই না, মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘিœত হোক। বরং যেভাবে মানুষ বাড়ছে,সেভাবে চাহিদার খাদ্য উৎপাদন দেশিয় ভাবেই বৃদ্ধি করে আমাদের যোগান দিতে হবে। এজন্য কৃষি বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন জাতের ধান উদ্ভাবন করছেন। আর উদ্ভাবিত সে ধান মাঠে চাষাবাদ করে কৃষক মানুষের মুখে দু’বেলা খাবার নিশ্চিত করছেন। যদি শুধু উপযুক্ত মূল্যের অভাবে ধান চাষীরা ধান চাষ ছেড়ে দেন, তাহলে আমাদের অর্জিত সফলতা ধরে রাখা কঠিন হবে।
যেমন সাম্প্রতিক সময়ে পেঁয়াজের বাজারে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে,তা প্রতিবেশি দেশগুলো থেকে আমদানি করেও বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এটা ঠিক, দেশীয়ভাবে উৎপাদিত কোন পণ্যের কাঙ্খিত পরিমাণ যোগান দেয়া না গেলে তার যে সংকট হবেই, এটাই সত্য। ফলে,এ বছর পেঁয়াজের তীব্র সংকট হয়েছে। যদিও  প্রতিবেশি দেশ মিয়ানমার ও ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে। তবুও পেঁয়াজের বাজার দর কমছে না। এখনও দেশি পেঁয়াজ ১০০ থেকে ১১০ টাকা ও আমদানিকৃত পেঁয়াজ ৮০ থেকে ৯০ টাকায় ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে।  পেঁয়াজ সংকটের মুহূর্তে হঠাৎ ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করায় ভারত সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রসিকতার সুরেই কটাক্ষ হেনে  বলেন, হঠাৎ পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করা ঠিক হয়নি। ভবিষ্যতে কোন পণ্যের রফতানি বন্ধের মতো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ভারত সরকার যেন প্রতিবেশিদের আগে থেকে জানিয়ে প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগটুকু দেন।
উল্লেখ্য,শেষ পর্যন্ত সরকারের তরফেও এখন বলা হচ্ছে, দেশে উৎপাদিত নতুন পেঁয়াজ না ওঠা পর্যন্ত পেঁয়াজের বাজার চড়াই থাকবে। অর্থাৎ চড়া দামেই ভোক্তাদের পেঁয়াজ কিনে খেতে হবে। এখন আবার পেঁয়াজের পর মরিচের বাজারেও আগুন লেগেছে। এখন কাঁচা মরিচ প্রতি কেজিতে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাস্তবে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যে ভোক্তার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব না হলে, বাড়তি দামেই যে তা কিনে খেতে হবে, এটাই স্বাভাবিক। এ কারণে দেশে কৃষি পণ্যের উৎপাদন যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি উৎপাদিত কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্যও নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশে আবার একটু বাড়তি ফলন হলেই কৃষকের কপাল পোড়ে। এজন্য পরিকল্পিত চাষাবাদের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। যখন যে পণ্যের বাজার মূল্য চাষীরা বেশি পায়, তখন সে পণ্যই বেশি করে উৎপাদন করে। ফলে চাহিদার অতিরিক্ত ফলন হলেই দাম পড়ে যায় এবং পানির দামেই সে পণ্য চাষীরা বিক্রি করতে বাধ্য হয়।
মূলত উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনে সমন্বয়হীনতার কারণে সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে সংরক্ষণ উপযোগী পর্যাপ্ত হিমাগারের অভাবে সবজি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। ফলে ভরা মৌসুমে বাড়তি ফলনের কারণে অনেক সময়ই সবজি ফেলে দেয়া হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে তা পশুর খাদ্য হিসেবে বিনষ্ট করা হয়। অথচ সবজি সংরক্ষণ করতে পারলে সবজি চাষীরা মৌসুম শেষে সারাবছর ধরে তা হিমাগার থেকে উত্তোলন করে বাড়তি দামে বিক্রি করতে পারতেন। যা নিশ্চিত করতে সরকারকে সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগার গোটা দেশে নির্মাণ করতে হবে। এখনতো বিদ্যুতের ঘাটতি অনেকাংশেই কমে গেছে। যেভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, যা হয়তো নিকট ভবিষ্যতে উদ্বৃত হয়ে যাবে। সংগত কারণে ছোট বড় পর্যাপ্ত হিমাগার গোটা দেশে স্থাপন করলে বিদ্যুৎ সংযোগের সমস্যা হবে না। ফলে সবজি চাষীরা উপযুক্ত মূল্য পেলে উৎপাদন বৃদ্ধি করবে।  যা দেশীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন সম্ভব হবে।
অর্থাৎ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনে পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে। তাহলে ধান চাষীরাও যেমন মূল্যের অভাবে সংকটে পড়বে না, তেমনি পেঁয়াজ, মরিচের মত নিত্যপণ্যের সংকটে পড়ে ভোক্তাদের গলাকাটা যাবে না। সরকার এ বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে নিয়ে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিবেন-এটাই দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।   
লেখক : প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮