ভালবাসার জন্য

ভালবাসার জন্য

আতাউর রহমান মিটন :‘ভালবাসার জন্য হাতের মুঠোয় নিয়েছি প্রাণ, বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি একশো আটটা নীল পদ্ম, ....’- যৌবনে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতাটির এই লাইনগুলো কেউ পড়েনি বা শোনেনি এমন যুবক বোধ হয় পাওয়া কঠিন। সবারই জীবনে প্রেম আসে। সবাই প্রেমে পড়ে। প্রেম পবিত্র, প্রেম শাশ্বত। খেলায় গোল থাকতে পারে কিন্তু প্রেমের বোধহয় কোন গোল থাকে না। পরিণতি পায় না বলেইবোধ হয় প্রেম এত মহৎ! বিশ্বের শ্রেষ্ঠ যে প্রেমের গল্পগুলো আমরা জানি যেমন রোমিও-জুলিয়েট, শিরী-ফরহাদ, লাইলী-মজনু কিংবা দেবদাস-পার্বতী - এগুলো সবই পরিণতি না পাওয়া প্রেমের গল্প। যে প্রেম পরিণতি পেয়েছে তা আমরা মনেও রাখি না, আমাদের তা জানাও নেই। প্রেমের ছ্যাঁকা খাওয়ার এই বৈশিষ্ট্যটাই প্রেমকে মনে হয় অমরত্ব দিয়েছে।
আগামীকাল ১৪ ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব ভালবাসা দিবস। ভালবাসা কোন আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটা কোন দিবসের আয়েশী আয়োজন নয়। ভালবাসা হলো নিঃশ্বাসের মত, মাছের জন্য যেমন পানি। ওটা না থাকলে প্রাণ থাকে না! তবু দিবস বলে কথা! ভালবাসা দিবসে তাই আমি দৈনিক করতোয়ার সকল পাঠক, শুভানুধ্যায়ী এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে ভালবাসা জানাই। আপনাদের হৃদয় কানায় কানায় ভালবাসায় পূর্ণ হয়ে উঠুক, প্রেমের জোসনায় আপনাদের হৃদয় ¯œাত হোক, ভালবাসার জোয়ারে পরিপূর্ণ হোক জীবন। ¯্রষ্টার কাছে প্রার্থনা আমরা যেন সত্যিকারের ভালবাসতে শিখি। আমাদের প্রত্যেকেরই হৃদয় যেন ভালবাসার সাম্রাজ্য হয়ে ওঠে। ফুলের সুবাসে পরাজিত হোক ঘৃণা। সর্বস্তরে ভালবাসা ও শ্রদ্ধায় একটা ফুলেল সমাজ গড়ে উঠুক সেটাই আমার ভালবাসা দিবসের কামনা।
যদিও প্রেমিক হৃদয় মাত্রই পরিণতি চায়। ছ্যাঁকা খেতে কারোরই ইচ্ছা করেনা তবুও বেশিরভাগ মানুষের জীবনে ছ্যাঁকা খাওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে। মানুষ প্রেমে পড়ে পরিণতি লাভের আশায় কিন্তু শেষ করে বিচ্ছেদে। বিচ্ছেদের এই বিরহ যাতনা সত্ত্বেও যুগে যুগে প্রেম ছিল, আজও আছে এবং আগামীতে থাকবে। প্রেম মরে না, ক্ষয় হয় না, প্রেম ভেসে বেড়ায় বাতাসে। কেউ সেটা অনুভব করে, কেউ করে না। লোকে সে কারণেই বলেন, প্রেমের মরা জ্বলে ডোবে না! অভিজ্ঞতা বলে, প্রেমহীন জীবনে দুজন এক ঘরে থাকলেও শান্তি মেলে না। সেজন্যই প্রেমিক হৃদয় চন্দ্রভূক অমাবস্যার রাতেও শ্মশানের পাড়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে দু’হাত বাড়িয়ে বলে, ভালবাসা দাও আমায়, ভালবাসা দাও! বিরহের আগুনে জ্বলে পুড়ে, মরতে মরতে তবু একটুখানি ভালবাসা খুঁজে বেড়ায় এই ব্যাকুল হৃদয়। হে ঈশ্বর, আমায় প্রেমে পূর্ণ করে দাও। আমি ওর হাত ধরে পাড়ি দিতে চাই সাত সমুদ্র, ঠাঁই নিতে চাই কোন এক গহিন বনে। স্বপ্ন বুনে সাজাতে চাই এক আরামের সংসার। বনের গাছ, সাপ, পাখি, ময়ূর আর বাঘের সাথে মিতালী করে কাটিয়ে দিতে চাই এই ছোট্ট জীবন! প্রেমে ও ভালাবাসায়।
কেউ কেউ বলেন, প্রযুক্তি সহজলভ্যতার এই যুগে প্রেম এখন সস্তা। প্রেম যেন এখন পাতলা এক কাঁচের দেয়াল, ঠুনকো আঘাতেই যা ভেঙে গুড়ো গুড়ো হয়ে যায়। অপরদিকে, প্রেমিক হৃদয় বিশ্বাস করে, ‘অল ইজ ফেয়ার ইন লাভ এন্ড পলিটিক্স! অর্থাৎ ভালবাসা এবং রাজনীতিতে সবকিছুই নির্দোষ। প্রেম কোন অপরাধ নয়। ঘৃণা আমাদের অন্ধকারে টেনে নিয়ে যায়, আর ভালবাসা আমাদের ভাসায়। যে ভালবাসতে জানে সে সবকিছুতেই ভালবাসার সৌরভ ছড়ায়। ঘৃণা হলো একধরনের বিষ। ভালবাসা না ঘৃণা আমরা কোনটা পেতে চাই? ঘরে ও বাইরে সর্বত্র ভালবাসায় জয় হোক। ভালবাসা ফিরে আসুক আমাদের সকলের হৃদয়ে। ফুলের উপর মৌমাছিরা যে বিশ্বাসে, যে আশ্বাসে বারে বারে ফিরে ফিরে আসে সেই সুখ আমাদেরও ঘিরে থাকুক আজীবন। প্রেমের বৃষ্টি আমাদের মরুময় জীবনকে একটুখানি ভিজিয়ে দিক, এখানেও সবুজের চাষ হোক, ফুলে-ফুলে প্রস্ফুটিত হোক সকলের জীবন। আর কিছু না হোক, কেউ অন্ততঃ জিজ্ঞেস করুক, তোমার মনটা এত খারাপ কেন! সবাই যেন বলতে পারি ‘... দোহাই তোদের একটুকু চুপ কর, ভালবাসিবারে দে আমারে অবসর’।
আগামীকাল ১৪ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে যে ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’ পালিত হচ্ছে তা মূলতঃ একটি পশ্চিমা রেওয়াজ। তবে আরেকটি কারণে আমাদের দেশে এই দিবস প্রাণময় হয় তা হচ্ছে ফাল্গুন মাস। আমাদের সংস্কৃতি ও জাতীয় জীবনে ফাগুন হলো বসন্তের আগুন ঝরানো মাস। আবহমানকাল থেকে ফাগুন মাসকে ঘিরে বসন্তের বাসন্তি আমেজে আমাদের সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে। ১লা ফাল্গুনের বসন্তের উতাল হাওয়ায় মাতাল হওয়া হৃদয়ের রঙ এসে মিশেছে আমাদের হৃদয়ে। উৎসব প্রিয় বাঙালি আজ তাই আনন্দে আত্মহারা। প্রাণের উচ্ছ্বাসে নেচে ওঠা মন যেন গলা ছেড়ে গাইছে, ‘হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে, মন ময়ূরের মত নাচে রে’!!
প্রেম কিন্তু কেবলমাত্র একটি নারী ও পুরুষের মধ্যেকার সম্পর্কের বিষয় নয়। প্রেম সর্বজনীন। দেশের সাথে, দেশের মানুষের সাথেও আমাদের প্রেম থাকে, প্রেম হয়ে যায়। দেশের জন্য সেই ভালবাসা, মানুষের জন্য সেই প্রেমের কারণেই আমরা বুক্রে রক্তে রাজপথে আলপনা আঁকতে পারি। আমরা ভাষার জন্য প্রাণ দেই। আমরা দেশের জন্য যুদ্ধ করি। আমরা একটি গোলাপের জন্য হাতে অস্ত্র ধরি। যখনই মানুষের মুক্তির ডাক আসে, সেই ডাক উপেক্ষা  করে না দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হৃদয়। যেমন পারেনি আমাদের শহীদ জয়নাল, মোজাম্মেল, কাঞ্চন ও দিপালী সাহাসহ অনেকে। মানুষের জন্য ভালবাসার টানেই ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এদেশের ছাত্র আন্দোলনের গর্বিত এই সদস্যরা এরশাদ সরকারের সামরিক আইন বাতিল এবং গণবিরোধী শিক্ষানীতি বাতিলের জন্য নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মিছিল করতে গিয়েছিলেন। সেই মিছিলে গুলি চালিয়ে পুলিশ তাদের হত্যা করে, আহত হয় আরও অনেকে। আর আজও সেই কারণে আমাদের সংগ্রামী যুব সমাজ ১৪ ফেব্রুয়ারিকে  ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।
বাংলাদেশের মানুষকে বলা হয় ‘আবেগপ্রবণ’। আমার তো মনে হয় আমরা ‘ভালবাসাপ্রবণ’। আমরা ভালবাসতে জানি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, শত্রুর তাক করা বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা হাসতে হাসতে মৃত্যুকে বরণ করতে পারি। আমাদের কাছে প্রেম একটি আমানত। এই প্রেমের সুরক্ষা দিতে যে কোন ত্যাগ স্বীকারে আমরা প্রস্তুত। ভালবাসার জন্য, দেশ ও দেশের মানুষের জন্য তাই আমাদের আজও সংগ্রামের পথে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে থাকতে হচ্ছে। ব্যক্তির বদল হলেই যে ব্যবস্থার বদল হয় না সেটা আমরা বুঝেছি। গণতন্ত্রের জন্য আমাদের আজও লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। আমরা মানুষের ভোটের অধিকার সুরক্ষার জন্য আজও সংগ্রাম করে চলেছি। জানি না আরও কতকাল আমাদের সংগ্রামটা চালিয়ে যেতে হবে।
বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধির সূচকে ভাল করছে। দেশের আয় বাড়ছে। মানুষ খুব পরিশ্রম করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এত কষ্ট, এত পরিশ্রমের ফল ভোগ করছে দেশের সামান্য কিছু মানুষ, কয়েকটি বড় বড় কোম্পানি। ফলে ‘কেউ খাবে তো কেউ খাবে না’ বঞ্চনার বুক থেকে উঠে আসা এই শ্লোগানটা এখনও প্রাসঙ্গিক। আমরা এখনও সে কারণেই অথনৈতিক মুক্তির জন্য সংগ্রাম করে চলেছি। আমরা সমতা চাই। আমরা বাস্তবতার কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো সবার জন্য  সহজ দেখতে চাই। সমাজের কেবল মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী নয়, বরং দেশের আপামর সাধারণ মানুষ যেন মনের আনন্দে পেখম তুলে নাচতে পারে, সেই রকম একটা শাসন ব্যবস্থা চাই। সমতা ও ন্যায্যতার শাসন সর্বত্র নিশ্চিত করতে চাই আমরা সবার জন্য নিরাপদ ও আনন্দময় ভবিষ্যত গড়ে তোলার অঙ্গীকার চাই। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে ব্যর্থ হলে আমরা মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আত্মার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে পারব না।
আমরা নিরাপদে থাকতে চাই। সমাজের মধ্যে ভালবাসার বাগানকে আরও সুন্দর করে সাজানোর মাধ্যমে আমরা সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানাই। সমাজে ভালবাসার চাষ বাড়াতে হবে ভাই। এর কোন বিকল্প নাই। মানুষে মানুষে ঘৃণার সম্পর্ক বেড়ে গেলে আমাদের সমাজ আরও আলগা হয়ে যাবে। সমাজে অপরাধ প্রবণতা উৎসাহিত হবে। ন্যায় বিচার নিশ্চিত করে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা আরো বাড়াতে হবে। সামাজিক অনুশাসন বৃদ্ধি করতে হবে ভালবাসার অটুট বন্ধনে। ঘৃণা ও হিংসার শাসন দিয়ে আমরা সুন্দর আগামী গড়ে তুলতে পারব না। আমাদের রাজনীতিতেও ভালবাসা ও শ্রদ্ধার বন্ধন ফিরিয়ে আনতে হবে। রাজনীতিবিদদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, একটা পরিমিতিবোধ, যুক্তিসঙ্গত ভাষার ব্যবহার এবং পরস্পরকে সহ্য করার অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে হবে। হিংসার বশবর্তি হয়ে কাউকে ধ্বংস করার হীন খেলায় মত্ত হওয়াটা আমাদের চাওয়া নয়। আমরা চাই আমাদের সরকার সকলের শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চিত করবেন। দলবাজ, দুর্নীতিবাজ, দখলবাজদের দৌরাত্ম নিয়ন্ত্রণ করে সরকার জনগণের ভালবাসা জয় করে নেবে সেটাই সকলের চাওয়া।
আমরা আরও চাই, সরকারী ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। সরকারের টাকা মানে জনগণের টাকা। এই টাকার ব্যবহারে ভালবাসা থাকতে হবে। ভালেবেসে কাজ করলে ব্যয় না বাড়িয়ে জনগণের কল্যাণে ভাল ভাল উদ্যোগ নেয়া যায়। আমি বলছি না ব্যয় বাড়ানো যাবে না। ব্যয় বাড়লে সমস্যা নাই কিন্তু তা যেন জনগণের উপকারে হয়। সামনে উপজেলা নির্বাচন। এবারের উপজেলা নির্বাচনের বাজেট ধরা হয়েছে ৯১০ কোটি টাকা। নির্বাচন কমিশনের করা এই বাজেটের সিংহ ভাগ ব্যয় ধরা হয়েছে নির্বাচনে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন পরিচালনা বাবদ। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ৭৪০ কোটি টাকা। আর ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম পরিচালনা ও প্রশিক্ষণের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭০ কোটি টাকা। সূত্র মতে, এর আগে ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল ৪০০ কোটি টাকার মত। সেই বিবেচনায় এবারের ব্যয় ধরা হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। জানাগেছে, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত কর্মকর্তাগণ প্রত্যেকেই এবার গতবারের তুলনায় ১ হাজার টাকা করে বেশি পাবেন। বলা বাহুল্য, টাকা পেতে সকলেই ভালবাসেন। কিন্তু জনগণের এই টাকা নিয়ে জনগণকে ভালবেসে সবাই সততা ও নিষ্ঠার সাথে নিজেদের দায়িত্ব পালন করবেন কিনা সেটা নিয়ে সংশয় আছে।
আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। সকলের ভোটাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাই। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিবর্গ জনগণের টাকা নিয়ে কোন একটি দল বা গোষ্ঠীর পক্ষে কাজ করবে এমন অভিযোগ আমরা শুনতে চাইনা। এটা জনগণের প্রতি ভালবাসার নিদর্শন নয়। জনগণকে সত্যিকারের ভালবাসলে তাদের কথা হৃদয় দিয়ে শুনুন, তাদের জন্য কাজ করুন। দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে লাল কাপড় বাঁধতে হবে না। আপনাদের ভাল কাজের জন্য জনগণ স্বপ্রণোদিত আপনাদেরকে হৃদয়ে আসীন করবে। জয় হোক ভালাবাসার!
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭১১-৫২৬৯৭৯