ভাবতে হবে শিক্ষার মান নিয়েও

ভাবতে হবে শিক্ষার মান নিয়েও

মোহাম্মদ নজাবত আলী : শিক্ষা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও সম্ভাবনাকে জাগ্রত করে। শিক্ষার আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে মানবিকতা ও মনুষ্যত্ব অর্জন করা। যুগে যুগে শিক্ষা সম্পর্কে প্রাচীন মনীষীরা যা বলেছেন তার সঙ্গে বর্তমানে আরও কিছু যুক্ত হয়েছে। শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানবিক মূল্যবোধ চরিত্র গঠনের পাশাপাশি যে কোনো প্রতিযেগিতায় অংশগ্রহণ ও টিকে থাকার মতো সৃজনশীলতা মেধা এবং যোগ্যতা অর্জন। শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন থেকে সামনের দিকে এগিয়ে চলা। তা না হলে সে শিক্ষা কখনো সোনা ফলাতে পারবে না।  

ইতিমধ্যে জেএসসি, জেডিসি, পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এবারের পরীক্ষায় ২৬ লাখ ৬১ হাজার পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে। এরপর শুরু হয়েছে পিইসি পরীক্ষা। এই পরীক্ষাগুলো নিয়েও রয়েছে নানা ধরনের সমালোচনা। বিশেষ করে পিইসি পরীক্ষা নিয়ে। যে কোনো স্তরের পরীক্ষাতে যারা অংশগ্রহণ করে তারা সবাই, শিক্ষক ও অভিভাবকগণ প্রত্যাশা করে তারা পাশ করুক। শুধু পাশই নয় ভাল ফল অর্জন করুক। যদিও পিইসি পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিজ্ঞমহলে প্রশ্ন ও বিতর্ক রয়েছে। এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য হয়তো জেএসসি পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু পিইসি কেন? পিইসির কথা বাদ দিলাম। কিন্তু জেএসএসি, জেডিসি পরীক্ষায় যেভাবে প্রায় সবাই পাস করছে তাতে শিক্ষার মান বাড়ছে কি? এ প্রশ্ন থেকেই যায়। পাসের হার বাড়ছে এতে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার মান বাড়ছে কিনা সেটাও যাচাই-বাছাই কারা দরকার নয় কী?

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। স্বাধীনতার ৪৮ বছরে বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগোচ্ছে, এগিয়ে যাক। বাংলাদেশে পড়ালেখার প্রতি পিতা-মাতা অভিভাবক ও ছেলে-মেয়েদের এই আগ্রহ সৃষ্টিতে শেখ হাসিনা সরকার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য অনুসরণীয়। বিনামূল্যে পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেয়া, উপবৃত্তি, নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত  ও ফলপ্রকাশ ইত্যাদি শিক্ষা ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সম্প্রতি ২৭৩০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিও প্রদান এবং এ ধারা অব্যাহত থাকবে। এ বিষয়গুলো অবশ্যই শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের আশান্বিত করে।   আমাদের পাশ করা জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরা কি কিছুই অর্জন করতে পারছে না, পারছে। শুধু এমসিকিউ প্রশ্ন দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর মেধা যাচাই কতটা সঠিক তা ভেবে দেখার বিষয়। আবার বর্তমান পাশকৃত শিক্ষা ব্যবস্থায় যে একজন শিক্ষার্থী প্রকৃত মেধার বিকাশ ঘটছে কি না সেটাও দেখার বিষয়। অভিযোগ উঠেছে খাতায় বেশি নম্বর, না দিলে সে পরীক্ষককে জবাবদিহি করতে হয়। যদি বিষয়টি সত্য হয়ে থাকে তাহলে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় মেধার বিকাশ যেমন বাধাগ্রস্ত হবে তেমনি শিক্ষার  গুনগত মান নিয়েও বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠবে। একটি বিষয় লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বিগত কয়েক বছর থেকে পাবলিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা ভালো রেজাল্ট করছে। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। পাশের হারও প্রায় শতভাগ। শিক্ষার উন্নতি হচ্ছে বলেই ছেলে-মেয়েরা ভালো ফল করছে। আবার অনেক শিক্ষাবিদ বুদ্ধিজীবী মহল থেকে তাঁর বিপরীত কথা শোনা যায়। মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন হচ্ছে না। শিক্ষার মান বাড়ছে না। বর্তমান প্রতিযোগিতায় তারা টিকে থাকতে পারছে না। এর প্রধান কারণ কি পাশের রেকর্ড ? বিষয়টি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিচার বিশ্লেষণ করে দেখা উচিত।

প্রতি পাবলিক পরীক্ষায় ফল প্রকাশিত হলে পাশের রেকর্ড দেখে আমরা উৎফুল্ল হই। ভাবি দেশে যত ছেলে পাশ করছে ততই শিক্ষাই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটি বিষয় আমরা আমলে নেই না  যে, পাশ মানেই শিক্ষার মানোন্নয়ন, মেধার বিকাশ এক নয়। এ প্রসঙ্গে বাংলা সাহিত্যে বিদগ্ধ লেখক প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, পাশ করা ও শিক্ষিত হওয়া এক বস্তু নয়। অথচ তা আমরা স্বীকার করতে চাইনা বলে আজ শিক্ষার মান নিয়ে এত অভিযোগ। প্রমথ চৌধুরী প্রায় ৫৫বছর আগে এ কথাটি বলে গেছেন । আসলে পাশ করা ও শিক্ষিত হওয়ার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। পাশ করলেই যে একজন শিক্ষার্থী প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হলো, মানুষ হওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জন করলো মেধার বিকাশ ঘটলো এমনটি ভাববার কোনো কারণ নেই। দীর্ঘদিন থেকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে উল্টো স্রোত বইছে, মুখস্থ নির্ভর শিক্ষা থেকে বেড়িয়ে আসতে সরকার এক যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করলেন তা আজ নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। শিক্ষা কোনো বাণিজ্যিক বিষয় নয়। অথচ কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তার মধ্যে কোচিং যা শিক্ষাকে বাণিজ্যকরণ  করেছে। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে কোচিং করলে ভর্তির নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হলে কোচিং করতে হবে এরকম নানা লোভনীয় কথা বলে  শিক্ষার্থীর মগজ ধোলাই করা হচ্ছে। কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কোচিং সেন্টার। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো কোচিংও প্রকৃত পক্ষে শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশের অন্তরায়। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীকে অবশ্যই শ্রেণী ও মূলবই মুখী হতে হবে। কিন্তু তারা কোচিং সেন্টারে গিয়ে স্যারদের দেয়া নোটগুলো মুখস্ত করে তা হজম করতে পারছে না। মুল বই থেকে তারা অনেক দুরে থাকছে। শিক্ষার মানোন্নয়ন মেধার বিকাশ ঘটাতে হলে কোচিং অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। বাজারে প্রচলিত নোট গাইড বন্ধ করতে হবে যা এর আগে আমি কয়েকটি লেখায় উল্লেখ করেছি।

আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয় হচ্ছে শিক্ষার মুল ভিত্তি। কাজেই শিক্ষার গোড়া আমাদের মজবুত করতে হবে। সরকারের এক হিসেব মতে প্রায় ২কোটি ছেলে মেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছে। নতুন শিক্ষা  নীতিতে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীত করার কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কি দেশের প্রতিটি প্রাইমারী স্কুলের খেলার মাঠ, পরিবেশ পরিস্থিতি অবকাঠামো কি এক রকম? অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে যেখানে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার সুন্দর পরিবেশ নেই। শ্রেণী কক্ষ সংকট সহ বিভিন্ন সমস্যা। খেলার মাঠ নেই উপরোন্ত কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাবলিক(পিএসসি) পরীক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ। ৮-১০বছর বয়সের একজন শিক্ষার্থী যে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে যাচ্ছে তা প্রকৃতপক্ষে মেধা যাচাইয়ের ক্ষেত্র নয়। এমন অভিযোগও রয়েছে। এ বয়সের ছেলেমেয়েরা যেখানে বিদ্যালয় ও চারিপাশের পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে চলতে ও আনন্দ ঘন পরিবেশে শিক্ষালাভ করতে পারছে না সেখানে পাবলিক পরীক্ষায় তাদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বিশেষ করে পাঠ্য বইয়ে নতুন নতুন বিষয় যুক্ত করা হয়েছে যা শিশুরা ভালোভাবে আত্মস্থ করতে পারছে না।

 ফলে পাবলিক পরীক্ষায় পাশের পর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে অনেক শিক্ষার্থী ভালো করে ইংরেজি বা বাংলা পড়তে পারে না। তাহলে আমরা কাকে দায়ী করবো। শিক্ষক, ছাত্র না কাকে ? সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাবলিক পরীক্ষা এতটা জরুরি নয় বলে অনেক বিজ্ঞ মহল মনে করেন। শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নত রাষ্ট্রের পদ্ধতি চালু করলে তার সুফল কিন্তু আমরা পুরোপুরি পাচ্ছি না। পিএসসি বা জেএসসি, জেডিসি পরীক্ষায় একই অবস্থা। পরীক্ষা ভীতি, অতিরিক্ত সিলেবাসের বোঝা শিক্ষার্থীদের কাবু করছে। শিক্ষার্থীদের চাপ বেড়েছে। নতুন নতুন বিভিন্ন বিষয় তথ্য সন্নিবেশিত করা হয়েছে প্রায় প্রতিটি বইয়ে। কিশোর বয়সী একজন শিক্ষার্থী ভালো করে বিষয়গুলো আয়ত্ব করার আগেই পাবলিক পরীক্ষায় তাকে অবতীর্ণ হতে হচ্ছে। তাছাড়া প্রতিটি বিষয়ে উত্তরের জন্য যে বহু নির্বাচনী প্রশ্নের ব্যবস্থা করা হয়েছে তা অনেকটা ত্র“টি যুক্ত। ৪টি অপশনের মধ্যে শিক্ষার্থী মনগড়াভাবে উত্তর দিলেই কয়েকটি যে শুদ্ধ হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান বিশ্বায়নের যুগ। আর শিক্ষার দিক থেকে বলা হচ্ছে ডিজিটাল। ডিজিটাল তথ্য প্রযুক্তির দিক থেকে দেশ এগিয়ে চলেছে । তবে এ যুগের শিক্ষার মান নিয়ে পিছিয়ে পড়ে থাকবো কেন ? আমাদের এগিয়ে যেতে হবে সামনের দিকে। জ্ঞান, মেধা ভিত্তিক সমাজ গঠনই আমাদের লক্ষ্য। এ লক্ষ্য পূরণে অবশ্যই সরকারকে শিক্ষা ব্যবস্থায় যে নানা ধরনের ত্র“টি বিচ্যুতি অনিয়ম, জালিয়াতি চলছে তা বন্ধ করতে হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের উপযোগী করে আমাদের সন্তানদের গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা এমন একটি বিষয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জাতির ভবিষ্যৎ। কেউ দুর্ণীতি বা কোনো অপরাধ করলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সে ব্যক্তির ওপর। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মান মর্যাদা প্রশ্ন জড়িত। কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে নানা অনিয়মের প্রভাব পড়ে গোটা রাষ্ট্রের ওপর। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করতে হবে।

 এজন্য শিক্ষা ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা তারা যদি জীবনের শুরুতেই গুনগত পড়ালেখার মাধ্যমে তাদের জ্ঞানের ভিত্তিটা মজবুত ও দৃঢ় করতে না পারে তাহলে দেশের জন্য ভবিষ্যতে কী কাজে লাগবে এমন প্রশ্ন থেকেই যায়। কাজেই পরীক্ষায় পাসের হার বাড়ানোর পিছনে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের যেমন নানামুখী উদ্যোগ রয়েছে, তেমনি মানের ব্যপারেও নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। ভাবতে হবে শিক্ষার মান নিয়েও। তবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিভিন্ন সমস্যা থাকা সত্ত্বেও যে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পাস করছে তাদের মধ্যে যে মেধাবী বা যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষার্থী নেই এমনটি বলা ঠিক হবে না। তবে এমসিকিউ প্রশ্ন দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর মেধা যাচাই করা যাবে না। তবে একজন শিক্ষার্থীর মানসিক চিন্তা শক্তির যথার্থ স্ফুরণ ঘটছে কি না সেটাই বিশ্লেষণের বিষয়।
লেখক ঃ শিক্ষক ও কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১