বড় জয় বড় দায়

বড় জয় বড় দায়

মোহাম্মদ নজাবত আলী : ডিসেম্বর মাস বিজয়ের মাস। এ মাসের ৩০ তারিখে অনুষ্ঠিত হল বহুল আলোচিত ও গুরুত্ব পূর্ণ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তনের মূল পদ্ধতি হচ্ছে নির্বাচন। নির্বাচন ছাড়া সরকার পরিবর্তনের কোনো বিকল্প পথ নেই। সংবিধান মোতাবেক বৈধভাবে নির্বাচন হচ্ছে সরকার পরিবর্তনের এক মাত্র পথ। ৫ বছর মেয়াদ শেষে সে নির্বাচনে কিছু অনিয়ম ও বিচ্ছিন্ন ঘটনায় মহাজোটের  মহা বিজয় হয়েছে।
ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ ৪৬ বছর পাড়ি দিয়েছে। এ দীর্ঘ সময় আমাদের অর্জন অনেক । বেশ কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য রয়েছে। অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশ বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। নানা ঘাত, প্রতিঘাত, রাজনৈতিক হানাহানি, বিশ্বাস অবিশ্বাসের মধ্যে ও বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ধরে রাখা একেবারে হালকা করে দেখার বিষয় নয়। প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হওয়ায় জনগণের মাথা পিছু আয় বেড়েছে। মানুষের জীবন যাত্রার মান বেড়েছে বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্য আয় থেকে মধ্য আয়ের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। দারিদ্র হ্রাস পেয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, শিক্ষার হার বাড়ছে। নারী শিক্ষার প্রসার ঘটছে, কৃষি উৎপাদন বেড়েছে ও তথ্য প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে। আর্থিক ও সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ এখন অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে। এ সবই সম্ভব হয়েছে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে। বাংলাদেশ কখনো কোন কালে রাজনৈতিক বিবাদ ছাড়া রাজনীতি চলেনি। যখন যে দল বা জোটই ক্ষমতায় এসেছে নানা দ্বন্দ্ব সংঘাতে, ঝগড়া বিবাদ রাজনৈতিক হানাহানিতে শাসক দলকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়েছে। এরকম নানা প্রতিকুলতার মাঝেও বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচকে বিশ্ববাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছে। বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সন্ত্রাস ও দুর্নীতি। তাই সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সর্বক্ষেত্রে সুশাসন ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই আমাদের মূল লক্ষ্য। কারণ মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল শোষণ মুক্ত সমাজ সমতা ভিত্তিক অর্থনৈতিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। অসাম্প্রদায়িক, ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। এ ক্ষেত্রে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক চেষ্টা ও নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। চতুর্থ বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় দেশবাসীর প্রত্যাশা সে প্রচেষ্টা আরো বেগবান হবে।
রাজনীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশের উন্নয়ন ও জন কল্যাণ। তৃতীয় বিশ্বে রাজনীতি জনকল্যাণমুখী। আর জনকল্যাণ ভিত্তিক রাজনীতি মানেই আদর্শ ভিত্তিক রাজনীতি। রাজনীতিতে আদর্শ না থাকলে সেই রাজনীতি দিয়ে জনগণের  কাঙ্খিত কল্যাণ যেমন কঠিন তেমনি জনগণের আস্থা অর্জন ও কঠিন। সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, গণতন্ত্র এ শব্দগুলো আজ একাকার হয়ে গেছে। তবে দেশের উন্নয়নের গণতন্ত্রের একটা বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। অর্থাৎ গণতন্ত্র ও উন্নয়ন একই সূত্রে গাথা। বর্তমান সরকার টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থেকে দেশের উন্নয়ন অগ্রগতিতে যথেষ্ট অবদান রেখেছেন এটা নৈরাশ্যবাদীরা ও স্বীকার করবেন। কিন্তু আমাদের দেশে রাজনীতিতে একটা নেতিবাচক সংস্কৃতি চালু রয়েছে। তা হলো, সরকার পরিবর্তন হলে সরকারের অসমাপ্ত কাজ যেমন বন্ধ হয়ে যায় তেমনি সরকারের গৃহিত মহাপরিকল্পনা, উন্নয়নের বিভিন্ন প্রকল্পগুলো আর বাস্তবায়িত হয়না। কিন্তু সৌভাগ্য যে সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশবাসী আবারো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব ভার অর্পণ করেন। ১৬ কোটি মানুষের নেতা নির্বাচিত করেন। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু আছে তা শত ভাগ স্বচ্ছ বলা যাবে না। তবুও যে গণতন্ত্রের উপর রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে তাকে আরও কিভাবে পরিশীলিত করা যায় কিভাবে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটানো যায় সেটাই বড় প্রশ্ন। কেননা একটি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক শাসন ব্যবস্থায় সর্বক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুশাসন নিশ্চিত করতে সৎ যোগ্য নেতৃত্বকে নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাররা বেছে নিয়েছে।
আওয়ামীলীগের এ বড় জয়কে ধরে রাখতে হবে। জনরায়ের প্রতি সম্মান জানাতে হবে। এ মহা বিজয়ের জনগণের প্রতি সরকারের দায় আরো বেড়ে গেল তাই জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে অবশ্যয় হতে হবে জনবান্ধব ও আন্তরিক। কর্তৃত্ববাদী নয় বরং সর্ব ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার, সুশাসন, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশ এগিয়ে নিতে হবে। সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ সন্ত্রাস, দুর্নীতি, মাদক,বেকারত্ব। এই বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্বারোপ করে তা সমাধানে দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে সরকারের প্রধান কাজ। দলীয়নেতা কর্মীদের অহমিকা বোধ পরিত্যাগ করে অন্যান্য রাজনৈতিক দল গুলোকে আস্থায় ফিরাতে হবে। হিংসা বিদ্বেষ, হানাহানি, প্রতিহিংসা, অতিকথনের রাজনীতি ইতি টেনে এক নতুন ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু হোক বাংলাদেশে। যে রাজনীতির মূল লক্ষ্য হবে সকলের উদ্যোগ ও সমন্বিত প্রচেষ্টায় দেশকে এগিয়ে নেওয়া।
গণতন্ত্রকে শক্তিশালী টেকসই করতে গেলে সুষ্ঠু নির্বাচনের কোন বিকল্প নেই। এমন ধরনের সুষ্ঠু নির্বাচন প্রয়োজন যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা সমান সুযোগ সুবিধা পাবে যাকে বলা হয় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। সবার ক্ষেত্রে সমান সুযোগের মাধ্যমে একটি অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম দিক। এখানে নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কারণ নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হল একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন জাতিকে উপহার দেওয়া। মূলত নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতহীন আচরণই গণতন্ত্রকে টেকসই করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জনে সক্ষম। তবে এবারের নির্বাচনের আগে থেকেই বিরোধী পক্ষ অনেক অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টিগোচর করেন। নির্বাচন কমিশন তা আমলে নেয় ও কিছু কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করে। তবে অপ্রিয় হলেও সত্য যে এবারের নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতা না হলে ও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনায় বেশ কয়েক জনের প্রাণহানি ঘটে যা খুব দুঃখজনক। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হওয়ায় ও একই সাথে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলে ও দেশ-বিদেশী বিভিন্ন নির্বাচনী পর্যবেক্ষক এবং সংস্থা নির্বাচন অনেকটা সুষ্ঠু হয়েছে বলে তাদের প্রতিক্রিয়া জানান।
জনগণ ভোটের মাধ্যমে শতভাগ তাদের আশা আকাঙ্খার প্রতিফলন না ঘটলেও একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়েছে এটা জাতির জন্য মঙ্গলজনক।
লেখক ঃ শিক্ষক ও কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১