ব্রেক্সিট ঘূর্ণিঝড়ে বৃটিশ রাজনীতি

ব্রেক্সিট ঘূর্ণিঝড়ে বৃটিশ রাজনীতি

রায়হান আহমেদ তপাদার : এতদিন অভিবাসন বিষয়ে ইইউ’র যেসব নীতিমালা ছিল সেগুলো মানতে হতো তাকে। ব্রিটেনে কর্মরত ইউরোপের অন্যান্য দেশের অভিবাসীদের সম্পর্কে বিরূপ মনোভাবের কারণেই অনেকে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। ঐ সব নাগরিকেরা তাদের কাজ দখল করে নিচ্ছে বলে তাদের অনেকেই অপছন্দ করেন। কিন্তু ব্রিটিশরাও ইইউভুক্ত দেশে কাজ করছেন।তাদের জন্যেও তৈরি হবে অনিশ্চয়তা। দুই পাশের যাতায়াত ভিসা আর কাজের পার্মিট পাওয়ার বিষয়টির কারণে তা সময় সাপেক্ষ হয়ে যাবে। হঠাৎ করে বদলে যাবে বহু অভিবাসীর জীবন। কিন্তু আবার ব্রিটিশদের অনেকেই সেখানে বসবাসরত অন্যান্য দেশের অভিবাসী যেমন এশিয়া বা আফ্রিকার দেশের অভিবাসী বিরোধী। লন্ডনের বার্কিং অ্যান্ড ডাগেনহ্যাম কাউন্সিলের কাউন্সিলর এবং লন্ডনে বাঙালি কমিউনিটির একজন নেতা সৈয়দ ফিরোজ গনি বলছেন, একটা অনিশ্চয়তা রয়েছে সেখানকার সকল অভিবাসীদের উপরও। ব্রিটেনের পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট চুক্তি বাতিল হওয়ায় হতাশ অনেক ইউরোপীয় দেশ। এর মধ্যে অনেক দেশই বলছে, তারা এই চুক্তি নিয়ে ব্রিটেনের সঙ্গে আলোচনা করতে রাজি নয়। জার্মানির মতো দেশ এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছে টেরেসা মের সঙ্গে যে খসড়া চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেটাই সবচেয়ে ভালো সমাধান। কারণ এর আওতায় পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ব্যবসাকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য অন্তর্র্বতীকালীন সময় দেওয়া হবে। তার পরও কথা থেকে যায়। এখন কী করবেন টেরেসা মে? ব্রিটেনই বা যাবে কোন পথে? হাউস অব কমনসে ব্রেক্সিট চুক্তিটি বাতিল হওয়ায় এখন অনেক সম্ভাবনার জন্ম হয়েছে।
যেহেতু ইইউভুক্ত দেশগুলো আর চাচ্ছে না ব্রেক্সিট নিয়ে আবার ব্রিটেনের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা, সেহেতু কোনো ধরনের চুক্তি ছাড়াই অনেকটা অগোছালোভাবে ২৯ মার্চ ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে যাবে। এতে ব্রিটেন অনেক সমস্যার মধ্যে পড়বে। ইইউভুক্ত ২৭টি দেশের সঙ্গে আলাদাভাবে কাস্টমস চুক্তি করতে হবে ব্রিটেনকে। আমদানি-রপ্তানি শুল্ক হার নির্ধারণ করতে হবে। ব্রিটিশ পাউন্ডের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক মুদ্রা ইউরোর মান নতুন করে নির্ধারণ করতে হতে পারে। ব্রিটেনের যেসব নাগরিক এখন ইইউভুক্ত দেশে কাজ করে, কিংবা ইইউর যেসব নাগরিক ব্রিটেনে কাজ করে, তাদের স্ট্যাটাস কী হবে, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন। ইইউর নাগরিকরা ২৭টি দেশের যেকোনো একটি দেশে কোনো ধরনের ওয়ার্ক পারমিট ছাড়াই কাজ করতে পারত, ২৯ মার্চের পর নতুন করে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা দেখা দিতে পারে। পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাজ্যের বড় ট্রেডিং পার্টনার হচ্ছে জার্মানি। যুক্তরাজ্য জার্মানি থেকে আমদানি করে বছরে প্রায় ৮০ বিলিয়ন পাউন্ডের পণ্য এই পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের চেয়ে বেশি।

এখন ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলে আমদানি-রপ্তানিতে এর প্রভাব পড়বে। ব্রিটেনে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যেতে পারে। বলা ভালো, ২০১৭ সালে ব্রিটেন ইইউভুক্ত দেশগুলোতে মোট রপ্তানি করে ২৭৪ বিলিয়ন পাউন্ড। গত ১৫ জানুয়ারি ব্রিটেনের হাউস অব কমনসে ব্রেক্সিট চুক্তি নাকচ হওয়া এবং এর পরপরই আস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মের টিকে যাওয়ার পর যে প্রশ্নটি এখন ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে, তা হচ্ছে ব্রেক্সিটের ভবিষ্যৎ কী? ব্রিটেনের গণভোটে ২০১৬ সালের ২৩ জুন ব্রেক্সিট, অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে আসার পক্ষে রায় পড়েছিল। ওই রায়ে ব্রিটেনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চার দশকের সম্পর্কের অবসান ঘটেছিল। ওই সময় ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কনজারভেটিভ দলের ডেভিড ক্যামেরন। তিনি পদত্যাগ করলে একই দলের টেরেসা মে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দুই বছর ধরে টেরেসা মে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে আসছেন। আইন অনুযায়ী আগামী ২৯ মার্চের মধ্যে ব্রিটেনকে ইইউ ত্যাগের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে হবে। আর এ লক্ষ্যেই ১৫ জানুয়ারি টেরেসা মে পার্লামেন্টে ভোটাভুটির জন্য তাঁর খসড়া চুক্তি উপস্থাপন করেন। এই ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল গত ডিসেম্বরে। কিন্তু টেরেসা মে জানতেন তিনি এই খসড়া চুক্তি পার্লামেন্টে পাস করাতে পারবেন না। এ জন্য তিনি ভোটাভুটি কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি। তাঁর খসড়া চুক্তিটি অনুমোদিত হয়নি। তবে একটা প্লাস পয়েন্ট তাঁর জন্য তাঁর দল এখনো তাঁর ওপর আস্থা রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি রয়ে যাচ্ছেন। এখন ব্রেক্সিটের কী হবে? হাউস অব কমনসে ভোটাভুটিতে দেখা গেছে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট পড়েছে ২০২, আর বিপক্ষে ৪৩২। মোট আসন ৬৫০। ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যে বিভক্তি আছে। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসনের নেতৃত্বে কনজারভেটিভ দের ১১৮ জন এমপি চুক্তির বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন, আর দলের ১৯৬ জন এমপি পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
 
অন্যদিকে ২৪৮ জন লেবার এমপিও প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। প্রস্তাবের বিপক্ষে অন্যান্য দলের ৫৬ জন এমপিও ভোট দিয়েছেন। ফলে এটা স্পষ্ট যে ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে ব্রিটেনের সমাজে বড় ধরনের বিভক্তি রয়েছে। এরই মধ্যে কোনো কোনো মহল থেকে দাবি উঠেছে যে নতুন করে ব্রেক্সিট প্রশ্নে আরেকটি গণভোটের আয়োজন করা হোক। কিন্তু বাস্তবতা হলো ২৯ মার্চের আগে আর নতুন করে আরেকটি গণভোটের আয়োজন করা সম্ভব হবে না। কেননা গণভোটের জন্য নতুন একটি আইন তৈরি করতে হবে এবং বিধি-বিধান তৈরি করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে সময় দিতে হবে। সুতরাং ২৯ মার্চের আগে এটি আয়োজন করা কোনো মতেই সম্ভব নয়। পাঁচ. টেরেসা মে পার্লামেন্টে জিতে গেলেও তিনি ব্রেক্সিট প্রশ্নে জনগণের সমর্থন পাওয়ার আশায় সাধারণ নির্বাচনের ডাক দিতে পারেন। এতে তিনি যদি বিজয়ী হনও, তাতে করে ব্রিটেনের ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে তেমন কোনো পরিবর্তন আনবে না, এমনকি নির্বাচনে তাঁর দল অর্থাৎ কনজারভেটিভ পার্টির হেরে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।


এ ক্ষেত্রে লেবার পার্টি যদি বিজয়ী হয়, তারা ইইউতে পুনঃযোগদানের প্রশ্নে সিদ্ধান্তও নিতে পারে। এতে সংকট আরো বাড়বে। বড় জটিলতা তৈরি হবে। সুতরাং টেরেসা মে আগাম নির্বাচনের দিকে যাবেন বলে মনে হয় না। ছয়. ব্রেক্সিট ভোটের পর একটা বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে স্কটল্যান্ডকে নিয়ে। স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্যের অংশ। ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলে স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে গিয়ে আলাদাভাবে স্বাধীন হতে পারে এবং এরপর ইইউর সঙ্গে থাকতে আবেদন করতে পারে। ব্রেক্সিট গণভোটের সময় স্কটল্যান্ডে যে ভোট হয়েছিল, তাতে ৬২ শতাংশ ভোট পড়েছিল ইইউতে থাকার পক্ষে, আর ৩৮ শতাংশ ভোট দিয়েছিল যুক্তরাজ্যের ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে স্কটল্যান্ডের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতা নিকোলা স্টুরজিওন আবার স্কটল্যান্ডে একটি গণভোটের ডাক দিতে পারেন। এখন মিস স্টুরজিওন কী সিদ্ধান্ত নেন, সেটাই দেখার বিষয়। গত ১৫ জানুয়ারি হাউস অব কমনসে ব্রেক্সিট চুক্তি নাকচ হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। পরিষ্কার করে বোঝা যাচ্ছে না পরিস্থিতি এখন কোন দিকে যাবে। ২৯ মার্চের পর ব্রিটেন যদি সত্যি সত্যিই বেরিয়ে যায়, তাহলে তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পতন ত্বরান্বিত করতে পারে। দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদীরা বিভিন্ন দেশে তাদের অবস্থান এখন আরো শক্তিশালী করবে। ফ্রান্স, গ্রিস, এমনকি ইতালি হচ্ছে পরবর্তী রাষ্ট্র, যারা ব্রিটেনের পথ অনুসরণ করতে পারে। ফ্রান্সের কট্টর দক্ষিণপন্থী নেতা মেরিন লি পেন ও তাঁর দল ন্যাশনাল ফ্রন্ট সেখানে আবারও গণভোটের ডাক দিতে পারে। তাঁর দল ফ্রান্সকে ইইউ থেকে বের করে নিয়ে আসতে চায়। জার্মানিতে দক্ষিণপন্থীরা আরো শক্তিশালী হবে। তারা এই প্রথমবারের মতো জার্মান পার্লামেন্টে গেছে, এরা জার্মানির ইইউ ত্যাগ করার ডাক দিতে পারে। এমনকি ইতালিতেও এই কট্টরপন্থীরা ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর শক্তিশালী হয়েছে। নর্দান লীগ ও এর নেতা ম্যাটিও সালভিনি প্রচ ভাবে ইইউবিরোধী। ইইউর অন্যান্য দেশেও এই দক্ষিণপন্থী উত্থান লক্ষ করার মতো।


 সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে টেরেসা মে যাচ্ছেন। তিনি এরই মধ্যে পার্লামেন্টের সব দলের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। কিন্তু তা কী ফল বয়ে আনবে, তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। ১৯৯৩ সালের ১ নভেম্বর ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার যাত্রা শুরু করেছিল। আজ ২৫ বছর পর সেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্তিত্ব ঝুঁকির মুখে পড়ল। ইইউ নামে এটি যাত্রা শুরু করলেও এর যাত্রা শুরু হয়েছিল আরো আগে ১৯৫৮ সালে। পর্যায়ক্রমে ১৯৬৭ সালে ইউরোপীয় ইকোনমিক কমিশন গঠন, ২০০২ সালে একক মুদ্রা চালু করার মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিশ্ব আসরে আবির্ভূত হয়েছিল। প্রায় ১৯.২০৫ ট্রিলিয়ন ডলারের  যে অর্থনীতি, এই অর্থনীতি ইইউকে বিশ্ব আসরে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, বরং রাজনীতির ক্ষেত্রেও অন্যতম শক্তিতে পরিণত করেছে। এখন ব্রিটেন চূড়ান্তভাবে বেরিয়ে গেলে ইইউর শক্তিকে দুর্বল করবে। আগামী দুই মাস ব্রিটেনের জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি সময়। আস্থা ভোটে টেরেসা মে টিকে গেলেন বটে। কিন্তু এটিই সব কথা নয়। সত্যিকার অর্থেই ব্রিটেনের জন্য ভবিষ্যতে এক কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। সুতরাং বোঝাই যায়, কোনো ধরনের চুক্তি ছাড়া ব্রিটেন বেরিয়ে গেলে ব্রিটেনের আমদানি-রপ্তানি ক্ষেত্রে এর প্রতিক্রিয়া কী হবে। এই চুক্তিতে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটি হল-ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে গেলে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে বসবাসরত ব্রিটিশ নাগরিকদের কী হবে? ব্রিটেন তাদের জন্য একটি সুবিধাজনক চুক্তি করতে চাইছে। এছাড়া বের হয়ে যাওয়ার জন্য কত অর্থ ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে খোয়াতে হবে? তাও ভাবতে হবে। তাছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ও কোম্পানিগুলো কি ধরনের সুবিধা পাবে,সেটিও একটি বিষয়। কোন চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট হওয়ার অর্থ হল ব্রিটেনকে রাতারাতি বিচ্ছেদের প্রস্তুতির কোন সময় ছাড়াই সম্পর্ক ছেদ করতে হবে। কোন খাতে কী ধরনের প্রভাব পড়বে আর তা মোকাবেলায় কী করতে হবে সেটি বোঝার কোন সময় পাবে না যুক্তরাজ্য। আর এতে যারা ভুক্তভোগী হবে তাদের সহায়তার জন্য কী ব্যবস্থা নেয়া দরকার বা তাদের নতুন ব্যবস্থার জন্য কিছু সময় দেয়ার সুযোগ থাকবেনা। সবকিছু গুটিয়ে রাতারাতি সরে আসতে হবে।
লেখক ঃ কলামিস্ট
[email protected]