বেসরকারি শিক্ষকরা আবার রাজপথে

বেসরকারি শিক্ষকরা আবার রাজপথে

রবিউল ইসলাম রবীন : অতি সম্প্রতি বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে অবসর ও কল্যাণ বাবদ প্রতিমাসে কেটে নেওয়া টাকার হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হলে শিক্ষক-কর্মচারীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। ইতিমধ্যে তাঁরা ঢাকার প্রেসক্লাবে এ বিষয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন। প্রায় ৫ লক্ষ শিক্ষক-কর্মচারি এমপিওভুক্ত বেসরকারি কলেজে চাকরি করে। মানুষ গড়ার কারিগরদের এই স্তরে প্রায় বিভিন্ন প্রশ্নে অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে। এতদিন প্রতি মাসে অবসরের জন্য একেকজন এমপিভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারির কাছ থেকে মূল বেতনের ৪ শতাংশ ও কল্যাণ সুবিধার জন্য ২ শতাংশ টাকা কেটে রাখা হতো। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন অবসরের ৬ শতাংশ ও কল্যাণ সুবিধার জন্য ৪ শতাংশ টাকা কাটার প্রক্রিয়া চলছে। ইতিমধ্যে কারিগরি শিক্ষকদের কাছ থেকে এই পরিমান টাকা কাটা শুরু হয়েছে।  বাকি আছে কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের বর্ধিত টাকা কাটার বিষয়।
সরকার সূত্র বলছে, অবসর ও কল্যাণ-সুবিধার জন্য মুলত শিক্ষক-কর্মচারিদের কাছ থেকে চাঁদা এবং সরকারের অনুদানে দেওয়া হয়। এখন অবসরের জন্য শিক্ষক-কর্মচারিদের কাছ থেকে মাসে সাড়ে ৩৫ কোটি টাকা আদায় হয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনযায়ী,চাঁদা পেলে তাঁ দাঁড়াবে সাড়ে ৫২ কোটি টাকা। এখন শিক্ষক-কর্মচারিদের অবসর সুবিধা দিতে মাসে গড়ে লাগে ৭০ কোটি টাকা। অথাৎ নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলেও মাসে প্রায় ১৭ কোটি টাকা ঘাটতি থাকবে। বর্তমানে গড়ে সাড়ে আটশ শিক্ষক-কর্মচারি অবসরে যান।
বেসরকারি কলেজের বিভিন্ন পদে চাকরিরত শিক্ষকদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২২ হাজার টাকা স্কেলে যারা চাকরি করেণ তাদের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিমাসে ২৩১০ টাকা করে কর্তন করা হবে। আগে যা ১৩২০ টাকা করে কর্তন করা হতো। চতুর্থ শ্রেণীর ঝাড়–দার পদে একজন কর্মচারির নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কর্তন হবে ৮৫০ টাকা। ১৬০০০ টাকা স্কেলে যারা চাকুরি করেণ তাঁদের কর্তন হবে ১৬০০ টাকা।
বেতন বৃদ্ধি ও বৈশাখি ভাতা পাবার পর এই স্তরের শিক্ষকদের মধ্যে যে স্বস্তি  ফিরে এসেছিল নতুন চাঁদা কাটার সিদ্ধান্তে তা কিছুটা  ম্লান হয়ে গেছে বলে অনেক শিক্ষক মন্তব্য করেছেন। এখন দেশের প্রায় সকল এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজে শিক্ষকদের মধ্যে নতুন করে চাঁদা কর্তন নিয়ে হতাশা দেখা দিয়েছে। ৭৯ জন শিক্ষকদের সাথে বিভিন্ন মাধ্যমে কথা বলে জানা গেছে, নতুন সিদ্ধান্তে তারা প্রচন্ড ক্ষুব্ধ। তাঁরা বলেন, বেতনের টাকা আমাদের, অথচ সেই টাকা কর্তন করা হলো, আমাদের মতামত ছাড়াই। বিশ্বে কোথাও এই অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি নাই। শিক্ষকরা বলেন, আমাদের চাকরিতে এমনিতে হাজারো বৈষম্য। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা যা দেওয়া হয় তা অপমানের সামিল। প্রতিষ্ঠান থেকে টিউশন ফি দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান প্রধানরা তা দেয়না।
জানা গেছে নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অবসর ও কল্যাণ বোর্ড এই টাকা কর্তনের ভূমিকা রাখে। শিক্ষকদের অভিযোগ হচ্ছে, তাঁদের বেতন থেকে যে পরিমাণ টাকা কাটা হয়, তা তাঁরা তার পরিমাণ কোনদিনই জানতে পারেন না। সরকারি কর্মচারিরা ট্রেজারি অফিসের মাধ্যমে তাঁদের অবসর ও কল্যাণের টাকার পরিমাণ জানতে পারেন এবং সেই টাকা থেকে তাঁরা লোনও তুলতে পারেন। শিক্ষকরা অবসর ও কল্যাণ বোর্ডে যে দুজন ব্যক্তি আছেন তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা, নৈতিকতা ও নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
শিক্ষকরা নতুন হারে চাঁদা নির্ধারণের বিষয়ে প্রাথমিক ভাবে কিছুটা কর্মসূচি পালন করেছেন। পবিত্র রমজানের পর হয়তো ক্লাশ বর্জনের ঘোষণা তাঁরা দিতে পারেন। যেটি কোনভাবেই কাম্য নয়। শিক্ষকদের বক্তব্য অনুযায়ী নানা বৈষ্যমের মধ্য দিয়ে তাঁরা চাকরি করেন। এ দেশের প্রেক্ষাপটে অবসরের টাকা উত্তোলনের পথ অত্যন্ত জটিল। সেই জটিলতা অনাদিকাল চলতে পারে না। এই দেশেই অনেক কিছু সহজ হয়ে এসেছে, আশা করা যায় অবসর ও কল্যাণের টাকা  উত্তোলনের পদ্ধতির সংস্কার হবে। শিক্ষকরা হচ্ছেন আধাঁর ঠেলার ফেরিওয়ালা। সেই ফেরিওয়ালারা মন খারাপ করে চাকরি করবেন, তা মনে হয় কাম্য নয়।
লেখক ঃ সহকারী অধ্যাপক-কলামিস্ট
০১৭২৫-০৪৫১০৫