বেকারত্ব বনাম টেকসই উন্নয়ন

বেকারত্ব বনাম টেকসই উন্নয়ন

রায়হান আহমেদ তপাদার : বিগত এক দশকে দেশে ব্যাপকহারে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকান্ড চলছে। বড় বড় মেগা প্রজেক্টসহ অসংখ্য প্রজেক্টের কাজ এগিয়ে চলছে। পদ্মা সেতু, পায়রা সমুদ্র বন্দর, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে সহ আরও অনেক প্রকল্পের কাজ চলছে। এগুলো পরিপূর্ণভাবে চালু হলে অর্থনীতির গতি যে বৃদ্ধি পাবে, তাতে সন্দেহ নেই। পাশাপাশি অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যে প্রকল্পগুলো সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখবে, সেগুলো হলো সরকারের গৃহিত একশ’টি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির উদ্যোগ। এগুলোর কাজ ধীরে হলেও এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম-সীতাকুন্ড ও এর সংলগ্ন ফেনীর সোনাগাজী উপজেলায় ৩০ হাজার একর জমি নিয়ে তৈরি হচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ বিশেষায়িত অর্থনৈতিক জোন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরী। এর অবকাঠামোর কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানি এখানে বিনিয়োগ করছে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নাগাদ চীনা কোম্পানির উৎপাদন কার্যক্রম শুরুর মাধ্যমে এর প্রাথমিক যাত্রা শুরু হচ্ছে। এই শিল্পাঞ্চল পুরোপুরি চালু হলে রপ্তানি বাণিজ্য গতিশীল হওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সমস্যা হচ্ছে, যেসব শিল্পনগরী গড়ে উঠছে, সেগুলোর বেশিরভাগই অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ। বলা যায়, দেশে যে নতুন শিল্পায়ন হতে যাচ্ছে, সেগুলোতে অটোমেশন পদ্ধতি বা যন্ত্রচালিত মেশিন সংযোজিত হচ্ছে। এতে কায়িক পরিশ্রমের শ্রমিক খুব একটা প্রয়োজন পড়বে না। পণ্য আনা-নেয়া, প্রক্রিয়াজাত, প্যাকেজিং করা থেকে শুরু করে লোডিং এসবই অটোমেটিক মেশিনের মাধ্যমে করা হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, বাংলাদেশে অতি দরিদ্রের হার ১১.৩ শতাংশ। টেকসই উন্নয়নের (এসডিজি) প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখার হিসাবে, দেশে হতদরিদ্রের সংখ্যা ২ কোটি ৪১ লাখ। কিন্তু নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ ধরে হিসাব করলে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৮ কোটি ৬২ লাখ। বিশ্বব্যাংক পভার্টি অ্যান্ড শেয়ার প্রসপারিটি বা দারিদ্র্য ও সমৃদ্ধির অংশীদার-২০১৮ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ বিবেচনায় নিয়ে যে হিসাব দেখিয়েছে তাতে অতি দরিদ্রের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮ কোটি ৬২ লাখ। আর দারিদ্র্যের হার হবে ৫২.৯ শতাংশ। সুখী দেশের তালিকাটি করা হয়েছে মূলত দুর্নীতি, মাথাপিছু জিডিপি, সামাজিক সহায়তা, স্বাধীনতা, উদারতা ও প্রত্যাশিত আয়ুষ্কালের ভিত্তিতে। ১৫৬ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৫তম। এক তথ্য থেকে দেখা যায়, ২০১০ সালে দরিদ্রতম ৫ শতাংশ জনসংখ্যার মোট আয় ছিল জিডিপির ০.৭৮ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা কমে হয়েছে ০.২৩ শতাংশ। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে ২০১০ সালে দেশে ধনী ১০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর দখলে ছিল ৩৫.৮৫ শতাংশ সম্পদ। ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩৮.১৬ শতাংশ। ১৭ কোটি মানুষের দেশে ২০ লাখ মানুষের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত। ফলে দেখা যাচ্ছে, নগরীতে বিশাল বিশাল শপিংমল, অট্টালিকা, নতুন নতুন মডেলের গাড়িতে রাস্তাঘাট ভরে গেছে। অস্বাভাবিক যানজটের কারণে জনজীবন যেন থমকে গেছে। অন্যদিকে গৃহহীন ভাসমান মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। উন্নয়ন প্রক্রিয়া হওয়া প্রয়োজন প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বণ্টনের ন্যায্যতা নিশ্চিত করে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সবার আগে প্রয়োজন মানবসম্পদ উন্নয়ন ও এর উন্নয়নের জন্য যথাযথ খাতে বিনিয়োগ। মানবসম্পদ উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু দেশে কাঙ্খিত হারে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ব্যাংক খাতে ২২ হাজার কোটি টাকা লোপাটের তথ্য পত্রিকান্তরে জানা যায়। এতে ব্যাংক ঋণের প্রবাহ কমে গেছে এবং সে সঙ্গে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানিও কম। ফলে ব্যাংক ঋণের পরিমাণও সীমিত হয়ে পড়েছে। দেশে প্রতি বছর ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৩১ হাজার বলা হলেও প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশে প্রকৃত বেকারের হার ১৪.২ শতাংশ। এ হিসাবে দেশে বেকারের সংখ্যা দাঁড়ায় ২ কোটি ২ লাখ। আইএলওর হিসাব মতে, ২০১৫ সালে বেকারের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি। বেকারত্ব বাড়ছে, এমন ২০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার ৯ শতাংশ। বেকারত্বের কারণে তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। হতাশার কারণে তরুণ সমাজ নেশাগ্রস্ত, মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। হতাশাগ্রস্তরা অনুৎপাদিত কর্মকান্ডে তাদের মেধা ও শ্রম ব্যয় করছে। বেকারত্ব বৃদ্ধিতে সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্রকে এ বিষয়টির দিকে যথাযথ নজর দিতে হবে। আমাদের দেশে এখন প্রায় ২ কোটি ৪১ লাখ মানুষ অতি দরিদ্র। সামাজিক অগ্রগতির চালিকাশক্তি হলো শিক্ষা। বিগত কয়েক দশকে শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়ন হলেও মানসম্পন্ন শিক্ষার অভাব রয়েছে।
এছাড়া শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে রয়েছে বিরাট বৈষম্য। সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি হলেও মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা এখনও পর্যন্ত নিশ্চিত হয়নি। মানসম্পন্ন শিক্ষার অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়েও বিরাট সংখ্যক তরুণ-তরুণী চাকরির সংস্থান করতে পারছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনসংখ্যার এ বিরাট অংশকে উৎপাদনশীল খাতে নিয়োজিত করতে পারলে উন্নয়ন কর্মকান্ড আরও গতিশীল হতো এবং দারিদ্র্যের হারও ক্রমান্বয়ে কমে যেত। অন্যদিকে অভিভাবকরা যে আশায় সন্তানদের পড়ালেখা করাচ্ছেন বা তাদের পেছনে যে অর্থ ব্যয় করছেন, তা বাস্তবে শুধু হতাশাই বাড়াচ্ছে। এজন্য প্রয়োজন কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন বাস্তবমুখী শিক্ষাব্যবস্থা। কর্মসংস্থানের গতি বাড়াতে সরকার বিশ্বব্যাংক থেকে ৭৫ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ গ্রহণ করার কথা জানা গেছে। কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাংক থেকে যে ঋণ পাওয়া যাবে, তা যদি যথাযথ খাতে প্রকৃত অর্থে বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। এর পাশাপাশি পরিবেশের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। পরিবেশের বিপর্যয় আমাদের জীবন-মান উন্নয়নে যাতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকে প্রখর দৃষ্টি রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে দ্রুতগতিতে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বিগত দুই দশক ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ঊর্ধ্বমুখী ধারা আমাদের আশান্বিত করছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্লেষণে বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আমাদের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন ঘটছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত খাতে বিস্ময়কর উন্নয়ন সাধিত হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু এ উন্নয়ন টেকসই হচ্ছে কি না, সেটি দেখার বিষয়।
মনে রাখতে হবে কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাংক থেকে যে ঋণ পাওয়া যাবে, তা যদি যথাযথ খাতে প্রকৃত অর্থে বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। এর পাশাপাশি পরিবেশের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। পরিবেশের বিপর্যয় আমাদের জীবন-মান উন্নয়নে যাতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকে প্রখর দৃষ্টি রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে আমাদের প্রবৃদ্ধি বাড়লেই শুধু উন্নয়ন হবে না, সে উন্নয়নটা যাতে টেকসই উন্নয়ন বা দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন হয় এবং এর সুফল আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভোগ করতে পারে, সে লক্ষ্যে সরকারসহ আমাদের সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে। অন্য একটি উৎস থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, গরিব মানুষের বসবাসে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম। এ থেকে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ একদিকে অতি ধনী বৃদ্ধির দিক থেকে প্রথম স্থানে, অন্যদিকে গরিব মানুষের বসবাসের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম স্থানে। এর মানে প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়নের সুফল একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির হাতে সীমাবদ্ধ। মুষ্টিমেয় ধনিক-শ্রেণির হাতে অঢেল অর্থ পুঞ্জীভূত হয়েছে এবং হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েলথ-এক্স’ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, অতিধনী বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ প্রথম স্থান দখল করেছে। এ প্রতিষ্ঠানটি অপর একটি প্রতিবেদনে বলেছে, ধনী বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ তৃতীয়। আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশে ধনী মানুষের সংখ্যা ১১.৪ শতাংশ হারে বাড়বে। জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউসন্স নেটওয়ার্ক ‘বৈশ্বিক সুখ প্রতিবেদন ২০১৯’ প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বের সুখী দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ গত এক বছরে ১০ ধাপ পিছিয়ে গেছে।
এ কথা অনস্বীকার্য, ভারসাম্যহীনভাবে হলেও দেশের অর্থনীতি এগিয়ে চলেছে। বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাজেটের আকার ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে বলে অর্থমন্ত্রীর বলেছেন।
দেশের অর্থনীতির দ্রুত অগ্রগামিতা এবং বিপুলতারই নিদর্শন। এই বিপুল অর্থনীতি এগিয়ে নিতে বিপুল লোকবলের প্রয়োজন। আমাদের সেই লোকবল রয়েছে। শুধু প্রয়োজন, পরিকল্পিতভাবে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে দেশের তরুণদের সুযোগ করে দেয়া। আমাদের তরুণদের যে মেধা, মনন, উদ্যম এবং উদ্ভাবনী শক্তি রয়েছে, তা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত হলে বিদেশ থেকে বিদেশি শ্রমিক ও কর্মকর্তা আনার প্রয়োজন পড়বে না। যদি তা না করা হয়, তবে অর্থনীতির একদিক ভারসাম্যহীনভাবে উঠতে উঠতে একসময় তা নিম্নমুখী হয়ে পড়বে। কারণ এক পায়ে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। অর্থনীতির সুদৃঢ় পা হচ্ছে কর্মসংস্থান। লাখ লাখ বা কোটি কোটি তরুণকে বেকার রেখে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। তখন দেখা যাবে বিশাল বেকারত্বের বোঝা অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ ও প্রকল্পগুলোর ওপর কালো ছায়া হয়ে থাকবে। যেমনটি দেখা যাচ্ছে, ভারতের অর্থনীতির ক্ষেত্রে। দেশটি উপর দিয়ে জ্বলজ্বল করলেও ভেতর দিয়ে ক্ষয়ে গেছে। গত ৭০ বছরের মধ্যে দেশটির অর্থনীতি এখন সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে। আমরা এ ধরনের ফাঁপা অর্থনৈতিক ভিত্তি ও উন্নয়ন চাই না। আমরা চাই, সুষম ও টেকসই উন্নয়ন। এজন্য দেশের মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা অর্থনীতিকে দুই পায়ের সুদৃঢ় ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হবে।
লেখক ঃ  কলামিস্ট
[email protected]