বিশ্বনবীর বিশ্ব মু’জিযা

বিশ্বনবীর বিশ্ব মু’জিযা

মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ  :ইসলামী ক্যালেন্ডারের ৭ম মাস রজব। রজব শব্দের অর্থ হলো সম্মান করা। আরবরা এ মাসকে ‘আল্লাহর মাস’ বলতো। প্রাক-ইসলামী যুগে আরবরা এ মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ অবৈধ মনে করতো। কারণ তারা এ মাসকে ‘উমরা’ আদায়ের মাস মনে করে যুদ্ধ-বিগ্রহ স্থগিত রাখতো। পবিত্র হজ্জ উপলক্ষে জিলকদ জিলহজ্ব ও মুহাররম এ তিন মাসও যুদ্ধ বিগ্রহ বন্ধ রাখতো। ইসলামের প্রাথমিক যুগেও উক্ত আইন বলবৎ ছিল। পরবর্তীতে সুরা তাওবার ৩৬নং আয়াতের শেষাংশ দ্বারা উক্ত বিধান রহিত হওয়ায় নবী করিম (সা) জিলক্বদ মাসে কাফিরদিগকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন। বুখারী ও মুসলিম শরীফদ্বয়ে বর্ণিত আছে যে, মক্কা বিজয়ের পর শাওয়াল মাসে হাওয়াযিন গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানে বের হন। হুনায়েনের যুদ্ধে পরাজিত একদল পলায়ন করে তায়েফে আশ্রয় গ্রহণ করলে  নবী করিম (সা) তায়েফে গিয়ে ৪০ দিন তাদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। এ থেকে একদল মুফাস্সির হারাম মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ বৈধ বলেছেন। অবশ্য অন্য দলের মতে উক্ত মাসে যুদ্ধ বিগ্রহ এখনো অবৈধ রয়েছে। যাই হোক আমাদের সমাজে রজব মাস নবী (সা) এর মিরাজের মাস মনে করে ‘শবে মিরাজ’ উদযাপন করা হয়। মিরাজের তারিখ ও মাস সম্পর্কে প্রায় ২০টি মতামত পাওয়া যায়। উক্ত ২০টি মতামতের মধ্যে আমাদের সমাজে রজব মাসের ২৬ তারিখের দিবাগত রাতকে লাইলাতুল মিরাজ বা শবে মিরাজ বা মিরাজের রাত হিসাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়। উক্ত রাতে মিরাজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বর্ণনা করা হয়। রাত জেগে মুসল্লিগণ মসজিদে ইবাদতে মগ্ন থাকেন। বিভিন্ন কবরস্থান যিয়ারত করেন। অনেক স্থানে মিলাদ মাহফিলের পর তাবারক বিতরণ করা হয়।

মিরাজ বিশ্ব নবীর বিশ্ব মুজিযা। অনেক মুজিযার সমন্বয়ে মিরাজ সংঘটিত হয়। যেমন (১) কোন কোন বর্ণনায় মিরাজের রাতে উম্মুহানি বিনতে আবু তালিব (রা) এর ঘরে রাসুলুল্লাহ (সা) শুয়েছিলেন। যে ঘরে শুয়ে ছিলেন হঠাৎ ওই ঘরের ছাদ ফেটে যায়। ইহাও একটি মুজিযা। (২) অন্য বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা) উম্মু হানি (রা) এর ঘর থেকে এসে হাতীমে শুয়েছিলেন। জিবরাইল (আ) এসে তাঁকে নিয়ে জমজমের পানি দিয়ে অন্তর ধুয়েছিলেন। এটা ছিল ২য় মুজিযা। (৩) অতি দ্রুতগামী যানবাহন বুরাক এর পিঠে সওয়ার হওয়া। (৪) বিভিন্ন স্থান দেখতে দেখতে নিমিষের মধ্যেই বাইতুল মুকাদ্দাসে’ অবতরণ (৫) বহু নবী রাসুলের সাক্ষাৎ, সালাত আদায় ও ইমামতি করণ। (৬) ‘বাইতুল মুকাদ্দাস’ হতে উর্ধ্ব জগতের প্রথম আকাশ হতে সপ্তাকাশ পার হয়ে সিদরাতুল মুনতাহা দর্শন। (৭) প্রত্যেক আসমানে বিভিন্ন নবী রাসুলের সাক্ষাৎ ও সালাম প্রদান। (৮) জান্নাত ও জাহান্নাম দর্শন। (৯) জাহান্নামে বিভিন্ন অপরাধীদের শাস্তির প্রক্রিয়া অবলোকন। (১০) মহান আল্লাহর অতি নিকটে অবস্থান ও কথোপকথন (১১) মক্কায় ফিরে এসে কাফেরদের প্রশ্নের জবাবে ‘বাইতুল মুকাদ্দাস’ মক্কায় বসে দর্শন (১২) ফিরে এসে রাস্তায় মক্কায় কোরেশ গোত্রের কতিপয় লোকদের উট হারানোর সংবাদ পরিবেশন ইত্যাদি।

তথ্য সূত্র ঃ মুজিযাতুর রাসুল (সা) ৬. মুস্তাফা মুরাদ, আযহায় বিশ্ববিদ্যালয়, মিশর। পবিত্র কুরআনে মিরাজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘তাকে আমার নিদর্শন দেখাবার জন্য’’ মহান আল্লাহ নিদর্শন সমুহ তার নবীকে স্বচক্ষে দেখানোর জন্য মিরাজের ব্যবস্থা করেছিলেন। যাতে করে রিসালাতের দায়িত্ব পালন করা আরও সহজ হয়ে উঠে। উপরন্ত মক্কী জীবন পার হয়ে মাদানী জীবনে আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালনের জন্য মিরাজ ছিল মহানবী (সা) এর জন্য মহাপ্রশিক্ষণ। সেই সময়ে আরব বিশ্বে কোন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল না। গোত্র ভিত্তিক বা এলাকা ভিত্তিক শাসক ছিল। সর্বপ্রথম মুহাম্মদ (সা) হিজরত করে ‘মদীনা’ নামক একটি নতুন রাষ্ট্রের সূচনা করবেন। এতে করে তার ব্যস্ততা অনেক বেড়ে যাবে। সেখানকার প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় নিজকে এবং নিজের দলের সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে বিভিন্ন বিষয়ে পরিপক্কতার জন্য মিরাজের প্রশিক্ষণ মহান আল্লাহ কর্তৃক নৈশ ভ্রমণের নামে এক মহাভ্রমণের ব্যবস্থা  করা হয়েছিল বললে মনে হয় ভুল হবে না। সে জন্যই মিরাজে ৫ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়। দৈনিক পাঁচবার ইমামের পিছনে জামাতের সহিত ৫ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা মুসলিম উম্মাহর ইত্তেহাদ ও ইত্তেফাক তথা ঐক্যের ইঙ্গিত বহন করে। আমরা শবে মিরাজ পালনে অভ্যস্ত কিন্তু মিরাজের অন্যতম নির্দেশ ৫ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতে নারাজ। সালাত বাদ দিয়ে শুধু শবে মিরাজ উদযাপনে কোন কল্যাণ নেই। কেননা সালাতের মাধ্যমেই উম্মাত দুনিয়া ও আখিরাতের সর্বোচ্চ নিয়ামত লাভ করতে পারবে। আবার সালাতকে অবহেলা করলে মুমিনের ঈমান  হারিয়ে সর্বহারা হওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়। সালাত গ্রহণ করলে মিরাজের হাদিয়া গ্রহণ করা হয়। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সালাতের প্রতি যতœবান হবার তাওফিক দিন। আমীন সুম্মা আমীন।

অনেকেই মনে করেন যে, মিরাজ নবী (সা) এর শ্রেষ্ঠ মুজিযা। অনেকেই সর্বশ্রেষ্ঠ মুজিযার কথা ভুলে গেছি। বিশ্ব নবীর বিশ্ব মুজিযা হলো ‘আল কুরআন’। কেন আল কুরআন শ্রেষ্ঠ মুজিযা? এর উত্তরে তাফসীরে নিম্নোক্ত কারণ গুলি উল্লেখ করা হয়েছে। (১) আল কুরআন গতিশীল স্থায়ী মুজিযা। সকল নবী রাসুলগণের সকল মুজিযা তাদের জীবন পর্যন্তই ছিল। ‘আল কুরআন’ ব্যতিক্রম। হুজুর (সা) এর তিরোধানের পরেও ‘আল-কুরআন’ কিয়ামত পর্যন্ত পূর্বের মতই মুজিযা সুলভ বৈশিষ্ট্যসহ বিদ্যমান থাকবে।

(২) আল কুরআনের মত সর্ববিধ জ্ঞানের আধারমূলক একটি পুস্তক পৃথিবীর সকল মানুষ চেষ্টা করেও কিয়ামত পর্যন্ত আনতে পারবে না। (৩) ‘আল কুরআন’ বিশ্বজনীন ও সার্বজনীন দিক নির্দেশিকা, (৪) আল কুরআন অদৃশ্য সংবাদ বহন করে। (৫) আল কুরআন বহু পুরাতন ইতিহাস পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করে। (৬) আল কুরআন ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের জন্য ভবিষ্যৎ বাণী প্রদান করেছে। (৭) আল কুরআনের প্রতিটি শব্দ পজিটিভ। যার কারণে সকলের প্রতি প্রভাব সৃষ্টি করে। (৮) বারংবার পাঠ করলেও বিরক্ত আসে না। বিশ্বাস করুক আর না করুক গবেষকের জন্য ইহা অত্যন্ত আকর্ষণীয় পুস্তক। (৯) আল কুরআন মহান আল্লাহ নিজেই সংরক্ষণ করবেন। (১০) আল কুরআন জ্ঞান-বিজ্ঞানে ভরপুর। জ্ঞানের বিশ্ব কোষ বলা হয়। উপরোক্ত কারণসমূহ নির্ণয় করে তাফসীরকারকগণ আল-কুরআনকে শ্রেষ্ঠ মুজিযা বলে আখ্যায়িত করেছেন।
রজব মাসে আমাদের জন্য করণীয় ঃ
(১) আল কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে মিরাজের বর্ণনা, মিরাজের তাৎপর্য ও শিক্ষা মুসলিম জাতির সামনে তুলে ধরা।
(২) অন্যান্য মাসের মত এ মাসেও নফল সালাত, সিয়াম সহ বেশি বেশি কুরআন অধ্যায়ন করা।
(৩) ২৭ রজব নফল সিয়াম পালন করা হয়। রজব মাসের ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে অনেকেই বিভিন্ন ধরনের বিশেষ বিশেষ ইবাদতের বিশেষ বিশেষ পুরষ্কার নিজ নিজ কিতাবে উল্লেখ করেছেন ঃ যেমন রজব মাসের গোসল, লাইলাতুর রাগাইবের নামাজ, শবে এস্তেফতাহ ইত্যাদি যাবতীয় প্রকার বর্ণনা সহীদ হাদীস সূত্রে বর্ণিত নয় বলে হাদীস বিশারদ গণ উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে ১) ইবনু হাজার (বুখারীর ব্যাখ্যাকার) ২) আল্লামা সুয়ুতী ৩) ইমাম মোল্লা আলী হানকী ৪) আব্দুল হাই লাখ নবী উল্লেখযোগ্য। মহান আল্লাহ আমাদেক তাওফিক দিন। আমীন।
লেখক ঃ খতীব,
উপশহর মসজিদ ও ইমাম মদীনা মসজিদ,
বগুড়া। ০১৭১২-৫১৪৪৭৮