বিশ্ব ভালোবাসা দিবস

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস

হাবিবুর রহমান স্বপন : প্রীতি ভালোবাসা কোনদিন বিফলে যায় না। শতধারায় তা ফিরে আসে নিজের কাছেই। বৃষ্টির ধারা, ঝর্নার স্রোত বয়ে যায়, আবার তা ফিরে আসে আপনার উৎস মুখে। ইংরেজ কবি কিট্স লিখেছেন, ‘ভালোবাসা যে পেল না আর ভালোবাসা যে কাউকে দিতে পারলো না, সংসারে তার মতো দুর্ভাগা যেন আর নেই’। একজন মহান ব্যক্তির উক্তি : আমাকে সামান্যই ভালোবাসো কিন্তু তা যেন দীর্ঘদিনের জন্য হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার বিখ্যাত সৃষ্টি শেষের কবিতায় লিখেছেন, ‘যে ভালোবাসা ব্যপ্তভাবে আকাশে মুক্ত থাকে, অন্তরের মধ্যে সে দেয় সঙ্গ; যে ভালোবাসা বিশেষভাবে প্রতিদিনের সব কিছুতে যুক্ত হয়ে থাকে সংসারে সে দেয় আসঙ্গ।’ ভালোবাসা নিয়ে কবি-সাহিত্যিক-দার্শনিকদের করা এমন হাজারো উদ্ধৃতি দেয়া যায়। বিশ্বখ্যাত লেখক-উপন্যাসিক টলস্টয় লিখেছেন, ‘ভালোবাসার অর্থ হলো, যাকে তুমি ভালোবাসো তার মতো জীবন যাপন করো’। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘যাকে সত্যিকার ভালোবাসা যায়, সে অতি অপমান আঘাত করলে, হাজার ব্যথা দিলেও তাকে ভোলা যায় না’। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘যাহাকে ভালোবাসো তাহাকে চোখের অন্তরাল করিও না’। মহাকবি কালিদাস লিখেছেন, ‘ভালোবাসা জিনিসটা ভোগ করিতে না পেলে তার প্রতি স্নেহটা দিনদিন প্রগাঢ় প্রেমে পরিণত হয়’। রুশ সাহিত্যিক আলেকজান্ডার পুশকিন লিখেছেন, ‘ভালোবাসা অন্তর দিয়ে অনুভব করতে হয়, এক্ষেত্রে ভাষার প্রয়োজন হয় না’।
বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত কালজয়ী এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেমের গান ‘ভালবেসে সখি নিভৃত যতনে আমার নামটি লিখ তোমার মনেরও মন্দিরে।’ সারা বিশ্বে প্রেম-ভালবাসা নিয়ে লাখ লাখ গান-কবিতা রচিত হয়েছে নানা ভাষায়। ভালবাসা ছাড়া বিশ্ব তেতো বা বিষাদময়।     
মানুষ তার প্রিয়জনের কাছে তার মনের গভীরে জমে থাকা ভালোবাসা প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে নানা কায়দায় প্রকাশ করে থাকে। প্রতিবছর বিশ্বের দেশে-দেশে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস পালিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের উদ্রেক হয় কিভাবে উৎপত্তি বা শুরু হলো এই ভালোবাসা দিবস বা ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’। এমন একটি বিষয়ের প্রতি মানুষের কৌতুহলটা অন্য যে কোন বিষয়ের চেয়ে একটু বেশি হওয়াই স্বাভাবিক।
খ্রিস্ট্রিয় ইতিহাসে ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ নিয়ে বহু কাহিনী রয়েছে। ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের কথা। সাম্রাজ্যবাদী, রক্তপিপাসু রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসের দরকার এক বিশাল সৈন্যবাহিনীর। এক সময় তার সেনাবাহিনীতে সৈনা সংকট দেখা দেয়। কিন্তু সেনা বাহিনীতে যোগদানে যুবকদের আগ্রহ একেবারেই ছিল না। কিন্তু সম্রাটের অভিজ্ঞতা হচ্ছে বিবাহিতদের চেয়ে অবিবাহিত যুবকরাই যুদ্ধের জন্য শ্রেষ্ঠ। তারা যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে অত্যধিক ধৈর্য্যশীল হয়। ফলে তিনি যুবকদের বিবাহ কিংবা যুগলবন্দী হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। যাতে তারা সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে অনীহা প্রকাশ না করে। তার এই আদেশে যুবক-যুবতীরা ক্ষেপে যায়। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামের এক যুবক ধর্মযাজকও সম্রাটের এই নিষেধাজ্ঞা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি।
সেন্ট ভ্যালেন্টাইন রাজার আদেশ অবজ্ঞা করে ভালোবেসে সেন্ট মারিয়াসকে বিয়ে করেন। শুধু তাই নয় তিনি রাজার আদেশ অমান্য করে গোপনে তার গির্জায় গোপনে বিয়ে পড়ানোর কাজও  করতে থাকেন। একটি কক্ষে মোমবাতির স্বল্প আলোতে ফিস ফিস করে বিয়ের মন্ত্র পড়াতেন ভ্যালেন্টাইন। কিন্তু বিষয়টি সম্রাট ক্লডিয়াসের কর্ণগোচর হলে তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। কারারুদ্ধ সেন্ট ভ্যলেন্টাইনকে এক নজর দেখার জন্য কারাগারে প্রেমাসক্ত যুবক-যুবতীরা প্রতিদিন কারাগারে আসতো ফুল ও উপহার সামগ্রী নিয়ে। তারা সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে উদ্দীপনামূলক কথা-বার্তায় উদ্দীপ্ত রাখতো। এক কারারক্ষীর অন্ধ মেয়েও আসতো ভ্যালেন্টাইনকে দেখতে। তারা অনেকক্ষণ ধরে প্রাণ খুলে কথা বলতো। এভাবে তারা একে অপরের প্রেমে পড়ে যায়। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের আধ্যাত্মিক চিকিৎসায় মেয়েটি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায়। রাজা তার এই আধ্যাত্মিকতার খবর পায় এবং ভ্যালেন্টাইনকে রাজ দরবারে হাজির করার নির্দেশ দেন। রাজা তাকে রাজকর্মে সহযোগিতা করার প্রস্তাব দেন। বিয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করা হলে রাজার দেয়া এই প্রস্তাব পালনে ভ্যালেন্টাইন অস্বীকৃতি  জানান। এতে রাজা ক্ষুব্ধ হন এবং তার মৃত্যু দন্ডাদেশ দেন। মৃত্যুদন্ড বাস্তবায়নের ঠিক আগ মুহূর্তে ভ্যালেন্টাইন কারারক্ষীদের কাছে কাগজ ও কলম চেয়ে নেন। তিনি মেয়েটির কাছে একটি চিঠি গোপন চিঠি লেখেন এবং শেষাংশে বিদায় সম্ভাষণে লেখেন ‘ফ্রম ইউওর ভ্যালেন্টাইন’। এটা ছিল এমন একটি শব্দ যা হৃদয়কে স্পর্শ করে। অতঃপর ১৪ ফেব্রুয়ারি মহান প্রেমিক ভ্যলেন্টাইনের মৃত্যু দন্ড কার্যকর করা হয়।
এই ঘটনার আবার অন্যভাবেও বর্ণনা করা হয়েছে। গ্রীসের রাজা দ্বিতীয় ক্লডিয়াস ছিলেন, ‘প্যাগান’ ধর্মাবলম্বী। প্যাগানরা ছিল মূর্তি পুজারী। তার সময় খ্রিস্ট ধর্মের প্রতি মানুষ আকৃষ্ট হতে থাকে। তখন একজন যুবক পাদ্রি ছিলেন। তার নাম ছিল সেন্ট ভ্যলেন্টাইন। রাজা ক্লডিয়াস তার রোমান রাজ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ করেন। আদেশ জারি করেন, যে বা যারা খ্রিস্টধর্ম প্রচার করবে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়ার। রাজার আদেশ উপেক্ষা করে ভ্যলেন্টাইন খ্রিস্টধর্ম প্রচার করতে থাকেন। এতে রাজা ক্ষুব্ধ হন এবং ভ্যলেন্টাইনকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন এবং বিচারে তাকে মৃত্যু দন্ডাদেশ প্রদান করা হয়। রাজা ভ্যালেন্টাইনকে ‘প্যাগান’ মতবাদ মেনে নেয়ার শর্তে মুক্তি দেয়ার প্রস্তাব দিলে ভ্যলেন্টাইন তা প্রত্যাখ্যান করেন। জেলখানায় বন্দি থাকা অবস্থায় জেলার আ্যসটেরিয়াস-এর যুবতী সুন্দরী অন্ধ কন্যা ভ্যালেন্টাইনকে দেখতে আসে। যদিও সে চোখে দেখে না তবুও তাদের প্রায় প্রতিদিনই  কথা হয়। তারা একে অপরের প্রেমে পড়ে। ভ্যালেন্টাইনের আধ্যাত্মিক চিকিৎসায় সুন্দরী জুলিয়া দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায়। এতে রাজা ক্লডিয়াস আরও ক্ষুব্ধ হন। এছাড়া ভ্যালেন্টাইনের অসাধারণ জনপ্রিয়তা তাকে আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে। রাজা ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যু দন্ডাদেশ কার্যকরের আদেশ দেন। মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার আগে ভ্যালেন্টাইন একটি চিরকুটে প্রেমিকা জুলিয়াকে চিঠি লেখেন। চিঠিটি শেষ করেন, ‘ণড়ঁৎ ঠধষবহঃরহব’ লিখে।
ভালোবাসার রকম-ফের আছে। পিতা-পুত্র বা সন্তান ও পিতা-মাতার ভালোবাসা, প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসা, ভাই-বোনের ভালোবাসা, বন্ধুর প্রতি বন্ধুর ভালোবাসা, দেশ বা জাতির প্রতি ভালোবাসা, জীবের প্রতি ভালোবাসা ইত্যাদি। যার ভালোবাসা যত প্রবল তার যশ সুনাম তত বেশী। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহকে ভালোবাসার ইচ্ছা থাকলে মানুষকে ভালোবাসতে শেখ’। মাহামতি বুদ্ধ বলেছেন, ‘জীবে দয়া কর’। তিনি বিশ্বের সকল প্রাণীর মঙ্গল কামনা করেছেন। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ‘মানবপ্রেমই শ্রেষ্ঠ প্রেম’। তিনি সকলের প্রতি সদয় হতে বলেছেন। মহাত্মা গান্ধী ভালোবাসা থেকেই অহিংসার মহান বাণী প্রচার করে গেছেন। সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘আমি এথেন্সবাসী নই, আমি গ্রীকও নই, আমি বিশ্বের নাগরিক’। যারা ভালোবাসার কথা বলেছেন এবং তা জীবনে বাস্তবায়ন করেছেন তারা তত মহান এবং স্থায়ী বা স্মরণীয়-বরণীয় হয়েছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো এদেশেও ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ উদযাপন হচ্ছে। জাতীয়ভাবে নয়। এই দিবসটি পালনে সক্রিয়, যুবক-যুবতীরা বা প্রেমিক-প্রেমিকারা। মাত্র ক’বছর আগে এই দিবস সম্পর্কে এদেশের মানুষ জানতে পেরেছে। যা ক্রমশ প্রসার লাভ করছে। ভালোবাসা দিবসে প্রিয়জনকে কিছু উপহার দিন। সামনা-সামনি দেখা না হলেও ভালোবাসার বার্তা পাঠান মোবাইলে ফোনে বা  ‘ম্যসেজ’ পাঠিয়ে। পাঠাতে পারেন ভালোবাসার কার্ড। তবে সবচেয়ে সেরা উপহার হচ্ছে বই ও ফুল। সেটি যে ফুলই হোক না কেন। ‘ভালোবাসা’ সাহিত্যের অন্যতম বিষয়। সকল ভাষায় যত গান, কবিতা, গল্প, ঔপন্যাস, নাটক রচিত হয়েছে তার সিংহভাগের বিষয়ই হচ্ছে ভালোবাসা। ইংরেজ কবি শেলি লিখেছেন, ‘মানুষ সর্বদাই কিছু না কিছু ভালোবাসিয়া বাঁচিয়া থাকিতে চায়। কিন্তু যাহা অনন্ত, যাহা অবিনশ্বর তাহাকে এই মর্তের দুয়ারের মধ্যে খোঁজা ভ্রান্তি ব্যতিত কিছু নয়।’ অপর কবি কিটস লিখেছেন, ‘ভালোবাসা যে পেল না আর ভালবাসা যে কাউকে দিতে পারলো না, সংসারে তার মতো দুর্ভাগা নেই।’ রুশ কবি দস্তয়েভস্কি লিখেছেন, ‘প্রথমে যদি কাউকে খারাপ লাগে তবে নির্ঘাত তাকে ভালো লাগবে পরে।’  বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘যে ভালোবাসা ব্যপ্তভাবে আকাশে মুক্ত থাকে, অন্তরের মধ্যে সে দেয় সঙ্গ; যে ভালোবাসে বিশেষভাবে প্রতিদিনের সবকিছুতে যুক্ত হয়ে থাকে সংসারে সে দেয় আসঙ্গ।’ বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন, ‘যাহাকে ভালোবাস তাহাকে চোখের অন্তরাল করিও না।’
এখন কথা হচ্ছে আমি বা আপনি যাকে ভালোবাসবো তিনি আপনজন বা প্রেমিকজন। তাই তাকেই দিতে হবে সুগন্ধীযুক্ত ফুল। দিতে পারেন একটি গোলাপ কিংবা হাসনা হেনা অথবা রজনীগন্ধা। আতর কিংবা সেন্টও (পারফিউম) দেয়া যেতে পারে। মোট কথা ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হতে হবে মনে-অন্তরে এবং কর্মে। আজকের এই দিনে প্রেমিক তার প্রেমিকার উদ্দেশ্যে গাইতে পারেন, ‘ভালবেসে সখি নিভৃত যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনেরও মন্দিরে।’ বাংলা ভাষায় এটিই এযাবৎ কালের সেরা প্রেমের গান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বিবিসি বাংলা বিভাগের জরিপে। আর যদি প্রেমাসক্তগণ মনের মতো ভালোবাসার সহযোগী খুঁজে না পান তা হলে মনের আনন্দে দেশকে ভালবেসে গাইতে পারেন, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’।ভালোবাসতে হবে নিজের প্রয়োজনেই প্রতিদান প্রাপ্তির আশায় নয়। মনে রাখতে হবে পৃথিবীতে ভালোবাসার একটি মাত্র উপায় আছে, তা হলো প্রতিদান পাওয়ার আশা না করে ভালোবেসে যাওয়া। হ্যাঁ, গভীর ভালোবাসার কোন ছিদ্রপথ নেই।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট
[email protected]
০১৭১০-৮৬৪৭৩৩