বিশ্ব পারমাণবিক সক্ষমতা এবং বর্তমান বাস্তবতা

বিশ্ব পারমাণবিক সক্ষমতা এবং বর্তমান বাস্তবতা

রায়হান আহমেদ তপাদার : ইরানের বিরুদ্ধে ইঙ্গ-মার্কিন আগ্রাসনের হুমকি চলছে তো চলছেই। এটা যেন স্বাভাবিক এবং রুটিন মাফিক সর্বদা চলমান একটি কর্মসূচি। ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের হুমকি দেয়াটা ইঙ্গ-মার্কিনীদের যেন নিত্য দিনেরই কাজ। পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন করছে। এরা প্রতিনিয়তই ইরানকে হুমকি দিচ্ছে। ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগের জন্য আহবান জানাচ্ছে আর বলছে, ইরান যদি তার পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগ না করে তাহলে তার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ এবং প্রয়োজনে সামরিক হামলা চালানো হবে। ইসরাইল ইতিমধ্যেই অনেকবার ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়ে ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল জাতিসংঘের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে একাধিকবার অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে। সর্বশেষ গত ৯ জুন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের বিরুদ্ধে চতুর্থ দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ‘অ্যাটম ফর পিস’ শীর্ষক ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের সূচনা ঘটে পঞ্চাশের দশকে। ইউরোপ ও আমেরিকার সহায়তায় সে সময়ের মার্কিন মিত্র ‘শাহ’ শাসিত ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বেড়ে ওঠে। কিন্তু ১৯৭৯ সালে রেজা শাহের পতন উত্তর ইসলামী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইরান পশ্চিমা সম্পর্ক সর্বোচ্চ খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়ে। এ সময় আমেরিকা ও ইউরোপ ইরানের পরমাণু প্রকল্পে সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করে। ফলে অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ে দেশটির পারমাণবিক কার্যক্রম।
অন্যদিকে নব্বই দশক থেকে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক সহযোগিতার বিস্তৃত হতে থাকে। এই ধারাবাহিকতায় ক্রমেই উজ্জীবিত হয় দেশটির পরমাণু প্রকল্প। সর্বশেষ ২০১২ সালে বুশেহরকে একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মক্ষম পারমাণবিক প্লান্ট হিসেবে ঘোষণা করে রাশিয়া। ওই সময়ের মধ্যে তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধায়নের মাত্রা নিয়ে সংশায়িত হয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক বিশ্ব, বিশেষত আমেরিকা। এ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে সরব আমেরিকা ও তার মিত্রদের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির সব ধরনের সক্ষমতা থামিয়ে দিতে আমেরিকা বেশ কয়েকবার ইরানে সামরিক হামলার পরিকল্পনা করে। কিন্তু ইরানের শক্তি সক্ষমতা-সংক্রান্ত ভিন্ন কৌশল আমেরিকার পরিকল্পনাকে বারবার ভন্ডুল করে দেয়। এমন অবস্থায় ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধায়ন মাত্রা সামরিক ব্যবহার উপযোগী হওয়ার নিশ্চিত আশঙ্কার মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক আলোচনার পর ২০১৫ সালে সম্পাদিত হয় ‘জয়েন্ট কম্প্রেহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’। যে প্রক্রিয়ায় দেশটির পরমাণু প্রকল্পের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর ধারাবাহিক উৎকণ্ঠা দুটিই হ্রাস পেয়েছিল। কিন্তু চুক্তিবিহীন বর্তমান বাস্তবতা আবারও আগেকার অনিশ্চয়তা উত্তেজনা ফিরে আসার আভাস দিচ্ছে। ফলে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম ঘিরে উদ্বেক-উৎকণ্ঠা বাড়ছেই। জয়েন্ট কম্প্রেহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন ২০১৫ সালের জুলাইয়ে ছয় বিশ্ব ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। যে চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সম্প্রসারণশীল পরমাণু প্রকল্পের লাগাম টেনে ধরা।
উল্লেখ্য, ওই সময়ের মধ্যে পরমাণু গবেষণায় ইরানের ব্যাপক বৈজ্ঞানিক, কারিগরি সাফল্য প্রত্যক্ষ করে বিশ্ব। ওই পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট আন্তর্জাতিক উৎকণ্ঠার অবসান করে সাময়িকভাবে সীমিত হয়েছিল তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্খা। এতে গতিশীল হয়েছিল পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ-সংক্রান্ত অন্যান্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। কিন্তু হঠাৎ করে ‘জয়েন্ট কম্প্রেহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ স্বাক্ষরিত হওয়ার মাত্র তিন বছরের মাথায় আমেরিকা চুক্তি থেকে সরে এলে এক ধরনের অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। গত বছর ৯ মে হোয়াইট হাউসের এমন সিদ্ধান্ত সবাইকে কিছুটা হতবাক করে। এ পর্যায়ে ভঙ্গুর চুক্তিটির অন্যান্য পক্ষ বিশেষ করে তিন ইউরোপীয় দেশ ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন এবং রাশিয়া ও চীন চুক্তি বাঁচানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। এ ছাড়াও চুক্তিতে সম্পৃক্ত নয় এমন কিছু ইউরোপীয় দেশসহ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ এই স্থিতাবস্থা ধরে রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চুক্তিতে ফিরে আসেনি আমেরিকা। ফলে চুক্তিটি অপমৃত্যুর চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই বাস্তবতায় ১০ মে ২০১৯ সাল থেকে ইরানও চুক্তির কিছু ধারা লঙ্ঘন করার অভিপ্রায় ইউরোপকে অবহিত করে। সর্বশেষ জয়েন্ট কম্প্রেহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন চুক্তির ৩৬নং ধারার ভিত্তিতে তেহরান নিজের পারমাণবিক কার্যক্রম ২০১৫ সালের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া জোরদার করেছে। এই বাস্তবতায় কিছুদিন আগে তেহরান সফরে এসেছিলেন আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার ভারপ্রাপ্ত প্রধান কর্নেল ফেরুতা। সেসময় তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আণবিক শক্তি সংস্থার প্রধানসহ দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলিত হন। একই সঙ্গে ঘুরে দেখেন দেশটির বিভিন্ন পারমাণবিক প্লান্ট। অন্যদিকে ফেরুতার তেহরান সফরের প্রাক্কালে দেশটির বেশ কয়েকটি সামরিক স্থাপনা পরিদর্শনের দাবি ওঠে। এ ব্যাপারে জয়েন্ট কম্প্রেহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন চুক্তির সেকশনটির ব্যাখ্যা নিয়ে দেখা দেয় বিতর্ক। সেকশন টি-এর আওতায় শুধু ইরানের পরমাণু অস্ত্র উৎপাদন সম্পর্কিত বিষয়াবলি অন্তর্ভুক্ত। এরমধ্যে দেশটির প্রচলিত সামরিক প্রযুক্তি সংগ্রহ, অস্ত্র উৎপাদন, মজুদ, গবেষণার বিষয়াবলি সংশ্লিষ্ট নয় বলে মত দিয়েছে মস্কো। এতে করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমা উৎকণ্ঠার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ২০১৫ সালের আগেই ইরান সামরিক ব্যবহার উপযোগী ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধায়নের সক্ষমতা অর্জন করেছিল, এটি বিশেষজ্ঞদের ধারণা। যদিও তেহরানের দাবি, তারা কখনই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। এতদসত্ত্বেও ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্খা নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আমেরিকা ও পশ্চিমা মিত্রদের। তারা সব সময় একধরনের সন্দেহের মধ্যে থেকে দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ পর্যায়ে জয়েন্ট কম্প্রেহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন উভয় পক্ষের জন্যই সন্তোষজনক অবস্থার সৃষ্টি করে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা ফেরায়। সাম্প্রতিক সময়ে এ ইস্যুতে তেহরানের যাবতীয় পদক্ষেপসমূহের প্রতি দৃঢ় সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া ও চীন। যদিও ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থানও চুক্তি টিকিয়ে রাখার পক্ষেই। কিন্তু এখন পর্যন্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর ভূমিকায় আমেরিকা ইরান কেউই সন্তুষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে ফরাসি প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে।
কিন্তু এগুলো কোনোটাই তেমন কার্যকর নয়। চুক্তি টিকিয়ে রেখে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার এ-সংক্রান্ত মতপার্থক্য কমে আসার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। যে কারণে ইউরোপীয় উদ্যোগসমূহকে নিছক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবেই গণ্য করা যায়। কিন্তু এমন অবস্থা চলতে থাকলে কী হবে? সত্যি সত্যি চুক্তির অপমৃত্যু নিশ্চিত হলে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের উপায় কী? তাহলে অনিয়ন্ত্রিত ইরান কি তার ইচ্ছামতো চলবে? আপাত দৃষ্টিতে এই প্রশ্নগুলোর যুক্তিসংগত উত্তর নেই। যে কারণে এক ধরনের ভয় সংশয়ের অবতারণা হচ্ছে। সম্প্রতি এই তথ্য নিশ্চিত করে জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা। ওই সংস্থার ১৬তম ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান চুক্তিতে নির্ধারিত ২০১ কেজির বেশি অর্থাৎ ২৪১ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ করেছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধায়নের নির্ধারিত মাত্রা ৩ পয়েন্ট ৬৭ অতিক্রম করে ৪ পয়েন্ট ৮৭তে উন্নীত করেছে। একই সঙ্গে অ্যাডভান্সড সেন্ট্রিফিউজ মেশিন ২০০ আইআর ৪এস এবং আইআর-৬এস দেশটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু কেন্দ্র নাতাঞ্জে স্থাপন করার সত্যতা নিশ্চিত করেছে আইএইএ।
উল্লেখ্য চুক্তির বয়স আট বছর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত ইরানের আইআর-৬এস ও ৮এস সেন্ট্রিফিউজ ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। এ ক্ষেত্রে আইএইএ নিজ পর্যবেক্ষণে অগ্রাধিকার দিচ্ছে ইরানের তৃতীয় ধাপের ‘রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচি’র বিষয়টি। যদিও ‘রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’ সংক্রান্ত বিতর্কে ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে রাশিয়া। কিছুদিন আগে এই বিতর্কে মস্কোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, আইএইএর সম্পূর্ণ নজরদারির মধ্যে থাকা ইরানের রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম নিরস্ত্রীকরণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি এনপিটি বা নিউক্লিয়ার পলিফারেশন ট্রিটির ব্যত্যয় করবে না। অবশ্য ২০১৫ সালের পর আইএইএ ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত মোট ১৫টি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সর্বশেষ প্রতিবেদন ব্যতীত আগের ১৫টি প্রতিবেদনেই আইএইএ স্বীকার করেছিল যে, ইরান চুক্তি মেনে তাদের সবধরনের সহযোগিতা করছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির পারমাণবিক কার্যক্রম দ্রুত চুক্তি-পূর্ব যুগে ফিরে যাচ্ছে বলেই বিশেষজ্ঞদের অভিমত। পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জনের জন্য ইরানের গণতান্ত্রিক, ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত কর্মসূচির জন্য ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ইসরাইলের অন্যায় এই অবরোধ কিন্তু পশ্চিমাদের জন্য বুমেরাং হতে পারে এবং তাহলে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য জাতিসংঘ আজ যুক্তরাষ্ট্র এবং তার সহযোগীদের নির্দেশেই পরিচালিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তার সিদ্ধান্তসমূহ জাতিসংঘের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে এবং জাতিসংঘ আজ পশ্চিমাদের স্বার্থ হাসিলের একটি প্লাটফরম হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। এই অবস্থায় স্বয়ং জাতিসংঘও আজ তার গ্রহণ যোগ্যতা হারিয়ে ফেলছে।
লেখক ঃ শিক্ষাবিদ-কলামিস্ট
[email protected]