বিশ্ব ইজতেমার জন্য প্রস্তুত তুরাগ তীর

বিশ্ব ইজতেমার জন্য প্রস্তুত তুরাগ তীর

গাজীপুরের টঙ্গীতে মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশ তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে টঙ্গীর তুরাগ তীরে ময়দানের প্রস্তুতি কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে।
ইজতেমাকে সফল ও সার্থক করতে ইজতেমার স্বেচ্ছাসেবক ছাড়াও পুলিশ, র‌্যাব, সিটি করপোরেশন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, স্বাস্থ্য বিভাগসহ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
এরই মধ্যে ময়দানের ৯০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।
প্রতি বছরের ন্যায় বাড়তি পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন মাঠের ভেতর ও বাইরে বিভক্ত হয়ে কাজ করবে। ইজতেমাকে কেন্দ্র করে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।
আগামী ১০, ১১, ১২ জানুয়ারি  তাবলিগ জামাত বাংলাদেশের শীর্ষ মুরুব্বি ও কাকরাইল জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা জোবায়ের আহমেদের অনুসারী মুসল্লিরা এই বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিবেন। ১২ জানুয়ারি রোববার দুপুরে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ইজতেমা। ১৩ জানুয়ারি সকালের মধ্যে ময়দান ত্যাগ করতে হবে। পরে মাওলানা সাদপন্থি অনুসারী মুসল্লিরা আগামী ১৭ জানুয়ারি শুক্রবার বাদ ফজর থেকে শুরু হওয়া ইজতেমায় অংশ নিবেন। ১৯ জানুয়ারি মধ্যাহ্নের পূর্বে যেকোনো এক সময় আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ২০২০ সালের বিশ্ব ইজতেমা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ইজতেমা ময়দানের বিশাল সামিয়ানা টাঙ্গানো, রাস্তাঘাট মেরামত ও পয়:নিষ্কাশনের কাজ চলছে।
আগত মুসুল্লিদের নিরাপত্তা ও নাশকতারোধে থাকছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এরই মধ্যে মাঠের ৯০ ভাগ প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। ১৬০ একর জমির ওপর প্রায় দুই বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিশাল চটের প্যান্ডেলের ছামিয়ানার নিচে আগামী ১০ জানুয়ারি শুক্রবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব ইজতেমা শুরু হবে। স্কুল-কলেজ ও মাদরাসার ছাত্রসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ময়দানে প্যান্ডেল তৈরির কাজ করছেন। এছাড়া রাস্তা মেরামত, মাইক টানানো, টয়লেট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ময়দানের আগাছা পরিষ্কারের কাজ করছেন আগত মুসল্লিরা। বিদেশি নিবাস, বয়ান মঞ্চ, তাশকিল কামরা এরই মধ্যে নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। আগত বিদেশি মুসল্লিদের সুবিধার্থে বিদেশি নিবাসে বিদ্যুৎ, গ্যাস সংযোগ ও পয়:নিষ্কাশনের উন্নত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
ইজতেমা উপলক্ষে ময়দানের পশ্চিম পাশে বিদেশি মেহমানদের জন্য তৈরি টিনসেট সংলগ্ন পশ্চিম কোনে লোহার পাইপ দিয়ে মঞ্চ তৈরির করা হয়েছে। বিদেশি মেহমানদের জন্য টিন দিয়ে তৈরি তাবুতে বিগত বছরের ন্যায় এবারও পাকা টয়লেট তৈরি ও তাদের সুবিধার্থে তাঁবুগুলো উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও আরামদায়ক করে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন ইজতেমা প্রস্তুতি কাজে নিয়োজিত জোবায়ের অনুসারী মুরুব্বীরা।
ইজতেমা চলাকালে ময়দানে আগত মুসল্লিদের উচ্ছিষ্ট ফেলার জন্য ময়দানের চারপাশে রিংয়ের তৈরি পোর্টএ্যাবল ডাস্টবিন স্থাপন করা হচ্ছে। যাতে ময়লা আবর্জনা যেখানে সেখানে না ফেলে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলতে পারে।
ঢাকা লালবাগ এলাকা থেকে আসা মো. ইসমাইল হোসেন  বলেন, প্রায় ৭০জন ইজতেমার সঙ্গী ভাই নিয়ে ময়দানে কাজ করতে এসেছি। আল্লাহর মেহমানরা ইবাদত বন্দেগি করতে আসবেন। তারা যেন সুন্দরভাবে ইবাদত বন্দেগি করতে পারেন সেই দিক খেয়াল রেখে ময়দানের কাজ করতে আসছি। বিদেশি মেহমানদের কামরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করছি। যাতে বিদেশি মেহমানরা ইজতেমা ময়দানে এসে চলাফেরায় কোনও প্রকার কষ্ট না পায়।
মানিকগঞ্জ থেকে আসা আরেক মুসল্লি জাফর  জানান, আল্লাহকে খুশি করার জন্য ২০ বছর যাবত ইজতেমা মাঠে কাজ করছি। আমরা সবসময় দুনিয়াদারী কাজে মগ্ন থাকি। আখিরাতের নেকি হাসিলের উদ্দেশে ইজতেমা ময়দানে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করে যাচ্ছি। আগামী বছর হায়াতে বাঁচিয়ে রাখলে এ ময়দানে আবারো কাজ করতে আসব। ইজতেমা ময়দানে আসার উদ্দেশ্যে হলো আল্লাহকে খুশি করা।  আখেরাত সম্পর্কে জানা।
গাজীপুরের কালীগঞ্জ থেকে আসা ৫৫ বছরের হাসান আলী জানান, এ দুনয়িা হচ্ছে ধোঁকার ঘর। আমরা জীবনে মানুষকে ধোঁকা দিয়েছি। সেই গুনাহ থেকে মাফ পাওয়ার জন্য ইজতেমা মাঠে এসেছি।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায়  আটটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে।  এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ১৫টি তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে ১৪টি এবং র‌্যাবের পক্ষ থেকে ১০টি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া মাঠে ব্লিচিং পাউডার ও মশক নিধনের পর্যাপ্ত ওষুধ ছিটানোর কাজ শুরু করা হয়েছে। এছাড়া ৭৫০টি বৈদ্যুতিক বাতি স্থাপন ও পানি ছিটানোর ব্যবস্থা থাকছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ  জানান, বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে পানি সরবরাহ ও পয়:নিষ্কাশনে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ২০ লাখ মুসল্লির সমাগমকে সামনে রেখে প্রতিদিন সাড়ে তিন কোটি গ্যালন পানির ব্যবস্থা থাকছে। বাড়তি টয়লেট নির্মাণ ও পাকা টয়লেটগুলো ব্যবহার উপযোগী করা হয়েছে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও পানি ও পয়:নিষ্কাশনে মুসল্লিদের কোনও সমস্যা হবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গাজীপুর মেট্টোপলিটন পুলিশ কমিশনার আনোয়ার হোসেন জানান, আগত লাখ লাখ মুসল্লিদের নিরাপত্তায় এখানে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হবে। সিসিটিভি, আর্চওয়ে, মেটাল ডিটেক্টর থাকছে পুরো ময়দান জুরে।  খিত্তায় খিত্তায় নিরাপত্তা চাদরে ঢেকে ফেলা হবে। সার্বিক নিরাপত্তায় এবার ইজতেমায় সাড়ে  আট হাজার পুলিশ সদস্য কাজ করবে।
মুসল্লিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ময়দানে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ২০১১ সাল থেকে টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা তিনদিন করে দুই পর্বে অনুষ্ঠিত হয়। তবে ২০১৮ সালে মুসল্লিদের দুই পক্ষের মারামারি ও হতাহতের ঘটনার পর আলাদাভাবে দুই গ্রুপ ইজতেমার আয়োজন করছে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ১০ জানুয়ারি শুরু হয়ে ১২ জানুয়ারি জোহরের নামাজের আগে আখেরি মোনাজাতের মধ্যে দিয়ে শেষ হবে জোবায়ের গ্রুপের বিশ্ব ইজতেমা। মাঝে চার দিন বিরতি দিয়ে ১৭ জানুয়ারি শুরু হবে সাদ অনুসারীদের ইজতেমা। ১৯ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ২০২০ সালের দুই গ্রুপের দুই পর্বের বিশ্ব ইজতেমা।
ইজতেমা ময়দানরে জম্মিদার ফকির আতাউর রহমান  জানান, আগামী ১০ জানুয়ারি শুরু হবে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব এ উপলক্ষে ইজতেমার প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে চলছে।  প্রস্তুতি কাজে সার্বিক সহযোগিতা করে আসছে গাজীপুর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানের শীর্ষ মুরুব্বী ও সূরা সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মেজবাহ উদ্দিন। তিনি  জানান, ময়দানের প্রস্তুতিকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আশা করি, আগামী ১০ তারিখের আগেই প্রস্তুতি কাজ শেষ হবে, ইনশাআল্লাহ।
১৯৬৭ সাল থেকে টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে তাবলিগ জামাতের উদ্যোগে এ মহা ধর্মীয় সমাবেশ হয়ে আসছে।