বিপন্ন মনুষ্যত্ব এবং বর্বরতার রূপ বদল!

বিপন্ন মনুষ্যত্ব এবং বর্বরতার রূপ বদল!

মীর আব্দুল আলীম : এটাতো দেখি বিস্ময়ের বাংলাদেশ! কি না ঘটছে এদেশে? কত কিছুইতো দেখছি আমরা। দিন দিন যেন, বিস্ময়ের মাত্রা বাড়ছে। দেশে মনুষ্যত্বের অপমৃত্যু হচ্ছে। মানুষের ভেতরকার বিবেক বোধ হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষগুলো কেমন যেন দয়া-মায়াহীন হয়ে পড়েছে। নিষ্ঠুর হয়ে যাচ্ছে। কখনো বিবেক বুদ্ধি, পরকিয়া; কখনো অর্থের তাড়নায় অহমিকাচ্ছন্ন মানুষগুলো কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছে। খুনের পর লাশ টুকরো টুকরো করে ফেলা, নিজ সন্তানকে পুড়িয়ে মারা, নিজ সন্তানের হাতে মা-বাবা খুন হওয়া, শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের পর খুন এমন ঘটনা ঘটছে অহরহ। পরকীয়ার জেরে গর্ভধারিণী মায়ের হাতে প্রিয় সন্তান খুনের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধও বেড়েই চলেছে। প্রেম ও পরকীয়ার মোহে নিজ শিশুকে পুড়িয়ে মারতেও দ্বিধা করছে না গর্ভধারিনী মা। এদিকে দাম্পত্য কলহের জেরে স্বামী খুন করছে স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে। তুচ্ছ ঘটনার জের ধরেই একের পর এক ঘটছে প্রাণসংহারের মতো ঘটনা। দুর্বৃত্ত বা সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি পরিবারের আপন মানুষটির কাছেই আরেকজন সদস্য ক্রমশ নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছে। প্রাণ হারাচ্ছে। সামাজিক অপরাধের লাগামহীন বৃদ্ধিতে দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন।

সমাজে যেসব অপরাধ হচ্ছে তা খুবই মর্মান্তিক, বিভীষিকাময়, নারকীয় ও ভয়ঙ্কর। এ অপরাধ সভ্য সমাজের মানুষের কাছে কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। অপরাধ বর্বরতা ও সভ্যতার সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এসব বর্বরোচিত ঘটনায় আসামিরা মামলার দ  প্রদানের ক্ষেত্রে আইনত বা ন্যায়ত কোনো সুযোগ বা আদালত থেকে আসামি কোনো প্রকার অনুকম্পা বা দয়া পেতে পারে না। তবুও আইনের নানা ফাঁক ফোকরে আসামিরা পার পেয়ে যাচ্ছে।

আমরা মনে করি, বর্বরতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও সচেতন হতে হবে। যখনই আইনের শাসন একটু ঢিলে-ঢালা হবে তখনই সমাজে বর্বরতা বাড়বে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে বর্বরতা বাড়ছে। এ জন্য সামাজিকভাবে পরিবারকে ছোট থেকে শিশুদের নীতি নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে। যারা অপরাধী তাদের কঠোরভাবে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তা নাহলে অপরাধীরা বেপরোয়া ও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে, সামাজিক অবক্ষয়ের ভয়াবহতা বাড়বে।

পত্রিকার এক রিপোর্টে দেখলাম, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ১৮৭ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। নিষ্ঠুর বর্বরতার শিকার হচ্ছে শিশু ও নারী। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণের মতো অনৈতিক কর্মকান্ড। বিচারহীনতার কারণে দিন দিন ধর্ষণকারীরা আরো বেপরোয়া হচ্ছে। ধর্ষকদের বিরুদ্ধে মামলা করতে গিয়ে উল্টো ভিকটিম ও তার পরিবারই পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছে। ধর্ষণের পর হত্যা করেই ক্লান্ত হচ্ছে না ধর্ষণকারী। কোন কোন সময় লাশও গুম করা হয়। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থির খবর হলো পিতা, ভাই, চাচা, মামা,খালু ও নিকট আত্মীয়দের হাতে নিরাপদ নয় শিশু কন্যা ও নারী। পিতার হাতে মেয়ে ধর্ষণের মতো ঘটনায় উদ্বেগ উৎকন্ঠা প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সমাজ বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় বিবেকের ধস নেমেছে সমাজে। ধর্ষণের মতো বর্বরতার পর হত্যা করার ঘটনা ঘটেই চলেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশে ১৮৭ জন কন্যা শিশু ও নারী ধর্ষিত হয়েছেন। এ তিন মাসের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৯ জনকে। এসব ঘটনায় মামলা হলেও অধিকাংশ অপরাধী রয়েছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। শুধু তাই নয় মামলা করতে গিয়ে পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছেন ভিকটিম ও তাদের পরিবার।
রাজধানীর কাছে ধামরাইয়ে মিথ্যে অপবাদে নাসিমাকে পুড়িয়ে মারে ক’জন সমাজপতি। কি নিষ্ঠুরই না ঘটনার বিবরণ। যৌতুকলোভী স্বামী বহু আগে ছেড়ে চলে গেছে। তবুও বাঁচতে চেয়েছিল নাসিমা। কিন্তু তাকে বাঁচতে দিল না কতিপয় সমাজপতি। তাদের কু-নজর পড়ে তার গতরে। ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নাসিমা। পরে চরিত্রহীনা অপবাদ দিয়ে নাসিমার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। ধামরাই থানার জয়পুর গ্রামের সমাজপতি পাষন্ড শহীদুল ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা প্রকাশ্যে নৃশংস এ ঘটনা ঘটিয়ে উল্লাস করেছিল। সেদিন নাসিমার রক্তমাংসের শরীর ছাই হয়ে গিয়েছিল। প্রাণটা কোনো মতে আটকে ছিল দেহে। পুলিশ খবর পেয়ে নাসিমার দগ্ধ বীভৎস দেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যায়। মৃত্যুর আগে নাসিমা পুলিশকে জানিয়েছেন, ‘আমি চরিত্রহীনা নই। ওরা আমাকে চরিত্রহীনার অপবাদ দিয়ে গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। আমার শত আকুতি-মিনতিতে ওদের পাষাণ হৃদয় গলেনি। আমি ওদের বিচার চাই।’

প্রশ্ন হচ্ছে, সমাজের আইন ও নৈতিকতার কোনো গভীর অসুখের আলামত এসব? নিষ্ঠুরতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা-অস্থিতিশীলতা, সমাজবিরোধী শক্তির দাপাদাপি সব মিলিয়ে যে চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা অবশ্যই গভীর অসুখের আলামত। এ অসুখ টোটকা-দাওয়াইয়ে সারবে বলে মনে হয় না। পেশাদার অপরাধী থেকে শুরু করে গৃহস্থ মানুষ, সরকারি সংস্থার কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মজীবিদের মধ্যেও নিষ্ঠুরতা প্রকাশ পাচ্ছে ক্রমবর্ধমান হারে। সরকারের, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক-পরিচালকদের নিশ্চয়ই এসব বিষয় অজানা নয়। তাদের এরপরও তাহলে নির্বিকারত্বের কারণ কী? শান্তিকামী মানুষ এরপর তাদের ওপর অন্তত নিরাপত্তার ভরসাটা রাখবে কী করে? একের পর এক বীভৎস ঘটনার মধ্যদিয়ে সমাজের যে কদর্য চিত্র ফুটে ওঠছে, তা তাদের টনক এখনো নাড়াতে পারছে বলে বিদ্যমান পরিস্থিতি সাক্ষ্য দেয় না।

বিস্ময়টা এখানেই। যে সমাজে নৃশংসতা-বর্বরতা অপরাধীদের নিত্যকর্মে পরিণত হয়, সে সমাজ যে কোনোভাবেই মনুষ্য বসবাসের উপযোগী সমাজ নয় এবং তা নির্ণয় করতে রাষ্ট্র কিংবা সমাজবিজ্ঞানের আশ্রয় নেয়ার কোনো দরকার নেই। পত্রপত্রিকান্তে প্রকাশিত খবরের বৈশিষ্ট্য দেখে অনুমিত হয় বাঙালির পারিবারিক জীবন কতটা দুর্বিষহ হয়ে ওঠছে। এ কথা সত্য যে, খানিকটা অসাবধানতা, খানিকটা অবহেলা আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে খানিকটা অমানবিক আচরণের মধ্যদিয়ে এসব মানবিক বিপর্যয়গুলো আমরাই কোনো না কোনোভাবে ডেকে আনছি। মানুষ কত না বদলে গেছে। মানুষের এরূপ নিষ্ঠুরতা দেখে ভয়ে শিউরে ওঠতে হয়। এসব বন্ধ হওয়া দরকার। এই নৃশংস ঘটনার কঠিন ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া বাঞ্ছনীয়। এখন আমাদের সমাজ একটা পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সমাজ যত আধুনিক হবে, মানুষের মধ্যে ততো দ্বন্দ্ব বেড়ে যাবে। আমাদের ট্রাডিশনাল সমাজ আধুনিকায়নের দিকে যাচ্ছে। আধুনিক বিশ্বের সব ধরনের উপাদান প্রভাব বিস্তার করছে সমাজে। যার কারণে সামাজিক অপরাধ বাড়ছে। আমাদের বিচার ব্যবস্থা ঐভাবে অগ্রসর হচ্ছে না। পুলিশ, আদালতসহ ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম একটা আরেকটার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এখন সময় এসেছে পুরো প্রক্রিয়াটাই ঢেলে সাজানোর। না হলে এ ধরনের অপরাধ বাড়তেই থাকবে।

এটা খুবই উদ্বেগজনক ব্যাপার যে, দেশে এসব নিষ্ঠুর কর্মকান্ড বন্ধ হচ্ছে না। বর্তমান সময়ে চারপাশে যেসব ঘটনা ঘটছে তা কোনোভাবেই মেনে নেয়ার মতো নয়। এমনো ঘটনা ঘটছে যা আদিম বর্বরতাকেও হার মানায়। ক্রমাগত এমন ঘটনাগুলো বিশ্বাসযোগ্য না হলেও অবলীলায় তা সংঘটিত হচ্ছে। একজন মানুষের বিবেকবোধ, মনুষ্যত্ব কতো নীচু হলে এমন ঘৃণ্য হত্যাকান্ড ঘটাতে পারে তা আমাদের বোধগম্য নয়। বর্তমান সময়ে নানা ইস্যুতেই যেভাবে হত্যাকান্ড সংঘটিত হচ্ছে, তা কোনো সভ্য মানুষের কাজ হতে পারে না। সমাজ থেকে ঘৃণ্যরূপী এ মানুষকে যথাযথ শাস্তির আওতায় না আনা গেলে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে দেশ। দেশজুড়ে কেবল গুম, খুন, হুঙ্কার আর অশান্তির দাবানল। জনগণ শান্তি চায়। ধন-দৌলত কিছুই চায় না, দেশে একটু শান্তি চায়। চুরি, ছিনতাই, গুম, হত্যা চায় না; দেশের প্রতিটা মানুষের সম্পদ আর স্বজনদের জীবনের নিরাপত্তা চায়, চায় একটু স্বস্তি। ঘুমানোর সময় নিশ্চিন্তে ঘুমোতে চায়। সকালে সংবাদপত্র খুলে ভালো খবর পড়তে চায়। কিন্তু যেভাবে দুর্বৃত্তদের অপরাধপ্রবণতা বেড়েই চলেছে, এরকম পরিস্থিতি পুরো জাতির জন্যই দুর্ভাগ্যের। আমরা মনে করি দেশের যে কোনো হত্যাকান্ডের সঠিক তদন্ত নিশ্চিত করতে ও তার শাস্তি প্রদানে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে সরকারকেই।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
[email protected]  
০১৭১৩৩৩৪৬৪৮