বিদেশফেরতরা মানছেন না কোয়ারেন্টিন, ঝুঁকিতে ফেনী

বিদেশফেরতরা মানছেন না কোয়ারেন্টিন, ঝুঁকিতে ফেনী

দ্রুত অগ্রসরমান জনপদ ফেনী। এ অগ্রসরতার পেছনের কারিগর প্রবাসীরা। রেমিটেন্সে ফেনীর অবস্থান প্রথমদিকে। সব দিক বিবেচনায় ফেনীকে প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা বলা হয়। প্রায় ১৮ লাখ জনবসতির এ জেলায় সাম্প্রতিক করোনা পরিস্থিতিতে ফেনীতে ফিরেছেন পাঁচ হাজারেরও বেশি প্রবাসী। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, রোববার (২২ মার্চ) পর্যন্ত হোম কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন মাত্র ৩৭৫ বিদেশফেরত। বাকিরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন লোকালয়ে। 


নির্বিগ্নে মিশছেন আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে সর্বসাধারণদের সঙ্গে। যাচ্ছেন হাট-বাজার থেকে শুরু করে সব খানে। আর সে কারণেই করোনা সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে এ জেলাটি। এমনটাই মনে করছেন বিভিন্ন দায়িত্বশীল সূত্র।  

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, প্রবাসী অধ্যুষিত এ জেলায় করোনার সংক্রামণ ঠেকাতে তেমন কোনো প্রস্তুতি নেই। এখন পর্যন্ত এ জেলায় আসেনি করোনা শনাক্তের কীট। বিভিন্ন স্থানে ১০৫ শয্যার আইসোলেশান ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখা হলেও নেই কোনো চিকিৎসার সরঞ্জাম। এখনো ব্যবস্থা করা যায়নি চিকিৎসক-নার্সদের পোশাক। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নেই কোনো প্রশিক্ষণ।  

ফেনীর মহিপালের ট্রমা সেন্টারে করা হয়েছে করোনা সংক্রমণ রোগীদের আইসোলেশন সেন্টার। সাংবাদিকদের এক ব্রিফিংয়ে জেলার সিভিল সার্জন জানান, সেখানে এখনো নেই বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ।

এদিকে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে এবং সচেতনতার লক্ষ্যে সব স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা থাকলেও ফেনীর একাধিক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এমন কিছুর দেখা মেলেনি। জ্বর, সর্দি ও কাশিতে আক্রান্ত রোগীদের জন্য প্রত্যেক হাসপাতালে আলাদা ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও তা পরিলক্ষিত হয়নি। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা প্রসঙ্গে জেলার সিভিল সার্জন ডা. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, গত ১৩ মার্চ চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক স্বাক্ষরিত একটি চিঠি তাকে পাঠানো হয়। ওই চিঠির আলোকে ফেনীর সব বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে আসা দর্শনার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রোগীদের বাধ্যতামূলকভাবে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। 

তিনি জানান, চিকিৎসার জন্য আসা জ্বর, সর্দি ও কাশিতে আক্রান্ত রোগীদের আলাদা লাইন করতে হবে। শনিবার শহরের ১২টি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে দেখা গেছে, নির্দেশনা অনুযায়ী আটটিতেই আলাদাভাবে কোনো হাত ধোয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। প্রবেশদ্বারের আশপাশে হাত জীবাণুমুক্ত করার জন্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেই।  

জেলার সিভিল সার্জন ডা. সাজ্জাদ হোসেন জানান, গত চার মাসে ফেনীতে পাঁচ হাজার ৩০০ ব্যক্তি বিদেশ থেকে দেশে এসেছেন এমন তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। কিন্তু ওই তথ্যে বিদেশফেরতদের বিস্তারিত ঠিকানা না পাওয়ায় তাদের কোয়ারেন্টিনে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়াও অনেক প্রবাসী ফেনীতে না এসে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় আত্বীয়-স্বজনের কাছে থাকায় তাদের কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শনিবার সকাল পর্যন্ত ফেনীতে ২১৬ জন প্রবাসী কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন। তাদের সঙ্গে এক হাজার ২৩৭ জন পরিবারের সদস্যও হোম কোয়ারেন্টিন মেনে চলছেন। ফেনীতে গত কয়েকদিনে ৫৩ জন বিদেশফেরত হোম কোয়ারেন্টিন শেষ করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফেনী শহরের মাস্টারপাড়ার এক বাসিন্দা জানান, তাদের পাশের বাড়িতে বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) রাতে এক ইতালী প্রবাসী দেশে ফিরেছেন। শুক্রবার (২০ মার্চ) সকাল থেকে তিনি মোটরসাইকেলে করে জেলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এতে করে স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও দায়িত্বশীল কেউ ওই প্রবাসীকে কিছু বলছেন না। বিষয়টি সিভিল সার্জনকে জানানোর পর তাকে হোম কোয়ারেন্টিন পালনে বাধ্য করা হবে বলে জানানো হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ প্রবাসীকে হোম কোয়ারেন্টিন পালনে কেউ বাধ্য করতে আসেনি।

অপরদিকে ছাগলনাইয়া উপজেলার পূর্ব মধুগ্রাম, হাফিজিয়া মাদ্রাসা রোড, দুলাহাজী ভূইঁয়া বাড়ির (তারা মিয়ার বাড়ি) লন্ডন প্রবাসী দুই ভাই কোয়ারেন্টিন মানছেন না বলে জানায় স্থানীয় এলাকাবাসী। এটি নিয়ে আতঙ্কিত রয়েছেন তারা। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এলাকাবাসী জানান, প্রবাসী দুই ভাইকে কোয়ারেন্টিনে থাকতে বলা হলেও তারা মানছেন না। এদিকে প্রশাসন থেকেও নেই দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ।

ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট গোলাম জাকারিয়া জানান, অনেক প্রবাসী দেশে ফিরে জনসমাগমে ঘোরাফেরা করছেন। এদের ব্যাপারে জেলা প্রশাসন অথবা স্বাস্থ্য বিভাগকে জানানোর জন্য সরকারি কর্মকর্তা-আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জনপ্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েকজন প্রবাসীকে জরিমানা করে হোম কোয়ারেন্টিন পালনে বাধ্য করা হয়েছে।

২৫০ শয্যার ফেনী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. ইকবাল হোসেন ভূঞা জানান, তার হাসপাতালে ৫০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হয়েছে। নয় সদস্যের একটি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ হাসপাতালে করোনা শনাক্তের কীট ব্যবস্থা করা যায়নি। এছাড়াও সোনাগাজীর মঙ্গলকান্দিতে ২৫ শয্যার একটি আইসোলেশন হাসপাতাল প্রস্তুত করা হলেও সেখানে চিকিৎসার সরঞ্জামাদি নেই।

জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মনিরুজ্জামান জানান, দেশব্যাপী করোনা ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ায় জেলার সর্বত্র দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করেছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এদের লাগাম টেনে ধরতে জেলাজুড়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা অব্যাহত রয়েছে। 

জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজ্জামান জানান, ফেনীতে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখানকার জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রবাসফেরতদের হোম কোয়ারেন্টিন পালনে বাধ্য করা হচ্ছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঠেকাতে প্রতিদিনই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তা প্রচারের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা অব্যাহত আছে। কাউকে আক্রান্ত সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত ফেনীতে চিকিৎসার সরঞ্জামাদি ও করোনা শনাক্তের কীট ব্যবস্থা করা যায়নি বলে স্বীকার করেছেন তিনি।